জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস: উদযাপন নিয়ে জটিলতা

3
222

ওয়াহিদুর রহমান ওয়াহিদ, জগন্নাথপুর: ১১ নভেম্বর জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক বাহিনীর কবল থেকে জগন্নাথপুর মুক্ত হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে প্রতি বছরের ১১ নভেম্বর জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন হয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করে গত বছর ১১ নভেম্বরের পরিবর্তে ৯ ডিসেম্বর জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস পালন করে জগন্নাথপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এ নিয়ে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ বছরও দিবসটি উদযান নিয়ে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।
জানাগেছে, ১৯৭১ সালের মে মাসের শেষের দিকে সিলেট থেকে বিশ্বনাথ হয়ে নৌকাযোগে ১০৮ জনের এক কোম্পানী পাক হানাদার বাহিনী জগন্নাথপুর আসে। জগন্নাথপুর এসেই কারফিউ জারী করে থানাসহ সরকারি সকল প্রশাসনের অফিস তাদের দখলে নিয়ে নেয়। পরে স্থানীয় রাজাকারদের নিয়ে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠনের তৎপরতা চালায়। এ সময় উপজেলার ৯ টি ইউনিয়নে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আরেকটি উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির কার্যক্রম সচল রাখার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প করা হয়। জগন্নাথপুর থানায় করা হয় পাক বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প। এখান থেকেই সব কিছু নিয়ন্ত্রন করা হতো। এর পর শুরু হয় নারকীয় হত্যাকাণ্ডসহ নির্যাতনের পালা। প্রতিদিন রাজাকারদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাক বাহিনী সাধারণ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। সুন্দরী মেয়েদের ধরে তাদের ক্যাম্পে এনে ধর্ষন করে হত্যা করতো। মুক্তিকামী লোকদের ধরে এনে অমানুষিক অত্যাচার ও নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। বাজারে-বাজারে গিয়ে তালাবদ্ধ দোকানগুলোর তালা ভেঙে মালামাল লুটপাট করে দোকানপাট আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দিতো। মুক্তিকামী লোকজনের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হতো। শান্তি কমিটির আহবানে সাধারণ জনতাকে জড়ো করে গণহত্যা চালানো হতো। এর মধ্যে সবচেয়ে বর্বর হত্যাজজ্ঞ চালানো হয় উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামসি বাজার ও রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের রাণীগঞ্জ বাজারে। ১৯৭১ সালের ৩১ আগষ্ট জগন্নাথপুর থেকে নৌকাযোগে পাক বাহিনী শ্রীরামসি বাজারে গিয়ে শান্তি কমিটির আহবানে সাধারণ জনতাকে জড়ো করে দুই হাত পিচমোড়া দিয়ে বেধে বাজারের পার্শ্ববর্তী দুই বাড়ির পুকুর পাড়ে নিয়ে সারিবদ্ধভাবে লাইন ধরিয়ে নির্বিচারে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যাজজ্ঞ চালায়। হত্যাকাণ্ডে প্রায় শতাধিক লোক শহীদ হন এবং ভাগ্যক্রমে মৃত লাশের সাথে পুকুরের পানিতে পড়ে কয়েকজন বেঁচে গিয়েছিলেন। একইভাকে ১ সেপ্টেম্বর রাণীগঞ্জ বাজারে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় শতাধিক লোক শহীদ হন এবং ভাগ্যক্রমে মৃত লাশের সাথে নদীর পানিতে পড়ে কয়েকজন বেঁচে গিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে অনেকে এখনো কালের স্বাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন। দীর্ঘ ৭ মাসব্যাপী পাক বাহিনীর তান্ডবলীলা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে হার মানায়। পাক বাহিনী ও রাজাকারদের অত্যাচারের ভয়ে সাধারণ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে যান। তখন মানব শূন্য হয়ে পড়ে জগন্নাথপুর।
