প্রার্থিতা নিয়ে আ’লীগে বিক্ষোভ-বিদ্রোহ

0
125

জাকির হোসেন লিটন:

আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ঘোষিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দানাবাঁধা ক্ষোভ প্রকাশ্য হয়ে উঠছে। সদ্যঘোষিত নৌকার প্রার্থীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ এবং সড়ক ও মহাসড়ক অবরোধ অব্যাহত রেখেছে মাঠ নেতাকর্মীরা। কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঝাড়–মিছিলও করেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। আবার কোথাও কোথাও জোটের জন্য আসন ফাঁকা রাখার বিরোধিতা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ঘোষণার দাবিতেও বিক্ষোভ হয়েছে। দলের মাঠপর্যায়ের এমন চিত্র নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে। দলের তৃণমূলপর্যায়ে এমন ক্ষোভ ও বিভেদ অবিলম্বে নিরসন না হলে নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমাদান ও প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দলীয় প্রার্থী পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তবে শেষ পর্যন্ত দল ও জোট ঘোষিত প্রার্থীর বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে আজীবন বহিষ্কারেরও হুমকি দেন তিনি।

সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে রোববার দলের মনোনীত প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি প্রদান শুরু করে আওয়ামী লীগ। এ পর্যন্ত ২৩১ জনকে নৌকার প্রার্থী ঘোষণা করে চিঠি দেয়া হয়। এর মধ্যে কোনো কোনো আসনে দুইজন প্রার্থীকেও চিঠি দেয়া হয়। দলীয় প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও যাদের চিঠি দেয়া হয়েছে তারা বেশির ভাগই পুরনো। এ তালিকায় বড় কোনো চমক নেই। তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন কয়েকজন হেভিওয়েট কেন্দ্রীয় নেতা। তালিকায় বিতর্কিত এমপি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। আওয়ামী লীগের এই মনোনয়ন নিয়ে দল এবং শরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

দলীয় কোন্দলে জড়িত, এলাকায় যোগাযোগ কম থাকা এবং নানা কারণে বিতর্কিতরা এবার মনোনয়ন পাবেন না- নীতি নির্ধারকরা সব সময় এমন বক্তব্য দিলেও তালিকায় তার প্রতিফলন তেমন একটা ঘটেনি বলে অভিযোগ করেছেন দলের নেতাকর্মীরাই। ক্ষমতাসীন দলটির সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সভায় ৭০ জন এমপি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বলে আলোচনা হয়েছিল। ওই সভায় শতাধিক এমপি এবার ‘লাল কার্ড’ পেতে পারেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানিয়ে ছিলেন। তবে চূড়ান্ত মনোনয়নে দেখা গেছে, পুরনোদের ওপরই আস্থা রেখেছে দলটি। যেসব এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হাইব্রিডদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া, বহিরাগতদের লালন করা এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির অভিযোগ ছিল তাদের নাম প্রার্থী তালিকায় দেখে হতাশ হয়েছেন কর্মীরা। এসব প্রার্থীর অনেককে প্রত্যাখ্যান করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন দলের মাঠ নেতাকর্মীরা।

ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বজলুল হক হারুনকে এবারো মনোনয়ন দেয়ায় গতকাল ঝাড়ুমিছিল করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। একই সাথে মনোনয়ন পাওয়া হারুনকে জনবিচ্ছিন্ন, দুুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবি জানানো হয়।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বেলা ১১টার দিকে উপজেলা সদরের যুবলীগ কার্যালয় থেকে ঝাড়ু মিছিলটি বের হয়। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে ঝাড়ু নিয়ে দফায় দফায় শহরের প্রধান সড়ক ঘুরে আবারো যুবলীগ কার্যালয়ে গিয়ে মিছিলটি শেষ হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে অবনতি না হয় সেজন্য উপজেলা সদরে বিপুল পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জামালপুর-৫ সদর আসনে আওয়ামী লীগ নেতা ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক রেজাউল করিম রেজনুকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার দাবিতে জামালপুরের বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন তার সমর্থকরা।

