এসব কী হচ্ছে সর্বোচ্চ আদালতে!

0
305

ডক্টর তুহিন মালিক:

এক. সুপ্রিম কোর্ট হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর মধ্যে মাত্র ছয়-সাতজন বিচারপতি আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু কিছু দিন ধরে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি এবং প্রধান বিচারপতির মধ্যে ঘটে যাওয়া বাহাসে পুরো বিচার বিভাগ বিব্রত। আপিল বিভাগের এক বিচারপতিকে ব্রিটিশ নাগরিক উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি তার রায় লেখা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বিচারপতির বেতন, পেনশন ও সব সুযোগ সুবিধা বন্ধ রাখার আদেশ দান করেন। এ নিয়ে চিঠি, পাল্টা চিঠি, মানহানির অভিযোগ, প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন ও বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অযোগ্যতার অভিযোগ আনা হয়। সবশেষে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান বিচারপতির অভিশংসন (অপসারণ) চেয়ে সেই বিচারপতির চিঠি পাঠানোর ঘটনা শুধু বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাতেই নতুন নয়, বরং এটি বিশ্বে বিরল একটি ঘটনার জন্ম দিয়েছে।

দুই. তবে প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধান বিচারপতির অভিশংসন (অপসারণ) চেয়ে আপিল বিভাগের বিচারপতির চিঠি বঙ্গভবনে পৌঁছার আগে কী করে দেশবাসীর হাতে চলে এলো? শুধু তাই নয়, এর আগেও আপিল বিভাগের সংক্ষুব্ধ সেই বিচারপতিকে লেখা প্রধান বিচারপতির পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারের চিঠি এবং তার পাল্টা চিঠিগুলো কী করে গণমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের কাছে এত দ্রুতগতিতে চলে গেল তা-ও প্রশ্নবিদ্ধ! যেখানে বিচার বিভাগের গায়ে অবমাননার আঁচড় লাগলে ছয় মাসের কারাদণ্ড মাথা পেতে নিতে হয়, সেখানে প্রধান বিচারপতিসহ পুরো বিচার বিভাগকে হাসি-তামাশায় রূপান্তর করে এহেন বালখিল্য সৃষ্টি করা কি কোনো অবমাননার পর্যায়ে পড়ে না? আমরা যারা সর্বোচ্চ আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত, তারা উঠতে-বসতে মাননীয় আদালত এবং এর সম্মানিত বিচারপতিগণকে সর্বোচ্চ সম্মান ও ভক্তি প্রদর্শন করতে গর্ববোধ করি। তা ছাড়া আমরা যারা সংবিধান, আইন, আদালত ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে পত্রিকার কলামে ও টিভি টকশোতে কথা বলি, তারাও খুবই সতর্কতার সাথে অবমাননার বিষয়টিকে লক্ষ রাখি। কিন্তু সেই পবিত্র আদালতের বিচারকেরা স্বয়ং নিজেরাই যখন কাদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত হন, তখন দেশের মানুষের সাথে আমরাও ভীষণভাবে কর্দমাক্ত হয়ে যাই।

তিন. এই ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি। প্রায় মাসখানেক ধরে দুই বিচারপতির মধ্যে চিঠি চালাচালি আর নানা বাহাস চলেছে। আইন অঙ্গনে এমন কি কেউ ছিলেন না এগুলো থামানোর জন্য? বার ও বেঞ্চের যারা অভিভাবক, সাবেক ও সিনিয়র বিচারপতিগণ, অ্যাটর্নি জেনারেল, আইনমন্ত্রী, বার কাউন্সিল কিংবা সুপ্রিম কোর্ট বারের নেতৃবৃন্দ এত দিনেও কেন কোনো পদক্ষেপ নিলেন না? প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট বিচারপতি তো আর আইন অঙ্গনের বাইরের কেউ নন। সময়মতো এ দ্বন্দ্বটি নিরসন করতে পারলে বিচার বিভাগে এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো মানুষের কানে পৌঁছত না।

চার. প্রায় ১৮ বছর আগের একটি ঘটনা। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বস্তিস্থাপন করলে শ্রদ্ধেয় প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল স্যার ও বিচারপতি ফজলুল করিম এগিয়ে আসেন সুপ্রিম কোর্টকে সমুন্নত রাখতে। এই ঘটনায় বার, বেঞ্চসহ পুরো আইন অঙ্গন সুপ্রিম কোর্টের মর্যাদার প্রশ্নে তখন আপসহীন ছিলেন। তখন বার কাউন্সিলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবী সমন্বয় পরিষদ ক্ষমতায় থাকলেও বিচার বিভাগের মর্যাদার প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঔদ্ধত্যকে কেউ মেনে নিতে পারেননি। আমাদের আইন অঙ্গনসহ পুরো দেশের কীর্তিমান একজন মানুষ ছিলেন প্রয়াত ব্যারিস্টার সৈয়দ ইসতিয়াক আহমেদ। তার মৃত্যুর অল্প ক’দিন আগে এনেক্স বিল্ডিং থেকে সুপ্রিম কোর্ট বারের ব্রিজের গোড়ায় লাঠি হাতে দুর্বল ইসতিয়াক স্যারকে হেঁটে আসতে দেখে আমি দৌড়ে তার কাছে ছুটে গেলাম। অন্য সিনিয়রদের মতোই তিনি আমাকে অসম্ভব স্নেহ করতেন। আমার ঘাড়ে হাত রেখে হাঁটতে হাঁটতে স্যার আমাকে বললেন, প্রফেশন আর কোর্টের এখন যা অবস্থা চলছে, তোমাদেরই এটাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। দীর্ঘ দিন পর ভাবছি, এই মহান ব্যক্তিরা তখন যা ভেবেছিলেন, আমরা এখন তা ভাবছি।

পাঁচ. আপিল বিভাগের যে বিচারপতি প্রধান বিচারপতির অভিশংসন (অপসারণ) চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে নবম জাতীয় সংসদের ১৪তম অধিবেশনে তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ রুলিং দিয়েছিলেন। স্পিকার তখন কটাক্ষ ভাষায় বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষ বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।’ তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদ আজ বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি। আবার তার কাছেই আজকে প্রধান বিচারপতির অভিশংসন (অপসারণ) চেয়ে আবেদন করেছেন রুলিং পাওয়া সেই বিচারপতি। অর্থাৎ প্রধান বিচারপতি ও আপিল বিভাগের এই বিচারপতি, উভয়ের বিরুদ্ধেই এখন অভিশংসনের (অপসারণ) দু’টি আবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে বিবেচনাধীন রয়েছে। কিন্তু সংবিধানের সর্বশেষ ষোড়শ সংশোধনী পাসের পর এখন দেশের সব বিচারপতির ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এমপিদের হাতে। তার মানে, সরকার যাকে চাইবে তাকেই অপসারণ করবে। আর যাকে রাখতে চাইবে তার বিরুদ্ধে শত অভিযোগ দাখিল করলেও কোনো কাজ হবে না।

লেখক: সুপ্রিম কোর্টের আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

E-mail: drtuhinmalik@hotmail.com

Print Friendly, PDF & Email