পবিত্র রমজানকে বরণ করার প্রস্তুতি

0
325

আজমল আহমদ: প্রস্তুতি শব্দটির সাথে সবাই কমবেশী পরিচিত। পরীক্ষার প্রস্তুতি, খেলাধূলার প্রস্তুতি কিংবা যেকোন ভালো কাজ শুরু করার প্রস্তুতি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর আমাদের সামনে আসন্ন রহমত, মাগফিরাত, নাযাত ও সব ধরনের পূর্ণ বরকতের মাস রমযান। বিশেষ করে কোটি কালের শ্রেষ্ট দিক-নির্দেশনা পবিত্র আল-কোরআন নাযিলের মাসও এটি। আল্লাহতায়ালা বলেন “রমজান মাস, এতে নাজিল করা হয়েছে পবিত্র আল-কোরআন যা মানুষের দিশারী ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী”। মানবজাতির হেদায়াতগ্রন্থ ও শীর উঁচু করে বাঁচার মূলমন্ত্রটি রমজানে নাজিল হয়ে এই মাসটির মর্যাদা সহ¯্রগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। এটি এমন একটি মাস যেখানে রহমত, বরকত কিংবা কল্যানের কোন অভাব নেই। এমনকি একমাত্র এই মাসেই চিরপাপিষ্ট ও মানুষের প্রধান শত্রু শয়তানকে শৃংখলিত করে রাখা হয়। বন্ধ হয়ে যায় জাহান্নামের দরজাসমূহ আর মালিকের অশেষ কৃপায় মানবজাতির জন্য খুলে দেয়া হয় চির সুখের জান্নাত। সহীহ বুখারির ১৮০০ নং হাদীসে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে- ‘রমজান এলে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করা হয় এবং জাহান্নামের দ্বারসমূহ বন্ধ হয় ও শয়তানকে শৃংখলিত করে রাখা হয়।’ সুতরাং মানবজাতির জন্য এক মহা সুসংবাদ পবিত্র মাহে রমজান। আল্লাহতায়ালা তাঁর বান্দাদের হাজার বছরের নেককার রুপে গড়ে তুলতে এমন একটি মহা সুযোগ লাইলাতুল ক্বদর দিয়েছেন এ মাসেই। যাতে করে ৬০-৭০ বছরের জিন্দেগীর মানুষও ঐ একরাতের আমলগুনে হাজার বছরের পূণ্যআমলের পূণ্যবানের সমমর্যাদাই লাভ করতে পারে। সূরা আল-ক্বদরে বলা হয়েছে- ‘লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ সুতরাং ঘুনে ধরা এই সমাজকে জাগ্রত করতে হলে, ফুলে ফলে সুশোবিত করতে হলে কিংবা ব্যক্তি চরিত্রকে মাধুর্যময় করার জন্য সঠিকভাবে রমজান পালনের কোন বিকল্প নেই। আর তাই প্রয়োজন সঠিক প্রস্তুতি।

