আমাদের দেশ কতটা গণতান্ত্রিক?

0
258

চিররঞ্জন সরকার: আমাদের দেশ কতটা গণতান্ত্রিক? ক্ষমতাসীনরা বলবেন- একশ ভাগ গণতান্ত্রিক। আর বিরোধী পক্ষ বলবেন, এক ভাগও না। এটা আমাদের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী পক্ষের চিরাচরিত পরস্পরবিরোধী অবস্থান। আসলেই বাংলাদেশ কতটা গণতান্ত্রিক? এ ব্যাপারে কোনও সমীক্ষা বা গবেষণা নেই। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে হয় ত্রিশ-সত্তর। ত্রিশ ভাগ গণতান্ত্রিক। আর সত্তর ভাগ গণতন্ত্রহীনতা। কিছু কিছু বিষয়ে বাংলাদেশ মোটামুটি গণতান্ত্রিক, যেমন এখানে নিয়মিত নির্বাচন হয় (সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার দোহাই দিয়েও হয়), কিংবা মানুষের চলাচলের স্বাধীনতা আছে। অন্য কিছু ক্ষেত্রে তার গণতন্ত্র বড়জোর আংশিক, যেমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা ফৌজদারি অপরাধ বিচারের ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, কিংবা দুর্নীতি দূর করা যাচ্ছে না, প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান চলে ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছায়, সরকার চলে জনমতের তোয়াক্কা না করে।
তবে একটি ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের ঘাটতি বিস্তর। সেটা হলো মত প্রকাশের অধিকার। এ দেশে এখনও স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বিরাট সমস্যা রয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব, সেনা কিংবা শীর্ষ আমলা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে কথা বলা যায় না। এমনকি ধর্মমত, বিশ্বাস নিয়েও মনখুলে কথা বলার সুযোগ নেই। প্রচলিত স্রোতে গা না ভাসালে, ক্ষমতাবান যে কোনও ব্যক্তির অপকর্ম নিয়ে সোচ্চার হলে সরাসরি জীবনের উপর হুমকি আসে। অনেককে লাশও হতে হয়। গুম হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। অথচ আমরা জানি বাক-স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন!
আমাদের সংবিধানের তৃতীয় ভাগে মৌলিক অধিকার অংশে ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হয়েছে। অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়েছে, ‘(১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আদালত-অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক ও ভাব-প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার, নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
বাকস্বাধীনতার নৈতিক এবং রাজনৈতিক গুরুত্ব বিষয়ে সম্ভবত প্রথম জোরদার যুক্তি দেখিয়েছিলেন দার্শনিক বারুচ স্পিনোজা। ‘থিয়োলজিকাল-পলিটিক্যাল ট্রিটাইজ’-এ তিনি লিখেছিলেন, ‘মানুষ নিজের স্বাধীন চিন্তা এবং বিচারের স্বাভাবিক অধিকার বা সামর্থ্য অন্য কাউকে দিতে পারে না, কিংবা অন্য কাউকে তা দিতে তাকে বাধ্যও করা যায় না। সেই কারণেই, যে সরকার মানুষের মন (অর্থাৎ চিন্তা) নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, সে স্বভাবে দমনমূলক…’ এবং ‘যে সরকার প্রত্যেক মানুষের নিজের কথা বলা এবং জানানোর অধিকার অস্বীকার করে, তা চরিত্রে অত্যন্ত হিংস্র, আর যে সরকার সেই অধিকার স্বীকার করে, তা স্বভাবত সংযত।’
এই যুক্তি আজও প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে। কিন্তু একটা প্রশ্ন উঠবেই- বাকস্বাধীনতার কি কিছু ন্যায্য সীমা আছে? না কি, মানুষকে যা খুশি বলার অধিকার দেওয়া উচিত? ‘হেট স্পিচ’ অর্থাৎ তীব্র হিংস্র কথা বলার অধিকারও কি দিতে হবে? জার্মানিতে হিটলারের ভক্তদের সম্পর্কে কী নীতি বিধেয়? বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী বা জঙ্গিবাদী ও গুণমুগ্ধদের সম্পর্কে?
স্পিনোজা এ বিষয়েও ভেবেছিলেন। তিনি উল্লিখিত গ্রন্থেই লিখেছিলেন, নাগরিকদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য বটে, কিন্তু ‘অ-নিয়ন্ত্রিত বাকস্বাধীনতা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই ভেবে দেখতেই হবে, রাষ্ট্রের সুস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রত্যেক মানুষকে এই স্বাধীনতা কত দূর দেওয়া চলে।’ অর্থাৎ বাকস্বাধীনতার সীমার প্রয়োজন তিনিও মেনে নিয়েছিলেন। যেমন, কোনও বক্তৃতা, বই, শিল্পকলা বা চলচ্চিত্র যদি বড় আকারের হিংসা, রক্তপাত বা নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে এবং তার ফলে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব বা স্থিতি বিপন্ন হয়, তবে হয়তো তার প্রচার বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত করা দরকার।
