গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি

0
415
এমাজউদ্দীন আহমদ: সমাজে সংস্কৃতি-চেতনা প্রাণবন্ত না হলে গণতন্ত্র লাভ করে না এর কাঙ্ক্ষিত গভীরতা। প্রবেশ করে না সমাজ-জীবনের গভীরে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে তা জীবনব্যবস্থারূপে জনগণের নিজস্ব কর্মধারায় রূপান্তরিত হয় না।
সংস্কৃতি যেমন ব্যক্তিকে ছাপিয়ে হয়ে ওঠে সমগ্রের এক বিশিষ্ট পরিচয়, গণতন্ত্রও সৃষ্টি করে সমাজে বলিষ্ঠ এক জীবনবোধ। সমাজ-জীবনে আনে সৃজনশীলতার প্রাণবন্যা। দুই-ই চলে পাশাপাশি, হাত ধরাধরি করে। একটি পিছিয়ে গেলে অন্যটি হাত বাড়ায় সহায়তার। হাত ধরে তোলে পড়ে গেলে। পরস্পরের দ্যুতিতে হয় উজ্জ্বল। এ দিক থেকে বলা যায়, সংস্কৃতি ও গণতন্ত্র একে-অপরের ওপর নির্ভরশীল।
গণতন্ত্রের ব বেড়ে ওঠা অথবা সৌন্দর্য বাড়ানো গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে কাঠামো ছাপিয়ে গণস্বার্থের অন্তরঙ্গ রসে সিক্ত চেতনার ওপর। গণতন্ত্র এক দিকে যেমন এক আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা সিস্টেম, অন্য দিকে তেমনি তা গণস্বার্থ তুলে ধরার এক প্রক্রিয়া বা প্রসেস। গণদাবির প্রতি মাথানত করার প্রক্রিয়া।
জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা ধারণ করে। মানবাধিকার নিশ্চিত করে। সাম্য, মৈত্রী, সৌভ্রাতৃত্বের মতো মানবের সনাতন দাবি মাথায় নিয়ে পথ চলে। প্রক্রিয়া হিসেবে গণতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় সর্বাধিক সংখ্যক ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করে। ব্যক্তিগত বুদ্ধির পরিবর্তে সামগ্রিক প্রজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল হয়। দৈহিক বলের বদলে মানসিক শ্রেষ্ঠত্বকে শ্রেষ্ঠজ্ঞান করে। এভাবে সংস্কৃতি রাজনীতির সাথে যুক্ত হয়ে গণরাজনীতির পথ সুগম করে। গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করে।
গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে তাকিয়ে তাই গণতন্ত্রের পরিচয় লাভ করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রের পরিচয় পেতে হলে দৃষ্টি দিতে হয় কাঠামোর অভ্যন্তরে স্পন্দিত অন্তঃকরণের দিকে, কাঠামো ছাপিয়ে যে মনন জাগ্রত হয় তার দিকে। কাঠামো রচিত হয় বাইরের চাপে, দাবি-দাওয়ার প্রবল ঝড়ের মুখে। গণতান্ত্রিক কাঠামোর অভ্যন্তরে অন্তঃকরণ কিন্তু উজ্জীবিত হয় উদারতার নীল আকাশের স্পর্শে, সৃজনশীলতার স্রোতস্বিনীর কোমল পরশে।
সত্যি বটে, গণতন্ত্র ও সংস্কৃতি দুয়েরই শুরু ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে। ব্যক্তিজীবনকে সুন্দর ও সুরুচিসম্পন্ন করেই সংস্কৃতি হয়েছে অর্থপূর্ণ। ব্যক্তিত্বের সুষম বিকাশ ঘটিয়ে, ব্যক্তিকে সঙ্কীর্ণতার অন্ধকার থেকে আলোয় টেনে এনে, সবার সাথে চলার এবং বলার জন্য উপযোগী করে সংস্কৃতিই ব্যক্তির সামনে সম্ভাবনাময় উন্নত সামাজিক জীবনের সিংহদ্বার উন্মুক্ত করেছে। গণতন্ত্রও সেভাবে ব্যক্তিকে তার সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিত্বের গুহা থেকে টেনে এনে মিলিয়েছে সমাজের বিস্তীর্ণ উপত্যকায়। তাই দেখা যায়, উন্নত সংস্কৃতির ঘাটে ভিড়েছে সাম্য, স্বাধীনতা ও সৌভ্রাতৃত্বের সোনার তরী। যে সমাজে সংস্কৃতির মান এখনো উন্নত নয়, সেখানে গণতন্ত্রের যাত্রাপথ এখনো বন্ধুর, এখনো পিচ্ছিল। গণতান্ত্রিক কাঠামো থাকবে, থাকবে না গণতন্ত্রের প্রাণরস। থাকতে পারে নির্বাচন, কিন্তু সে নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে না গণইচ্ছা।