এতো বড় একটি নেয়ামতের মাস সামনে পেয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে আমরা কি আমাদের সৎকাজের পুরস্কার পেলাম? যদি এটা ভাবেন তবে ভূল হবে। কারন মনে মনে একটু চিন্তা করুন নিজের অপকর্ম ও পাপের কথা। সবাই আলাদা আলাদা চিন্তা করুন ফলাফল আসবে আমি পাপী। আমি আমি করে যখন মোটের উপর সবাই পাপী তখন পুরস্কার তো অবশ্যই নয়। ইবলিশ শয়তান চ্যালেঞ্জ করে মহান আল্লাহকে বলল- ‘ইয়া রব, তোমার ইজ্জতের কসম, নিশ্চয় আমি তোমার বান্দাদের বিভ্রান্ত করতে থাকব, যতক্ষণ তাদের দেহে প্রাণ থাকবে।’ ঠিক এই কারনেই আমরা অধিকহারে পাপাচারে লিপ্ত। কিন্তু এর পরেই আমরা আশ্বস্থ হই এজন্যই যে, শয়তানের প্রতি উত্তরে মহান আল্লাহ সুবহানুওয়াতায়ালা ঘোষনা করেন – “আমার ইজ্জত ও জালালের কসম, আমি আমার বান্দাদের মাফ করতে থাকব, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে।” এই বড় ঘোষনা পেয়ে আমরা চিরদিনের জন্য খুশি হতে পারি। এই সমীকরনে জীবনের যে কোন সময়ই আমরা পাপমুক্ত হতে পারি। আমাদের জন্য মালিকের শ্রেষ্ট পুরস্কার এটি। তবে রমজানের শুরু রহমত দিয়ে হওয়ার উত্তরে যদি বলেন আমরা মাফ চেয়েছি বলে মালিক রহমত দিলেন বোধহয়। তবে এই উত্তরটাও ভূল হবে। নিজে থেকে চিন্তা করুন কখন মাফ চাইলেন? নাকি রমজানে কিছুটা করতে পারেন বলে তুলে রেখেছেন। মূল বিষয়টা হচ্ছে মহান আল্লাহপাক আমাদেরকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসেন। তিনি চাননা আমরা পরাজিত হই, জাহান্নামে যাই। বার বার হাজার বার সুযোগ দেন নিজেদের সংশোধনের। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে ¯্রষ্টা বারবার সুযোগ দেন, বুঝিয়ে দেন যে আল্লাহতায়ালার রহমতের ভান্ডার অফুরন্ত। না চাইলেও যেখানে অফুরন্ত নেয়ামতরাজি ভোগ করছি ও এর ভবিষ্যত পূর্বাভাস কি আমাদের হৃদয় একটুও জেগে উঠে না? যদি না হয় তবে ভাবুন বিগত বছর মোট কয়বার ভূমিকম্প হলো দেশে, অকাল বন্যায়তো নিদেনপক্ষে ১০ হাজার কোটি টাকার ফসল ডুবে গেল হাওরে। ঘনঘন ভূকম্পন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় আর ফসলহানি কি আমাদের জন্য কঠিন আযাবের সতর্কবার্তা না? প্রতিদিন পত্রিকায় ও নেটে দেখবেন, গাড়ি এক্সিডেন্ট, লঞ্চ ডুবি, বিমান ভূপাতিত, পাহাড় ধ্বস, বিল্ডিং ভাঙ্গা সহ কত অসহ্য কষ্টে মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের যন্ত্রনাটা কতো দূর্বিষহ! সাথে মাত্র একবার নিজের মরনটা ওই রকম কোন দূর্ঘটনার মাঝে কল্পনা করুন। ট্রাকের চাকার নিচে পড়ে মাথার মগজ রাস্তায় লেপ্টে যাওয়া, ব্যস গা শিওরে উঠবেই। ঘটনাগুলো দূর্ঘটনা হলেও মৃত্যুটা চির সত্য। আর এতো পাপ নিয়ে পরকালের কঠিন আযাবগুলো কতো ভয়ানক হতে পারে।

