জনস্বার্থ বনাম গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি

0
337

আব্দুল লতিফ:  গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়তে পারে এবং তা বাড়ে বিভিন্ন কারনে- কাঁচামালের দাম বাড়লে, লেভার কস্ট ছাড়াও অন্যান্য কস্ট বাড়লে এবং বাজারের বাড়তি চাহিদা ও মনোপলি ক্ষমতার ব্যবহারের মাধ্যমে মুনাফা বাড়াতে। সব কারন প্রযোজ্য হতে পারে যে কোন ব্যক্তি মালিকদের ক্ষেত্রে কিন্তু সে সব প্রতিষ্ঠানের মালিক সরকার, সেখানে সব শেষ কারন প্রযোজ্য হতে পারে না যেখানে জন স্বার্থ আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িত। পুরনো এক বাংলা সিনেমায় দুই চাকর ভাঁড়ামি করছিল- একজন চাকরকে আরেকজন চাকরের  বউয়ের সাথে প্রেম করতে দেখে প্রথম চাকর বলেছিল-‘ পেরেম পেরেম খেলা, স্বাস্থ্যের লাগি ভালা কিন্তু আমার বউয়ের লগে আমি তোমারে খেলতে দেব না’- বলে প্রেমিক চাকরের মাথায় দিল একটা বসিয়ে। তাই মুনাফার জন্য দাম বাড়ানো যেতে পারে কিন্তু  যে কোন পণ্যের ক্ষেত্রে না। কম পক্ষে সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে যেগুলোর সাথে জনগনের স্বার্থ জড়িত।

মুনাফা অর্জনই ক্যাপিটলিস্ট সোসাইটির উদ্দেশ্য। সোসাইটির মেম্বাররা নিজেদের সর্বশক্তি ব্যয় করে সফলতার চুড়ান্ত শিখরে পৌঁছাতে চায়। তার জন্য সোজা পথে কেউ কেউ চলতে চাইলেও অনেকেই আবার বাঁকা পথও বেছে নেয়। তাদের হাঙরের মত ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে জনগনকে বলি হতে হয় অনেক সময়ই। প্রতিযোগীতা এসব মোকাবেলার মোক্ষম হাতিয়ার হওয়ার পরেও অনেক চালাক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ধরনের কলাকৌশলের আশ্রয় নিয়ে জিনিসপত্রের দাম বাড়ীয়ে দুদিনে কোটি টাকা কামাই করতে চায়। যার উদাহরন আমরা রমজান মাস আসলেই দেখতে পাই। এতে বিত্তশালীদের সমস্যা না হলেও সাধারন নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের চরম বিপদের মধ্যে পড়তে হয়। পরিবারের সদস্যদের মুখে দুবেলা দুমোটো ভাত জুগিয়ে দিতে অনেককেই সর্বসান্ত হয়ে পথে নামতে হয়। আর আমাদের মতো দেশের বিশাল জনগোষ্ঠি এ গ্রুপের মেম্বার। এ বিশাল জনগোষ্ঠির স্বার্থ দেখার কেউ নেই। বড়লোকে বড়লোকে আঁতাত হয়। একটা পেতে কেউ আরেকটা ছাড় দেয়। কিন্তু মধ্য নিম্নবিত্তের সাথে এদের লেনদেনের কিছু নেই। অর্থ বিত্তের মালিকরা তাই সিন্ডিকেট করে এদেরকে শোষনের নতুন নতুন কৌশল বের করে এবং তা বাস্তবায়ন করে আর এতেই তাদের সুখ ও আনন্দ। বিভিন্ন ককটেল পার্টিতে  গ্লাস হাতে এসব নিয়ে তারা হাস্যরস করে আর একজন আরেকজনকে বাহবা দেয়। আর তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। অর্থ বিত্তের প্রতি সবারই মোহ থাকে। আজকের ফূটপাতের পকেটমাররা বিভিন্ন মওকা পেয়ে কাল পাজেরো গাড়ীতে দৌড়াচ্ছে। তবে স্বাভাবিক পুঁজিবাদী সমাজে তা এত সহজ নয়। প্রতিযোগিদের সাথে যুদ্ধ করতে করতে এগুতে হয়। অথচ আমাদের দেশে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া লোক শুধু বাড়ছেই। তার কারন হয়ত অন্য কোন জায়গায়।
কিন্তু জাগ্রত বিবেকের নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার জো নেই। তাদেরকে উন্নয়নের চাকার নীচে প্রতিনিয়ত নিষ্পেষিত হতে হচ্ছে। তাদের দেখার সত্যিই কেউ নেই।উন্নত ও সভ্য দেশগুলোতে সরকার এসব লোকদের স্বার্থ দেখভাল করে। ওসব দেশে সরকার জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয় বলে জনগনের স্বার্থ দেখার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার চেষ্ঠা করে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোকে তহবিলের জন্য বিত্তশালীদের কাছে যেতে হয়, ওদের স্বার্থ সংরক্ষন করতে হয়। কিন্তু তা কখনো জনগনকে শোষন করতে দিয়ে নয় বরং জনগনের স্বার্থ আরো বেশী সংরক্ষন করে। এটা একটা উইন-উইন গেম।