আর এসব শর্তকে পুঁজি করে আমাদের দেশে বেশ কিছু আইন হয়েছে যেগুলো দমনমূলক। অতীতে ‘জনজীবনে গোলমাল পাকানো’ (পাবলিক মিসচিফ), ‘ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা’, ‘যথেচ্ছ প্ররোচনা’, ‘সম্মানহানি’ ইত্যাদিতে রাষ্ট্র খুব একটা মাথা ঘামাত না। তখন রাষ্ট্র ক্ষমতাকে নয়, মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেই অধিক গুরুত্ব দিতো। কিন্তু কালক্রমে ‘জনজীবনে শৃঙ্খলা’ বা ‘জনপরিসরের নৈতিকতা’র ধারণাগুলোর পরিধি খুব বেশি প্রসারিত, সেগুলো ব্যবহার করে বিরুদ্ধমত ও সমালোচনা দমনের অনেকটা ক্ষমতা রাষ্ট্র নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আদালতের ক্ষমতা তুলনায় কমে গেছে।
এদেশে এখন স্বাধীন মত প্রকাশ অত্যন্ত বিপজ্জনক স্তরে উপনীত হয়েছে। মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন মত প্রকাশ করলেই এক শ্রেণির মানুষ হৈ হৈ করে উঠছে। এদেশের লেখক-বুদ্ধিজীবীরাও এখন সবার মন রক্ষা করে, সব রকম ঝামেলা এড়িয়ে, কোনও পক্ষকে না চটিয়ে মত প্রকাশের এক আশ্চর্য কৌশল রপ্ত করেছেন। মৌলবাদীদের চটানো যাবে না, সরকারকে চটানো যাবে না, ক্ষমতাধর কারও নামে কিছু বলা যাবে না-এমনি অসংখ্য ‘না-শাসিত’ বাক-স্বাধীনতা নিয়ে এক দুর্বল গণতান্ত্রিক আবহে বসবাস করতে আমরাও অভ্যস্ত ও ‘সহনশীল’ হয়ে উঠছি! মৌলবাদীদের দাবির মুখে পাঠ্যপুস্তক ‘সাম্প্রদায়িকীকরণ’ করা হলো, আমরা সইছি। এখন তারা হাইকোর্টের সামনে স্থাপিত মূর্তি ভেঙে ফেলার দাবি তুলছে, আমরা সইছি!
মৌলবাদী চক্র ছাড়া সরকার সবার বিরুদ্ধেই আক্রমাণাত্মত হয়ে উঠছে। সরকারের এই ভূমিকা মতামতের অবাধ প্রকাশে বাধা পড়ছে। কিন্তু তাতে কার কী?
ওদিকে আমাদের জাতীয় নেতাদের ‘দেবতার’ আসনে বসানো হয়েছে। আজকের বাংলাদেশে আমাদের বীরদের সম্পূর্ণ নিখুঁত বলে মনে করতে বাধ্য করা হচ্ছে। তাদের সম্পর্কে একটু সমালোচনা হলেই এক শ্রেণির মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। আমাদের জাতীয় নেতারা সবাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের তাৎপর্য বোঝার জন্য অনেক বই, নাটক, চলচ্চিত্র সৃষ্টির প্রয়োজন, অনেক দিক থেকে তাদের দেখা এবং দেখানো আবশ্যক। কিন্তু কোথায় সেই লেখক এবং নাট্যকাররা, যারা নির্ভয় নিরপেক্ষতায় এই নায়কদের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার কথা লিখতে পারেন, সাহস এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্বভাবের সমস্যার দিকগুলোকে, অন্ধবিশ্বাসগুলোকেও চিহ্নিত করতে পারেন? আর ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় নানা চরিত্র সম্পর্কে যদি খোলামেলা আলোচনা করা না যায়, সেটা আমাদের গণতন্ত্রের স্বাস্থ্যের পক্ষে মোটেই শুভ হতে পারে না।
একটি আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন গণতন্ত্রে ‘প্রত্যেক পুরুষ বা নারীর যে কোনও মত পোষণ বা প্রয়োগ করার স্বাধীনতা থাকা উচিত, যতক্ষণ না তার জোরে তিনি কারও বিরুদ্ধে শারীরিক হিংসা ব্যবহার করছেন বা শারীরিক হিংসার পক্ষে সওয়াল করছেন।’ এই মাপকাঠিতে আমাদের গণতন্ত্র বাকস্বাধীনতার পরীক্ষায় পাস করবে না। একটা সুপরিণত গণতন্ত্রে কোনও বই কারও পছন্দ না হলে তার একটাই সদুত্তর হতে পারে- আর একটা বই। একটা সিনেমার বিষয় বা শৈলী সমর্থন না করলে সেটা না দেখলেই চলে। অথচ এ দেশে কোনও গোষ্ঠী কোনও কিছু অপছন্দ করলেই তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করাতে নানা অসদুপায়ের আশ্রয় নেয় ও প্রায়শই সফল হয়। এটাই প্রমাণ করে, আমাদের গণতন্ত্র পরিণতি থেকে কত দূরে। বস্তুত, শিল্পী বা সাহিত্যিক হিংসায় প্ররোচনা না দিলেও তার কণ্ঠস্বর বন্ধ করার জন্য হিংসার পথ নেওয়া হয়-মত প্রকাশের স্বাধীনতার সংজ্ঞাটাকে বাংলাদেশে আমরা উল্টে দিয়েছি!
সরকার ক্রমেই রক্ষণশীল, স্পর্শকাতর, অসহিষ্ণু এবং বলতেই হবে রসবোধহীন হয়ে উঠছে। সামান্যতেই অসামান্য প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। অথচ ধর্মীয় ইস্যুতে মতলববাজরা মিথ্যাচার, গুজব, ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্ররোচিত করে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে ফেললেও সরকার অত্যন্ত ‘সহনশীল’। গাইবান্ধার সাঁওতালপল্লী উচ্ছেদে রাষ্ট্রের পুলিশ আগুন ধরিয়ে দেয়! কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তা ভাবা যায়?
সত্তর ভাগ অগণতন্ত্রের দেশে এর বাইরে কী-ই বা আর আশা করা যায়?
লেখক: কলামিস্ট

Print Friendly, PDF & Email