পৌর নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির

0
104

ঢাকা: আসন্ন পৌর নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বিএনপি। গতরাতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে  সিনিয়র নেতাদের বৈঠকে এ ব্যাপারে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। দীর্ঘ আড়াই মাস পর দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের এ বৈঠকের প্রধান এজেন্ডাই ছিল পৌর নির্বাচন। সেখানে নেতাদের প্রত্যেকেই পৌর নির্বাচনের পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব ব্যক্ত করে বক্তব্য দিয়েছেন। এ ব্যাপারে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্বও দিয়েছেন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর। বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসনের কথাবার্তায়ও প্রকাশ ঘটেছে ইতিবাচক মনোভাবের। তবে নেতাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনলেও তাৎক্ষনিকভাবে কোন সিদ্ধান্ত দেননি তিনি। বৈঠক শেষে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা এমন তথ্য জানিয়েছেন। আজ রাত ৯টায় করণীয় নির্ধারণে ২০ দলীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়েছে।

এদিকে বৈঠক শেষে দলের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন সাংবাদিকদের বলেছেন, বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দল পুনর্গঠন, জাতীয় কাউন্সিল, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, চেয়ারপারসনের দুই মাস লন্ডনে অবস্থানসহ সব বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনের ব্যাপারে নেতারা তাদের মতামত দিয়েছেন। বিএনপি স্থানীয় নির্বাচনে যাবে কি যাবে না এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া পরে বিষয়টি জানাবেন। শিগগিরই এই সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তিনি বলেন, সবাই খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সবার বক্তব্যের নোট নেয়া হয়েছে। এ বক্তব্য দলের চেয়ারপারসনকে দেয়া হবে। চেয়ারপারসন এগুলো পর্যালোচনা করে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন। বৈঠক থেকে চেয়ারপারসনকে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এদিকে বৈঠকে অংশ নেয়া কয়েকজন নেতা জানান, প্রথমেই নেতারা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা করেন। আসন্ন পৌর নির্বাচন নিয়ে নেতাদের মতামত জানতে চান খালেদা জিয়া। বর্তমান সরকারের অধীনে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তিসহ সবাই নিজেদের মতামত দেন। এ প্রসঙ্গে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। তবে আসন্ন পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে ঐক্যমত পোষন করেছেন প্রত্যেকেই। নেতারা দলের চেয়ারপারসনকে জানান, বর্তমান সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু হবে না। কিন্তু মাঠের নেতারা প্রায় সবাই নির্বাচনের পক্ষে। এছাড়া বর্তমানে দলের কোন আন্দোলন কর্মসূচি নেই। প্রতিদিনই সারা দেশে কয়েকশ করে নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হচ্ছে। সবমিলিয়ে দলের তৃণমূলে হতাশা বাড়ছে। এছাড়া তৃণমূল নেতাকর্মীদের ব্যাপক সম্পৃক্ততা থাকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে তৃণমূল নেতাকর্মীরা চাঙ্গা ও ঐক্যবদ্ধ থাকবে।

নেতারা বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী এবং নির্বাচনমুখী একটি দল। জাতীয় নির্বাচন বর্জনের পক্ষে সর্বাধিক যুক্তি থাকলেও স্থানীয় নির্বাচন বর্জনে দলের মূল ভিত্তি তৃণমূলে ঐক্য নষ্ট হতে পারে। নির্বাচনী পরিবেশের কারণে আত্মগোপনে থাকা ও এলাকা ছাড়া নেতাকর্মীরা আবার এলাকায় ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারবে। নেতারা বলেছেন, নির্বাচনে গেলে দলীয় প্রতীকেই যাওয়া উচিত। এতে নানামুখী প্রতিকূলতা থাকলেও আখেরে লাভবান হবেন দল সমর্থিত প্রার্থীরা। বৈঠকে প্রার্থী মনোনয়ন প্রক্রিয়া, প্রস্তুতিসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের শেষ পর্যায়ে কয়েকটি জেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ও কয়েকজন বিএনপি সমর্থিত পৌর মেয়রের সঙ্গে কথা বলেন খালেদা জিয়া। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরে তারাও নির্বাচনের পক্ষেই মত দেন।

