উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ ও কিছু কথা

0
323

ওয়ালিউর রহমান: ১০ আগস্ট, সোমবার ব্র্যাক সেন্টারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ একটি সভা করে। যারা অংশগ্রহণ করেছেন তারা সমাজের একটি বড় বোদ্ধাগোষ্ঠী এবং সবাই সুশাসনের জন্য উদ্বিগ্ন। তারা পৃথকভাবে কিছু মতামত ব্যক্ত করেছেন। এই উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ প্রায় চার মাস আগে যখন বেগম খালেদা জিয়া তার নিজ অফিস কক্ষে স্বইচ্ছায় বন্দী থেকে বাংলাদেশের জনগণের ওপর যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। তাতে দেশের মানুষকে যে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, বাসে আগুন দিয়ে একসঙ্গে ৬০ জনকে মারা হয়েছে, রংপুরের মিঠাপুকুরে মায়ের কোলে সন্তানসমেত পুড়িয়ে মারা হয়েছে, ৫০০ স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ৫০০ বাস, বিআরটিসি গাড়ি থেকে অটোরিকশা পর্যন্ত বিভিন্ন রকমের যানবাহন পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে, অগণিত পুলিশ হত্যাসহ করা হয়েছে আরও অনেক অপরাধ। ওই রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের সময় ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ একেবারে নিশ্চুপ ছিল। আবার অনেক দিন পর তাদের মুখে কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা শুনতে পেলাম। বেগম জিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সে সময় এই সংস্থা গণতন্ত্র নিয়ে সত্যিকার অর্থে কোনো কথা বলেনি। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি এক সভায় বলেন, ‘আমরা যখন ক্ষমতায় এসে সব কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছি, মুক্তবুদ্ধি চর্চার সুযোগ করে দিয়েছি তখন যেন তাদের (সমালোচক) বুদ্ধির দুয়ার খুলে যাচ্ছে, যতই তারা গণতন্ত্র পাচ্ছেন, আরও চাই আরও চাই, করতে থাকেন। আর এই আরও চাইয়ের যে ক্ষতিকারক দিকটা সেটা তারা চিন্তাও করছে না। এটা করতে গিয়েই কিন্তু মাঝখানে আরেকটা ধাক্কা এসেছিল। তিনি বলেন, আমরা চেয়েছি, সমালোচনা হোক। সেই সমালোচনা গঠনমূলক হবে। সেই সমালোচনা যেন কেউ বিকৃত না করে। মানুষকে বিভ্রান্ত না করে। যতটুকু ভালো কাজ করেছি, সমালোচনার সঙ্গে সঙ্গে সেটুকুও বলার যেন সাহস থাকে।’ শত নাগরিক নামে একটি গোষ্ঠী আছে যেটি বর্তমানে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার থিঙ্কট্যাঙ্ক এবং তার চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছেন, তাদের বেশ কিছু সদস্য এখানে আছেন বলে মনে হয়, তবুও ভালো যে, ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ এ বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তাদের মতামত প্রকাশ করে। দেশবাসীকে আলোকিত করার চেষ্টা করে। ‘ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সম্প্রতি ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে নাগরিক সমাজের একদল নেতার বৈঠক থেকে সংবিধান সংশোধনে সংস্কার কমিশন গঠনের প্রস্তাবের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এই কথাগুলো বলেন তাদের চেহারা আমি যখন দেখি তখন দেখতে পাই এরাই এক সময় ওই অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী মিলিটারি ডিক্টেটরদের উপদেষ্টা হয়েছেন। কেউ তাদের সঙ্গে চাকরি করেছেন, কেউ তাদের পদলেহন করেছেন, তাদের কাছ থেকে একটু করুণা ভিক্ষার জন্য ধরনা দিয়ে পড়ে থেকেছেন। তখন কিন্তু তাদের এই চেতনাগুলো ছিল না। মনে হচ্ছে, চেতনার দুয়ারটা যেন তখন বন্ধ ছিল।’ আমি উদ্বিগ্ন সমাজের অনুমতি নিয়ে কয়েকটি কথা লিখতে চাই এবং তা নিজ ভাবনা থেকে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চাই। ১. যখন তারা গণতান্ত্রিক ঐক্যের কথা বলছেন তখন আমি সেই ঐক্যের ডাকের ভিতরে কোনো রকমের সততা দেখতে পাই না। ২. আগস্ট মাস শোকের মাস। ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল, মেরে ফেলা হয়েছিল তার পরিবারের সবাইকে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চার নেতাকে খুন করা হয়েছিল জেলের ভিতরে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা ছিল এক বিরল ঘটনা। যেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলো সেদিনই বেগম খালেদা জিয়া আড়ম্বর করে তার জন্মদিনের কেক কেটে রাত-দিন ভরে উদযাপন করেন। এটা কি ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের’ চোখে পড়েনি? তারা কি এসব বিষয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন না? ৩. মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হন, দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতহানি হয়। এখন যে লক্ষ্যে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ কথা বলতে পারছেন, তখন কোথায় ছিলেন তারা, তখন কেন কথা বলেননি? ৪. জাতীয় নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সাংবিধানিক মতে। কিন্তু বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দাবি করলেন যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি ইস্তফা দেন তাহলে তিনি নির্বাচন করবেন, না হলে তিনি নির্বাচন করবেন না। গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এটা কোথায় আছে যদি ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ জানান তাহলে দেশবাসী উপকৃত হবে। ৫. বঙ্গবন্ধুকে খুনের পর জিয়াউর রহমান খুনিদের বাংলাদেশের কোর্টে বিচার না করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেন কূটনীতিক হিসেবে। তাদের মধ্যে একজনকে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করেছিলেন। ইনডেমনিটি আইন করলেন, খুনিদের দেশের কোনো কোর্টে বিচার করা যাবে না। একজন খুনিকে বিরোধীদলীয় নেতা করা হলো।