সংসদ থাকতে পারে, থাকবে না শুধু সংসদীয় দায়িত্বশীলতা। থাকবে হয়তো মন্ত্রিপরিষদ, কিন্তু না-ও থাকতে পারে মন্ত্রীদের দায়বদ্ধতা। সবাই হয়তো জনগণের কথা বলবেন, তাদের কার্যক্রমে কিন্তু থাকবে না জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। এমন বিকৃতি দেখা দিলে তা হবে সীমাহীন দুর্ভোগের কারণ। স্বৈরতন্ত্রে পচন ধরলে তা হয় পুঁতিগন্ধময়। সবাই ঘৃণায় তখন তা থেকে দূরে সরে যায়। গণতন্ত্রে বিকৃতি দেখা দিলে বহু দিন পর্যন্ত কিন্তু তা লোকচক্ষুর গোচরে আসে না। যখন আসে তখনো তা তেমন ঘৃণার উদ্রেক করে না। তাই বলছি, উন্নত সংস্কৃতির সৌরভে গণতন্ত্র প্রাণবন্তু হোক। সব বিকৃতির ঊর্ধ্বে উঠে হোক গৌরবময়।
সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে, সমাজ-জীবনের তীর ঘেঁষে, ইতিহাসের স্রোতোধারায় অভিজ্ঞতার বালুকণার মধ্যে স্বর্ণরেণুর মতো। ইচ্ছামতো সংস্কৃতি তৈরি করা যায় না। কারো নির্দেশ বা খেয়ালখুশিমতো তো নয়ই। জাতীয় জীবনের প্রয়োজনমাফিক দরজি বা কারিগরের হাতে সংস্কৃতির কাটছাঁটও সম্ভব নয়, যদিও যুগে যুগে একনায়কেরা কিছুসংখ্যক পশ্চাৎগামী ও পরাশ্রয়ী বুদ্ধিজীবীকে এ কাজে ব্যবহার করেছেন। সমাজের উর্বর ক্ষেত্র থেকে সংস্কৃতির চেতনা উঠে আসে এবং সমাজ-জীবনের দু’কূল ছাপিয়ে তা জাতীয় সংস্কৃতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। জাতীয় সম্পদে রূপান্তরিত হয়। এ সম্পদে যে জাতি সমৃদ্ধ, সে জাতি প্রকৃতই গণতান্ত্রিক।
গণতন্ত্রের প্রধান অঙ্গীকার হলো সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তিকে ‘পরিপূর্ণ, স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন একক’ হিসেবে অনুধাবন করা। প্রত্যেক ব্যক্তি স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অনন্য। তাই গণতন্ত্রে নেই কোনো শাসক, নেই কোনো শাসিত। শুধু রয়েছে শাসনব্যবস্থা পরিচালনা এবং তা জনগণের সম্মতি সাপেক্ষে। গণতন্ত্রের আরেকটি অঙ্গীকার আইনের প্রতি আনুগত্য, কোনো ব্যক্তিসমষ্টির নির্দেশের প্রতি নয়। এ দিক থেকে বলা যায়, গণতন্ত্র হলো আইনের শাসন। জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশ নেয়ার মাধ্যমে যে বিধিবিধান রচিত হলো শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য তাই মুখ্য নিয়ামক, অন্য কিছু নয়।
গণতন্ত্রের এসব অস্বীকার সমাজ-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হলে গণতন্ত্রের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে। উপনিবেশ-উত্তর রাষ্ট্রগুলোতে অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়ে এসব সমাজ যেমন স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিকশিত হতে পারেনি, তেমনি সমাজ চেতনা এবং সংস্কৃতিও গড়ে ওঠেনি সুষ্ঠুভাবে, সব কিছু যেন দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। সব কিছুই