অবশেষে জামায়াতের সিদ্ধান্ত

0
430

নিউজ ডেস্ক: মানবতাবিরোধী অপরাধে দলের শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিসহ নানা দণ্ডে দণ্ডিত হওয়া ও কারাবরণ, হাইকোর্টের আদেশে নিবন্ধন বাতিল, সরকারের কঠোর মনোভাব- এমন নানামুখী সংকটে নাজুক অবস্থা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর। দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামি রাজনৈতিক এ দলটির কোনো পর্যায়েই এখন আর প্রকাশ্য কার্যক্রম নেই। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এ অবস্থায় পুরনো ধারা থেকে বেরিয়ে সংস্কারের মধ্য দিয়ে আধুনিক জামায়াত গঠনের পক্ষে দলটির অধিকাংশ নেতাকর্মীসহ জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবী ও শিল্পপতিরা। শুধু মূল দলই নয়, ছাত্রশিবিরেও সংস্কারের ঢেউ লেগেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

দলটির সূত্র জানায়, বর্তমান ধারায় রাজনীতি করলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়া দূরে থাক, ধীরে ধীরে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে জামায়াতের। তাই রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে বিকল্প পথে হাঁটছেন দলটির নেতারা। এ ক্ষেত্রে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড এবং তুরস্কের একে পার্টির ইতিহাসকে পাথেয় মানছেন দলটির নেতারা। এ দুটি দলের সঙ্গে জামায়াতের আদর্শিক মিল রয়েছে। তবে এ নিয়ে জামায়াতে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। দলটির তরুণ নেতৃত্ব ও লন্ডনকেন্দ্রিক প্রবাসী নেতারা জামায়াতে সংস্কার চাইছেন। এ ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে একমত জামায়াতপন্থী বুদ্ধিজীবীরাও।
জানা যায়, ২০০১ সালে যুক্তরাজ্য প্রবাসী জামায়াতের কয়েকজন নেতার উদ্যোগে ইধহমষধফবংয: জবপষধরসরহম ঃযব ঘধৎৎধঃরাব শীর্ষক একটি কৌশলপত্র বাংলাদেশের শীর্ষ জামায়াত নেতাদের কাছে পেশ করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে শিবিরের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল শিশির মুহাম্মদ মনির জামায়াত-শিবির সংস্কারের একটি প্রস্তাবনা পেশ করেন। তবে তার নির্দেশনাও আমলে নেয়নি দলটি। উল্টো শিশিরকে ‘চর’ আখ্যায়িত করে সংগঠন থেকে বের করে দেয়া হয়।

এ নিয়ে দেশব্যাপী শিবিরকর্মীদের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। ২০০৯ সালে দলের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে ‘পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’ শিরোনামে জামায়াতের রাজনীতির ধরন পাল্টে উদারনৈতিক দল গঠনের লক্ষ্যে পল্টনে একটি গোপন বৈঠক হয়। সে বৈঠকে বর্তমানে কারাবন্দি মীর কাসেম আলীসহ জামায়াতের অনেক তরুণ নেতা উপস্থিত ছিলেন। এরপর মুহাম্মদ কামারুজ্জামান কারাগার থেকে জামায়াত সংস্কার নিয়ে একটি সুদীর্ঘ চিঠি পাঠান।
জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, একটি মধ্যপন্থী ইসলামি দল হিসেবে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোর কাছে নিজেদের তুলে ধরতে জামায়াতের একটি কূটনৈতিক মিশন কাজ করছে। তারা চাইছেন, সন্ত্রাসী তকমা থেকে বের হয়ে নতুনভাবে গড়ে তোলা হোক জামায়াতকে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব সফর করে দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক লবিইংয়ের কাজ করছেন সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। তার সঙ্গে বিভিন্ন বিদেশি মিডিয়া এবং জামায়াতের মতাদর্শের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।
সবকিছু ছাপিয়ে জামায়াতের সংস্কারপন্থী নেতারা চাইছেন ২০১০ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে পাঠানো কামারুজ্জামানের চিঠিতে বর্ণিত কৌশল অবলম্বন করতে। ‘পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন কর্মকৌশল গ্রহণ সময়ের দাবি’ শিরোনামে লেখা ওই চিঠিতে দলের বিগত ৬০ বছরের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম বিশ্লেষণ করে বেশকিছু নতুন কৌশল ও কর্মপন্থা প্রস্তাব করা হয়। প্রায় ছয় হাজার শব্দের চিঠিটিতে কামারুজ্জামান ওই সময়ের পরিস্থিতিকে ‘খুব নাজুক’ এবং জামায়াতের জন্য ‘কঠিন চ্যালেঞ্জ’ হিসেবে উল্লেখ করে তা মোকাবিলায় তিনটি বিকল্প পথ দেখান। সেগুলো হলো