তাই গভীরভাবে বাস্তবিক অর্থে চিন্তা করতে হবে আমাদের সামনে পাপ মোচনের সূবর্ণ সুযোগের হাতছানির কথা? মুখে মুখে আমরা অনেক বুলি আওরাই। কিন্তু অন্তর থেকে একটি বার গভীর ভাবে চিন্তা করুন আপনার দৈনন্দিন পাপ পংকিলতার কথা। সাথে দেখুন বিশ্ব মুসলিমের অবস্থা। রাখাইন প্রদেশে মুসলমান হত্যা যেন পশু জবাই এর মতই। শক্তি নেই রোখার। ওয়াইন সপের মালিক মুসলমান। মদ-গাঁজা, জোয়া খেলা, চুরি-চামারি , হত্যা, দূর্নীতি এমন কোন অপরাধ নাই যা আজকের মুসলমানরা করছেনা। পর্নোগ্রাফির মত নিকৃষ্ট কাজেও মুসলিমদের বিচরন ভাবলে দেখুন গা টা শিওরে উঠে কিনা। মনের মাঝে অপরাধবোধ আসে কিনা? নূন্যতম ইমানের অধিকারীরাও বিষয়টি অনুধাবন করা অতীব জরুরী। নিজের হিসাবমতেই নিজের পাপের বোজায় বাম কাধটা ঝুলে মিশে যাচ্ছে মাটিতে, অন্তর পচে ডাস্টবিনের ময়লা হচ্ছে সেখানে এই রমযান রহমতের ঝর্না মনে নিয়ে বিবেক জাগ্রত করা আবশ্যক। আল্লাহতায়ালা বার বার চান আমরা ফিরে যাই মূলে। তওবা শুধু হাত উঠিয়েই নয় তওবাটা করা উচিৎ অন্তর থেকে। দূরে থাকা দরকার সব অপকর্ম থেকে। শয়তান কে দূরে রাখা সারা জীবনের জন্য উত্তম কাজ। নিজের মনের বা অন্তরের যে জগতটা আছে তার সরাসরি সংযোগ স্থাপন করি আল্লাহর আরশের সাথে। ইফতারের আগ মূহুর্ত, সেহরীর সময় সহ পুরো রমযান জুড়েই অন্তরটাকে কাঁদাতে হবে। কান্নার ভাব ধরি এখন থেকে, চেষ্টা করি, ভিতরে ভিতরে কান্নার একটা জোয়ার তুলি যা ভাটার মত সব পাপ টেনে নিয়ে যাবে দূর জলের গহীনে। জীবনে অনেক-তো হাসলেন, এবার চলুন একটু কান্নার অনুশীলন হোক। অন্তেরর কান্না, মনের কান্না, চোখের কান্না। সারা শরীরটাও প্রকম্পিত হোক সাথে। আর তাতেই শান্তি মিলবে, প্রশান্তি কানায় কানায় পূর্ণ হবে। বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত হযরত মোহাম্মাদ (সাঃ) তিন মাস আগ থেকেই রমজানে পৌঁছার জন্য দোয়া করতেন। আর রমজান এখন আমাদের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। তাই এই ক’দিন থেকেই রমজানকে বরণ করার একটি খাঁটি নিয়ত দরকার মন থেকে। হঠাত করে রমজানের প্রথম দিনে লম্বা তারাবিহ নামাজে দাঁড়ালে কষ্ট হবে তাই এখন থেকে মসজিদমুখী হওয়াটা খুবই জরুরী। ছেড়ে দিতে হবে মাদক, রং তামাশা। তরুণদের জন্য কমিয়ে আনতে হবে স্মার্টফোনে অযথা নেটিং ও ফেসবুকিং। মনে রাখতে হবে সুইচ অফ করলেই মাথার উপরের পাখাটি বন্ধ হয়না। বরং কিছু সময় নেয়। তাই ধীরে ধীরে অপকর্মের জগত থেকে বেড়িয়ে আসার কার্যক্রম এখন থেকেই শুরু হওয়া দরকার। নিউ ইয়ার কিংবা বৈশাখ পালনের বেশ কিছুদিন আগে যদি প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় তবে মুসলমানদের সারা জীবনের সেরা নেয়ামত পবিত্র রমজানকে বরণ করার প্রস্তুতি কেন থাকবেনা মুসলমান নর-নারীর। আমরা রোজায় পতিত হওয়ায় সাথে সাথে বুঝে নিতে নিবে রোজা আমাদের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। সূরা আল বাকারায় বলা হয়েছে- ‘হে ইমানদারেরা তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।” আর রোজাদারেরা আল্লাহতায়ালার প্রিয় থেকে প্রিয় হওয়ার নমুনা স্বরুপ হাদীসে এসেছে-‘ রোজাদারের মুখের গন্ধ, আল্লাহর কাছে মিসকের চেয়েও সুগন্ধিময়।”

তাই আসুন সবাই পবিত্র রমজানকে বরণ করার প্রস্তুতি নেই এখন থেকেই। আর মাস জুড়ে কান্নার মাধ্যমে, ইবাদতের মধ্যে থেকে জয়ী হই এই জগতে, ঐ জগতে। কেননা হাদীসে বলা হয়েছে ‘যারা রমজানের সবগুলা রোজা পালন করল, তারা ওই দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে যাবে যেদিন তাদের মা তাদের নিষ্পাপ রুপে প্রসব করেছিল।’

Print Friendly, PDF & Email