এলোমেলো। আত্মরক্ষার প্রবণতায় শুধু যে তা রক্ষণশীল হয়েছে তাই নয়, হয়ে উঠেছে অনেকটা স্ববিরোধী, কৃত্রিম এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই খণ্ডছিন্ন, শতধাবিভক্ত। ধর্ম, বর্ণ, আঞ্চলিকতার সঙ্কীর্ণ গণ্ডিতে হয়েছে আবদ্ধ। মানবিক স্বার্থের দ্যুতিতে এখনো উজ্জ্বল হয়ে ওঠেনি। গণতন্ত্রের যাত্রাপথ তাই এসব সমাজে সহজ হয়নি, সরল হয়নি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনকারীদের একাংশ গণতান্ত্রিক পন্থায় অগ্রসর হতে দ্বিধা করে না। দায়িত্বশীলতার দোহাই দিয়ে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, কিন্তু অচিরেই সে নেতৃত্বও দায়িত্বহীনতার পক্ষে হয় নিমজ্জিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলনকারীদের একাংশ অগণতান্ত্রিক উপায়ে অগ্রসর হতে দ্বিধা করে না। দায়িত্বশীলতার দোহাই দিয়ে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, কিন্তু অচিরেই সে নেতৃত্বও দায়িত্বহীনতার পঙ্কে হয় নিমজ্জিত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্লোগানে কিছু দিন আগে যারা ছিলেন সোচ্চার, তাদের বড় এক অংশ বেআইনি কর্মে হয়ে পড়েন লিপ্ত শুধু সংস্কৃতি-চেতনার অভাবে অথবা অপরিণত সংস্কৃতির প্রভাবে।
গণতন্ত্রের বড় শত্রু গণতন্ত্রীরাই, বিশেষ করে তাদের নেতৃস্থানীয়রা। এসব সমাজে গণতন্ত্র বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে তাদেরই হাতে, যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এক সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন। নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে তারা ক্বচিৎ উঠতে পারেন। সরকার পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন তারা সহ্য করেন না বিরোধী দলকে। বিরোধী দল সহ্য করে না সরকারকে। তীব্র অসহিষ্ণুতার মরুভূমিতে গণতন্ত্রের ধারা হয় নিঃশেষ অথবা প্রাণহীন। ধারা ক্ষীণগতিতে প্রবাহিত থাকে বটে, কিন্তু তা জীবনব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্পর্কেও জনগণের মনে জাগ্রত হয় এক ধরনের অনীহা, অনাস্থা ও ঘৃণা।
এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সমাজ-জীবনে প্রতিষ্ঠা করা। যারা তা করতে পেরেছে, গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করার সংগ্রামে তারা জয়ী হয়েছে। এ শতকের শেষপ্রান্তে তাই গণতন্ত্রায়নের যে ধারা প্রবাহিত হচ্ছে তার স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির উন্নত মানের। প্রয়োজন উদার মনোভাবের সাথে গণতান্ত্রিক কাঠামোর সংমিশ্রণ। প্রয়োজন সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রচর্চার ধারাকে অব্যাহত রাখা।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে। সজ্ঞান উদ্যোগে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি রাতারাতি বিনির্মাণ করা সম্ভব নয়। সম্ভব নয় কারো নির্দেশে সংস্কৃতির কাঠামো রচনা করা। সম্ভব নয় বিশেষ কারো ইঙ্গিতে সংস্কৃতির প্রবাহকে নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত করা। সংস্কৃতি গড়ে ওঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে, সামাজিক জীবনের স্রোতোধারায় জমে ওঠা বালুকণার মধ্যে স্বর্ণরেণুর মতো। গড়ে ওঠে রাজনৈতিক জীবনের প্রতি বাঁকে বর্তমানকে ধারণ করে এবং ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বহন করে। সংস্কৃতি যেন মন্থরগতি এক স্রোতস্বিনী। প্রবাহিত হয় নিজস্ব ভঙ্গিতে, আপন সত্তার সৃজনশীল ধারায়।