উন্নত বিশ্ব তাদের উন্নত মেকানিজম দিয়ে জনগনের স্বার্থ সংরক্ষন করতে পারলেও আমাদের দেশের সরকার তার হাতে কিছু প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রন রেখে তা দিয়ে জনগনের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্রতী হয়। যদিও তাতে অদক্ষতা, অপচয় ও চৌর্যবৃত্তির কারনে  প্রতিবৎসর জনগনের বিপুল অর্থ বিনষ্ঠ হয়। তার চাপ পড়ে জনগনের উপর।

গ্যাস ও বিদ্যুত দেশের প্রতিটি নাগরিক সরাসরি ভোগ করে। তার পাশাপাশি সবগুলো পণ্য ও সেবা উৎপাদনে গ্যাস ও বিদ্যুত একমাত্র বিকল্প হিসাবে ব্যবহ্রত হয়। তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি মানে প্রতিটি নাগরিকের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং তা হয়ে থাকে প্রতিটি পণ্য ও সেবার মাধ্যমে। সে যা কিনতে যাবে তার জন্য তাকে বেশী দাম দিতে হয়। এবং এভাবে তার জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক গুন বৃদ্ধি পায়।বৃহৎ ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির অজুহাতে তাদের পণ্য ও সেবার দাম অনেক বাড়িয়ে নেবে। এমনকি বাড়ীওয়ালারা তাদের বাড়ীভাড়া বাড়াতে থাকবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই দেখছি প্রতিটি সরকার বিশ্ববাজারে তেলের দাম উঠানামার পরও অনেক অনেক ভর্তূকী দিয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম মোটামোটি ঠিক রাখে। উল্লেখ্য আমাদের দেশে বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য –প্রধানত জ্বালানী তেলই ব্যবহ্ণত হয়ে থাকে। তাই বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেই বিদ্যুতের দাম বাড়ার কথা। কিন্তু সরকার জনগনের কথা ভেবে তা থেকে বিরত থেকেছে। এমনকি দাতা সংস্থাগুলোর প্রচন্ড চাপের মুখে সরকার তাদের কথামত বিদ্যুত ও গ্যাসের দাম বাড়ায়নি। বিভিন্ন সময়ে বাড়িয়েছে তবে তা চাপ দেয়া হার থেকে অনেক কম হারে।
এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সারা বিশ্বে তেলের দাম অর্ধেক হয়ে যাওয়ার পরও সরকার পেট্রোল ডিজেলের দাম মোটেই কমায়নি। তাতে জনগনের যাই হউক সরকারের আয় বেড়েই যাচ্ছে। এই বাড়তি আয় পেতে পেতে এবার সরকার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ালো। যাতে বাড়তি আয়ের টাকায় হাতে নেয়া মেঘা প্রজেক্টগুলো (মেট্রোট্রেন, ওভারব্রিজ পদ্মাসেতু ইত্যাদি) বাস্তবায়িত হয় আর বড়লোকদের গাড়ীগুলো নির্বিঘ্নে চলতে পারে। এরি মধ্যে আবার সরকারী কর্মচারীদের বেতন ১০০% এর বেশী বাড়ানো হয়েছে। উনাদের বাড়তি বেতন  ও দ্বিগুন, তিনগুন হারে উপরি টাকায় বিলাসিতা করতে যাতে সমস্যা না হয়। মেঘা প্রজেক্টের বাস্তবায়ন দেখিয়ে জনসমর্থন বাড়ানো যেতে পারে যদি জনগনের পেঠে আগুন না জ্বলে। যেখানে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা নিরাশার মধ্যে ডুবে আছে সেখানে মেঘাপ্রজেক্টগুলো দেখিয়ে তাদের সমর্থন বাড়ানো যাবে কেমনে আমি জানি না। আজ লক্ষ লক্ষ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের কর্মচারিরা ভয়ে ভয়ে আছে কেমনে সরকারী কর্মচারিদের টাকার ধাপটের মধ্যে নিজেদের স্বল্প আয় দিয়ে জীবন বাঁচাবে। ক্ষুদ্র ও মধ্যম মানের ব্যবসায়ীরা চিন্তায় আছে কেমনে নিজেদের স্বল্প আয়ে সংসারের নূন্যতম প্রয়োজন মেটাবে।এরি মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো মানেই মড়ার উপর খাড়ার গা। তাই নীতিনির্ধারকদের চিন্তা করতে হবে কিভাবে জনজীবনকে সহজ করে তোলা যায়।

সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ব্যবসা প্রশাসন বিভাগ, সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

Print Friendly, PDF & Email