এ সময় পাক বাহিনী ও রাজাকারদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে জগন্নাথপুর উপজেলার মুক্তিকামী লোকজন অতি গোপনে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট সংগ্রাম প্রতিরোধ কমিটি গঠন করেন। এ কমিটির সভাপতি ছিলেন পৌর শহরের ইকড়ছই গ্রামের বাসিন্দা জগন্নাথপুর পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হারুনুর রশীদ হিরন মিয়া। যার দুঃসাহসিকতা ও সুযোগ্য নেতৃত্বে সংগ্রাম প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মুক্তিকামী সাহসি যুবকদের দেশ রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করার জন্য সংগঠিত করা হতো। এ সময় দফায়-দফায় মোট ৭১ জন ব্যক্তিকে সংগঠিত করে প্রশিক্ষনের জন্য ভারতের বালাট সাব সেক্টর হেড কোয়ার্টারে পাঠানো হয়। সেখান থেকে রেজিষ্ট্রেশন করিয়ে ভারতের বিএসএফ এর অধীনে ইকো-ওয়ান প্রশিক্ষন কেন্দ্রে দীর্ঘ এক মাস প্রশিক্ষন শেষে জগন্নাথপুর পৌর শহরের ছিলিমপুর গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইনকে কোম্পানী কমান্ডার করে ১৩০ জনের এক কোম্পানী মুক্তিযোদ্ধা দেশে ফিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এভাবে যুদ্ধ করতে করতে তারা ১৯৭১ সালের ৩ নভেম্বর জগন্নাথপুর আসেন। জগন্নাথপুর এসেই তারা ৩ ভাগে বিভক্ত হয়ে পাক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। প্রথমে পাটলি ইউনিয়নের রসুলগঞ্জ বাজার অভিমুখে স্থানীয় রাজাকারদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। এভাবে যুদ্ধ করতে করতে ১১ নভেম্বর সকাল ৬ টার দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ৩ দিক থেকে জগন্নাথপুর থানায় অবস্থিত পাক বাহিনীর প্রধান ক্যাম্পে আক্রমন করেন। এ সময় পাক বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তুমুল সম্মুখ যুদ্ধ শুরু হয়। মূর্হমুহ গুলিবর্ষনে সর্বত্র আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছিল। যুদ্ধের এক পর্যায়ে দুপুরের দিকে যুদ্ধ ছেড়ে পাক বাহিনী পালিয়ে যায়। ওই দিন বিকেলে বাংলাদেশের আনুগত্যতা স্বীকার করে মোট ২৪৭ জন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
এর পর থেকে ১১ নভেম্বর জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের কোম্পানী কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইন জানান, আমার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১১ নভেম্বর জগন্নাথপুর শত্র“ মুক্ত হয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পর থেকে ১১ নভেম্বর জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ করে গত বছর সাবেক জগন্নাথপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল কাদির শিকদার ৯ ডিসেম্বর দিবসটি পালন করে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। তিনি জগন্নাথপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করেছেন। যাহা যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষালম্বন করার শামিল। তাছাড়া ২৪৭ জন রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা চলছে। যা ইতোপূর্বে তদন্ত করা হয়েছে। আমার মৃত্যুর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যেতে চাই।
সাবেক জগন্নাথপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আব্দুল কাদির শিকদার জানান, ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর আমার নেতৃত্বে জগন্নাথপুর শত্র“র কবল থেকে মুক্ত হয়। সুতরাং ৯ ডিসেম্বর জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস পালন করা সঠিক হয়েছে। জগন্নাথপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার আব্দুল কাইয়ূম জানান, ১৯৭১ সালের এই দিনে আমি জগন্নাথপুরে যুদ্ধ করিনি। যে কারণে আমার জানা নেই কোন দিন জগন্নাথপুর মুক্ত হয়েছিল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সকল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কোন দিন জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস পালন করা হবে। জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির জানান, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে কোন তারিখে জগন্নাথপুর মুক্ত দিবস পালন করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

3 মন্তব্য

Comments are closed.