সংস্কৃতি অনড় নয়, নয় স্থবির। যে জনপদে সংস্কৃতি স্থবির হয়ে উঠেছে, সে জনপদও স্থবিরপ্রায়। তার অগ্রযাত্রা রুদ্ধ। নতুন প্রত্যয়ে তা উজ্জীবিত হয় না। নতুন সৃষ্টির সঙ্কল্পে তা হয় না আন্দোলিত। স্রোতহীন বদ্ধ জলাশয়ে শ্যাওলাই জন্মে। পরিবর্তনহীন সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় অপসংস্কৃতির বিকৃতিই মুখ্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল সমাজে, বিশেষ করে উপনিবেশ-উত্তর সমাজে সংস্কৃতিকে সুনির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত করার জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে প্রায়ই দেখা যায়। কোনো সময় জাতীয় পুনর্গঠন বা জাতীয় ঐক্যের নামে, আবার কোনো সময় জাতীয় সংস্কৃতি বিনির্মাণের লক্ষ্যেও এসব উদ্যোগ গৃহীত হয়। গঠিত হয় কমিটি বা কমিশন। সদস্য হন দেশের খ্যাতনামা সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদেরা। রিপোর্টে তারা সমাজের মনমানসিকতার উপযোগী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল রচনার নির্দেশ নিয়ে থাকেন, যেন সংস্কৃতি জামাকাপড়ের মতো। দরজির মতো এসব বুদ্ধিজীবী পরিধেয় পরিচ্ছদের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের মাপ ঠিক করে দেন। কারিগরের মতো নির্দেশ দেন কোথায় তা আলগা হবে আর কোথায় হবে আঁটসাঁট। সংস্কৃতিকে পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের এসব উদ্যোগ অবশ্য গৃহীত হয় অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়। জেনারেল আইয়ুব এবং জেনারেল এরশাদের আমলে আমাদের সমাজে এ ধরনের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ওইসব উদ্যোগও যে সাংস্কৃতিক বিকৃতির লক্ষণ, তা এ সমাজ টের পেয়েছে বারবার।
সংস্কৃতি সম্পর্কে গণতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গি অবশ্য স্বচ্ছ। শত পথ ও শত মতের মধ্যেই গণতন্ত্রের সার্থকতা। শত ফুল ফোটাতেই গণতন্ত্র সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। সহস্র বন্ধনের মাঝেই গণতন্ত্র মুক্তি খোঁজে। যার যা ভালো, তারই সমাবেশ ঘটিয়ে মালা গাঁথে গণতন্ত্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাই সব বিষয়ে কমিশন গঠিত হতে পারে, কিন্তু সাংস্কৃতিক রূপরেখা নির্দিষ্ট করার জন্য বা সংস্কৃতি পুনর্গঠনের জন্য কোথাও কোনো কমিশন গঠিত হতে দেখা যায় না। কোথাও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির রূপ নির্ধারিত হয়নি কোনো কমিশনের সুপারিশে। কোনো কমিশনের রিপোর্টের মাধ্যমে জাতীয় সংস্কৃতি এতটুকু প্রভাবিত হয়নি কোনো সময়।গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মান উন্নত হয় নিরবচ্ছিন্ন সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমে। এ জন্য প্রয়োজন নেই কোনো দরজি বা কারিগরের। প্রয়োজন সমাজচিন্তাবিদদের, রুচিশীল মননশীল কর্মবীরের। প্রয়োজন উদার মনোভাব, সংবেদনশীল মন মানবপ্রকৃতির সঠিক অনুধাবন এবং সমস্বার্থের সুষম বন্ধনে আবদ্ধ থাকার সৃজনশীল মননশীলতা। আমার জন্য যা উত্তম, অন্যের নিকট উত্তম ঠিক তাই। আমার যা প্রয়োজন, অন্যের প্রয়োজনও ঠিক তাই- এ সত্যের অনুধাবনই এ পথের দিশারী। সমাজবিজ্ঞানে এ মনোভাব গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার নামে পরিচিত।