দলের স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য জানান, দলীয় প্রতীকেই পৌর নির্বাচনে যাওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু দাবি জানানো হবে। দলের ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ জানান, পৌর নির্বাচনে যাওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠক শেষে বেশ কয়েকজন নেতা জানান, শিগগির দলের তরফে সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হবে। এদিকে দীর্ঘ দুইমাসের বেশি সময় লন্ডনে অবস্থান করে চিকিৎসা নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দলের তরফে ইতিমধ্যে বলা হয়েছে, দেশের সঙ্কটময় পরিস্থিতির কারণে চিকিৎসা অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন। বৈঠকে অংশ নেয়া কয়েকজন নেতা জানান, লন্ডনে চিকিৎসার পর আগের চেয়ে অনেকটাই সুস্থ বোধ করেছেন খালেদা জিয়া। তবে চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে দেশে ফিরতে পারলে ভালো হতো। যদিও আগের মতোই তার অটুট মনোবল প্রকাশ পেয়েছে বৈঠকে। এর আগে রাত ৯টায় কার্যালয়ে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সোয়া ৯টা থেকে টানা দুইঘণ্টা চলে এ বৈঠক। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, লে. জে. (অব) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার (অব.) আসম হান্নান শাহ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসূফ, এয়ার ভাইস মার্শাল অব. আলতাফ হোসেন চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ড. এম ওসমান ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন ও যুব বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বৈঠকে অংশ নেন। উল্লেখ্য, লন্ডন যাওয়ার দুইদিন আগে ১৩ই সেপ্টেম্বর দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠক করেন তিনি। দেশে ফিরেই দেশের ও দলের সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য দ্রুত এ বৈঠক ডাকেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
এদিকে বৈঠকের আগে বিএনপি নেতারা জানান, তফসিল ঘোষণার দ্বিতীয় সপ্তাহেই প্রাক-প্রস্তুতি শুরু করেন বিএনপির তৃণমূল নেতারা। নীরবে চলে তাদের এ প্রস্তুতি। মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের অনেকেই নির্বাচনের পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ ও নিজেদের প্রস্তুতির বিষয় উল্লেখ করে গণমাধ্যমে বক্তব্যও দিয়েছেন। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তরফে প্রথমে নেতিবাচক বক্তব্য এলেও আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণে চাপ তৈরি হয় তৃণমূলে। আর বাস্তবতা বিবেচনা করেই দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এ ব্যাপারে ইতিবাচক ঐক্যমত্যে। নেতারা জানান, এবারের নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করলে শক্ত অবস্থান নিয়েই মাঠে থাকবে। ভোটকেন্দ্রে কোন অনিয়ম হলে অতীতের মতো খুব সহজে ছাড় দেবে না। সব ধরনের অনিয়ম প্রথমে প্রতিরোধ করা হবে। যারা প্রতিরোধ করতে পারবেন সে ধরনের প্রার্থীকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অগ্রাধিকার দেয়ার ব্যাপারেও নেতারা নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। আর চূড়ান্তভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই ভোট বর্জনের দিকে যাবে বিএনপি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত হওয়ার পর প্রার্থীদের সমর্থনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। এক্ষেত্রে এলাকায় প্রার্থীর জনপ্রিয়তা, সামাজিক প্রভাব এবং সাংগঠনিক দক্ষতা দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে প্রতিটি পৌরসভা ও উপজেলায় বিএনপির সমর্থণ প্রত্যাশীদের একাধিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় দপ্তরের নির্দেশ পেলেই আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে সেসব তালিকা চেয়ারপারসনের কাছে জমা দেয়া হবে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু জেলায় অনানুষ্ঠানিক বৈঠকের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ব্যাপারে আলোচনা ও কিছু কিছু প্রার্থীর পক্ষে সমর্থনও চূড়ান্ত করেছে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতা তুলে ধরে নেতারা বলছেন, প্রথমতÑ নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত হলেই বিএনপির জয় হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীরা সক্রিয় হবেন। তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠন শক্তিশালী হবে। দ্বিতীয়ত: আওয়ামী লীগ তথা সরকার যদি এই নির্বাচনকে প্রভাবিত করে এবং গায়ের জোরে ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেয় তাহলে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে। এতে ফের প্রমাণিত হবে এই সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কখনই সম্ভব নয়। পুলিশি প্রহরায় কেন্দ্র দখল করে সরকারদলীয় প্রার্থীদের জেতানো হলে বিদেশিদের কাছেও ফের নেতিবাচক বার্তা যাবে।

Print Friendly, PDF & Email