১. যা হওয়ার হবে। আমরা যেমন আছি তেমনই থাকব।
২. পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জামায়াত সিদ্ধান্ত নিয়ে পেছনে থেকে একটি নতুন সংগঠন গড়ে তুলবে। এই সংগঠন প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তার সঙ্গে ধর্মহীন শক্তির মোকাবিলা করবে।
৩. আমাদের যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে, তারা জামায়াতের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়াব এবং সম্পূর্ণ নতুনদের হাতে জামায়াতকে ছেড়ে দেব। অর্থাৎ একটা নিউ জেনারেশন জামায়াত হবে এটি। তিনি এও উল্লেখ করেন, প্রথম পদক্ষেপটি নেয়া হবে চরম বোকামি।
সূত্র জানায়, জামায়াতে সংস্কারের লক্ষ্যে সম্প্রতি দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরামর্শ আমলে নিচ্ছেন নেতারা। জামায়াতের মহানগরীর এক নেতা প্রতিবেদককে বলেন, এভাবে দল পরিচালনা করে ক্ষতি ছাড়া লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, পুরনো ধাঁচের ইসলামি দলের চেয়ে আধুনিক সমাজকল্যাণ, সুশাসন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক দল তুরস্কের একে পার্টি, মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুড ও মালয়েশিয়ার জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির সাফল্য অনেক বেশি। এশিয়ার কোনো মুসলিম দেশে নির্বাচনে জয়লাভ করতে হলে ইসলামি এজেন্ডা গোপন রাখতে হবে। তাই অবশ্যই এ ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, পৌনে ১০০ বছর জামায়াত বাংলাদেশের মাটিতে ব্যাপক সাংগঠনিক ভিত্তি অর্জন করলেও ভোটারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সমর্থন তৈরি করতে পারেনি।

সূত্র জানায়, ঢাকায় জামায়াত পরিচালিত একটি মাদ্রাসায় এ নিয়ে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেন দেশে অবস্থানরত দলটির সংস্কারপন্থী নেতারা। তারা সংগঠনকে ঢেলে সাজাতে চাইছেন। এ নিয়ে কারাবন্দি নেতাদের সঙ্গে কথা বলারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় দেশব্যাপী অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজ ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার। এ ক্ষেত্রে পেছনে থাকতে হবে জামায়াতকে। ফলে সেই প্লাটফর্মকে রাজনৈতিকভাবে কেউ সরাসরি আক্রমণ করতে পারবে না।

জামায়াতপন্থী এক আইনজীবী নেতা বলেন, বিভিন্ন ইউনিটে বছরের পর বছর ধরে একই ব্যক্তিরা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। এতে কাজের গতি কমে যায়। এছাড়া সংগঠনের সব পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, কেন্দ্রীয় কমিটিতে সব পেশার লোকের প্রতিনিধিত্ব থাকার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তুরস্ক ও মিসরের আলোকে শিক্ষা, সমাজসেবা, স্বাস্থ্য, মিডিয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ছাত্র-আন্দোলনের দিকে নজর দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত নেয়া হয়। দায়িত্বশীলদের শুধু দলীয় পরিচিতি নয়, সামাজিক পরিচিতির প্রতিও গুরুত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে একই সঙ্গে কিছুদিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি রূপরেখা তৈরি করে জামায়াতের প্রভাবশালী শুভাকাক্সক্ষী ও শীর্ষ কারাবন্দি নেতাদের জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয় বলে সূত্র জানায়।

ওই বৈঠকে উপস্থিত এক আইনজীবী নেতা বলেন, শিবিরের মধ্যেও কোনোরকম গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করা হয় না। সর্বক্ষেত্রে চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা হয়। এসব থেকে বের হয়ে এসে অপেক্ষাকৃত সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও কর্মীদের ভোটে নেতা নির্বাচিত করতে পারলে ভালো অবস্থান গড়া সম্ভব। তিনি বলেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জামায়াতকে ঢেলে সাজাতে হবে। চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই ভালো ফল বয়ে আনবে না।

Print Friendly, PDF & Email