বিশ্বময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুদৃঢ় ভিত্তিই গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার। গণতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতা লাভে আগ্রহী দলই শুধু নয়, সমাজের সর্বত্র এ সত্য স্বীকৃত যে, প্রত্যেক ব্যক্তি ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, আপন সত্তায় উজ্জ্বল, এক অর্থে অনন্য। নিজের কার্য পরিচালনায় সক্ষম। সক্ষম সুশাসন এবং স্বশাসন প্রতিষ্ঠায়। সমাজে এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে জন্ম লাভ করে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং পারস্পরিক বিশ্বাস। জন্ম লাভ করে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে সমঝোতার মনোভাব। গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের এটি হলো প্রথম উপাদান।
সামাজিক সমস্যার বহুবাচনিক দিক সম্পর্কে অবহিত থাকা গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের আরেকটি উপাদান। অসংখ্য স্বার্থের মোজাইকে গড়া সামাজিক জীবন। এসব স্বার্থ কোনো সময় হয়ে ওঠে পরস্পরবিরোধী, প্রতিযোগিতামূলক তো বটেই। এসব ভিন্নমুখী, প্রতিদ্বন্দ্বী স্বার্থের সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হয় বিভিন্ন গ্রুপ ও গোষ্ঠীর মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য; প্রত্যেকে বক্তব্য উপস্থাপন করবে। প্রত্যেকে বক্তব্য উপস্থাপন করবে নির্ভয়ে। প্রত্যেকের বক্তব্য অন্যরা গ্রহণ করবে শ্রদ্ধার সাথে। জাতীয় ঐক্যের কাঠামোয় মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা সর্বজনগ্রাহ্য। পত্রপত্রিকার মুখ খোলা। খোলা থাকবে সাংবাদিকের চোখ-কান। গণতন্ত্র এভাবে পথ চলে। চলে সমগ্র জনসমষ্টি একসাথে। নির্বাক হয়ে নয়, বরং মুখর হয়ে। জনৈক রাষ্ট্রনায়কের কথায়, গণতান্ত্রিক সমাজে বিদ্যমান থাকে ‘হাজারো আলোক কেন্দ্র’ (a thousand points of lights)। ভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর বহুবাচনিক গণতান্ত্রিক সমাজের রূপই এমন। প্রত্যেকের কথা বলবে। প্রত্যেকের থাকবে সুপারিশ করার অধিকার। প্রত্যেকের থাকবে বিরোধিতার অধিকারও।
রাজনীতিসচেতন জনসমষ্টির কাছে সমাজের এই রূপ সুস্পষ্ট হলে সমাজে জন্ম লাভ করবে সহনশীলতা, আপসকামী মনোভাব এবং সবাইকে সাথে নিয়ে অগ্রসর হওয়ার আকাক্সক্ষা। শত দল এবং হাজারো পথের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই শিখবে পথ চলতে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিরোধিতার মাঝেও ঝঙ্কৃত হবে ঐক্য ও মিলনের সুর। রাজনৈতিক সৃষ্টির মান হবে উন্নত। গণতন্ত্র হবে স্থিতিশীল।
 
লেখক : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Print Friendly, PDF & Email