গতকাল সকাল থেকে তার সমর্থকরা সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় জামালপুর শহরসহ জামালপুর-ময়মনসিংহ এবং জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে ঘণ্টাব্যাপী যোগাযোগ বন্ধ থাকে। এ ছাড়াও শহরে দোকানপাট বন্ধ রাখেন ব্যবসায়ীরা।
কুড়িগ্রাম-২ আসনে পনীর উদ্দিনের মনোনয়ন বাতিলের দাাবতে মানববন্ধন করেছেন আওয়ামী লীগের সবস্তরের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। এ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ সদস্য আলহাজ মো: জাফর আলীকে মনোনয়ন দেয়ার দাবিতে বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ শতাধিক দোকানসহ রাস্তা অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তারা।
অবরোধের ফলে ফুলবাড়ী বাজার থেকে শেখ হাসিনা ধরলা সেতুর দুইপাড় পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার রাস্তায় যানজটের সৃষ্টি হয়। সেখানে আটকে থাকে শতশত মাইক্রো, অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ মালবাহী ট্রাক। পরে পুলিশ বিক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীদের বুঝিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করলে তারা অবরোধ তুলে নেয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল ও আশুগঞ্জ) আসনে কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মো: মঈন উদ্দিনকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়ার দাবিতে গতকাল বিকেলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও মঈনের সমর্থকেরা। এ কারণে প্রায় এক ঘণ্টা জাতীয় এ মহাসড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ থাকে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই মেয়াদেই সরাইল-আশুগঞ্জ আসনে দলীয় প্রার্থীর বদলে মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী জিয়াউল হক মৃধাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। রোববার আওয়ামী লীগ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছয়টি নির্বাচনী আসনের মধ্যে পাঁচটিতে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন দিলেও সরাইল-আশুগঞ্জ আসনটি ফাঁকা রাখে।

ধারণা করা হচ্ছে, এবারো এ আসনে মহাজোট থেকে মৃধা অথবা তার জামাতা রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়াকে মনোনয়ন দেয়া হবে। এর ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। অথচ এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ১৯ জন দলের মনোনয়ন ফরম কেনেন। এর আগে রোববার ময়মনসিংহ-৮ এর ঈশ্বরগঞ্জ আসনে সাবেক এমপি আবদুস ছাত্তারকে মনোনয়ন দেয়ার দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা কাফনের কাপড় পরে লগি- বৈঠা হাতে নিয়ে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। ফলে রাস্তার দু’পাশে দীর্ঘ যানজটে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।

কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি আফাজ উদ্দিন আহমেদ দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তার সমর্থকেরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেন। কুষ্টিয়া-প্রাগপুর সড়কের তারাগুনিয়া বাজারে তারা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। পরে দৌলতপুর থানা পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা-সালথা-কৃষ্ণপুর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে মনোনয়ন না দেয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করে তার সমর্থকেরা। এ আসনে মহাজোটের প্রার্থী জাকের পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা আমীর ফয়সালকে মনোনয়ন দেয়ার খবর নগরকান্দা-সালথায় প্রচার হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা বিশ্বাস দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে মানববন্ধন করেন বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা। রহনপুর কলোনি মোড়ে দলীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বিকেলে রহনপুর ডাকবাংলো চত্বর থেকে মহিলা লীগ কর্মীরা ঝাড়ু মিছিল বের করার চেষ্টা করলে পুলিশ পণ্ড করে দেয়।

এ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু) আসন মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বাদ পড়ছেন এই আসনে আওয়ামী লীগের বর্তমান সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমল। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলন শুরু করেছেন তার সমর্থকেরা। এমনকি জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে কলাগাছ অভিহিত করে বিভিন্ন জায়গায় কলাগাছ নিয়েও মিছিল করেন তারা।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিতর্কিত নেতাদের মনোনয়নের প্রতিবাদে স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘কিছু আসনে আমরা এখনো জরিপ করছি। যদি এমন যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থীর ব্যাপারে তথ্য পাওয়া যায় তবে নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমাদান ও প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত তা পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।’

শেষ পর্যন্ত কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে দলের সিদ্ধান্ত কী হবেÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আজীবন বহিষ্কার করা হবে। তাকে আর দলে নেয়া হবে না।’

Print Friendly, PDF & Email