এসব ব্যাপারে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’-এর কোনো সদস্য একবারও ভাবেননি। জিয়াউর রহমানের কর্মকাণ্ড কী ছিল? তা নিয়ে তারা কোনো উচ্চবাচ্য করেননি কোনো সময়। ৬. বিএনপি-জামায়াত আজ যুদ্ধাপরাধী বিচারকাজ মেনে নিতে পারছে না, এই দলের অনেকেই এই বিচার প্রক্রিয়া গ্রহণ করেনি। ৭. তাই আমি গণতন্ত্র প্রক্রিয়ার কথা বলব। তখন আমাদের সবাইকে বলতে হবে আমরা কে কোথায় ভুল করেছি। তাছাড়া মনে হচ্ছে আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী আমাদের ওপর তাদের অবিশ্বাস। আর সব আক্রোশ হলো শুধু এক ব্যক্তির ওপর। তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারা জানে যে, একমাত্র শত্রু হলেন ঘুরেফিরে শেখ হাসিনা। তিনিই হলেন এই দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। তার সুদৃঢ় পদক্ষেপেই দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চলছে। তিনিই বেগম জিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করতে পেরেছিলেন। তিনিই হেফাজতে ইসলামের বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়ে খালেদা জিয়ার ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করেছিলেন। কই, তখন এই ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ কোথায় ছিল? কারণ ওখানে যে বেগম জিয়ার আশীর্বাদ ছিল। তারা গুণী, আমি অতি ক্ষুদ্র। আশা করি তারা বুঝবেন। সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, কোরিয়ার সিং ম্যানরি- তারা ১০ থেকে ২০ বছর পরিশ্রম করে তাদের দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে এসেছেন। আলোচনার পরিশেষে একটা কথাই বলতে চাই, আমরা গণতন্ত্র চাই। আর তার ফলশ্রুতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আজও চলছে এবং চলবে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত, পররাষ্ট্র সচিব, গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

Print Friendly, PDF & Email