ফিলিস্তিনি ভূখন্ড দখল করা থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত: মাহাথির

0
138

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে ইহুদিদের দেয়া থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সিরিয়ায় বর্তমান সঙ্কট ও যুদ্ধপরিস্থিতি নিয়ে এ মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্ষীয়ান রাজনীতিক মাহাথির বিন মোহাম্মদ। তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের বিমান হামলা জোরদারের সিদ্ধান্ত সঙ্কটকে আরও ঘনীভুত করবে। সঙ্কট সমাধানের জন্য খুঁজে বের করতে হবে তারা কেন ভয়াবহ কর্মকান্ড চালাচ্ছে। বোমা হামলায় শুধু আইএস নয়, নিরপরাধ মানুষও আক্রান্ত হবে। ধংস হয়ে যাবে পুরো দেশ। আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এসব কথা বলেছেন মাহাথির। এখানে পুরো সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো:

প্রশ্ন: গত মাসের প্যারিস নৃশংসতার পর পশ্চিমা দেশগুলো আইসিলের বিরুদ্ধে বিমান হামলা জোরদার করছে। এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আপনি কি মনে করেন?

মাহাথির: এটা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে। কেননা নিরপরাধ আরবরা মারা যাবে। তাদের যেহেতু কোন কিছু করার ক্ষমতা নেই, তাই তারা আইসিলের প্রতি সহানুভূতিশীল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আইসিল ভয়াবহ আরও কিছু নিয়ে হাজির হবে। অথবা অন্যান্য নানা গ্রুপ হয়তো তৈরি হবে। নিজেদের শত্রুদের হারাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে মরিয়া হয়ে তারা যা পারে তাই করবে। আর তারা যেটা করতে পারে সেগুলো আমরা সন্ত্রাসবাদ বলে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু আমার কাছে আকাশ থেকে বোমা ফেলাও সন্ত্রাসবাদ। যারা বোমা পড়ার জন্য নিচে অপেক্ষা করছে, তারাও সন্ত্রস্ত।

প্রশ্ন: আপনি কি আরও ব্যপক আকারের একটি যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগ পোষণ করেন?

মাহাথির: এটা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। আমি সবসময় বলি, ইসরাইলের জন্য যখন ফিলিস্তিনের ভূখ- দখল করে ইহুদিদের দেয়া হয়েছিল, তখন থেকেই এসব কিছুর সূত্রপাত। এরপর ইহুদিরা বলতে গেলে পুরো ফিলিস্তিন দখল করে নিয়েছে। বসতি নির্মান করেছেন। রাস্তাঘাট বানিয়েছে। মানুষের চলাফেরা নিয়ন্ত্রন করছে। আরও অনেক কিছু। আরব দেশগুলো ওই ভূখ- পুনুরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিল। কিন্ত তারা ব্যর্থ হয় কেননা ইউরোপ ও আমেরিকা ইসরাইলকে সমর্থন করেছে। আর এরপর থেকে ইসরাইল সব ধরণের আন্তর্জাতিক অপরাধ করে যাচ্ছে। এটা অত্যন্ত অন্যায়।
ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের যেটা করা উচিত তা হলো, নিরপেক্ষ হওয়া আর উভয় পক্ষের কথা শোনা। আমরা এটা বলতে পারি না যে একপক্ষ সবসময় ভুল। ইসরাইলিরা অবৈধভাবে অবরোধ আরোপ করেছে। সমুদ্রে জাহাজগুলো আটকে দিয়েছে। এসবকিছুর দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না পশ্চিমা বিশ্ব। তারা শুধু সন্ত্রাসবাদ নিয়ে কথা বলে।
ইসরাইলের জবাব হলো, সন্ত্রাসীদের আরও ত্রাস সৃষ্টি করা। এটা তাদের পরিস্থিতি মোকাবেলা করার পদ্ধতি। আপনি একজন ইসরাইলি হত্যা করলে, আমরা আপনাদের ১০ জনকে হত্যা করবো। আপনি আমাদের ১০ জনকে হত্যা করলে আমরা আপনার ১০০ জনকে হত্যা করবো। আমরা আপনাদের শাস্তি দেবো। এটাই ইসরাইল করছে। পুরো বিশ্ব এটা জানে। আর বিশ্ব এটা সহ্য করে।

প্রশ্ন: কিন্তু নিশ্চিতভাবে আইসিলের উত্থাণ ইসরাইলের সৃষ্টির থেকেও আরও বেশি কিছু?

মাহাথির: হ্যা বেশি কিছু। তবে এটা আরও খারাপ হতে যাচ্ছে। আমি মনে করি, প্রথাগত যুদ্ধ দিয়ে গেরিলা যুদ্ধ লড়াই করা যায় না। আকাশ থেকে লড়াই করা যায় না। মালয়েশিয়াতে আমাদের অভিজ্ঞতা আছে। আমাদের যখন গেরিলা ছিল, আমরা মানুষের হৃদয়, মন জয়ের চেষ্টা করেছিলাম তারা যেন গেরিলাদের সমর্থন না দেয়। এভাবে আমরা সফল হয়েছিলাম। আমরা আরবদের সমস্যা সমাধান করছি না। এটা হলো, কোন কিছু না করতে পারার ক্রোধ আর হতাশা।

প্রশ্ন: পশ্চিমা রাজনীতিবিদরা কি অতীতের ভূলের পুনরাবৃত্তি করছে?

মাহাথির: হ্যা। আপনি এখানে আইসিলকে হত্যা করলে, অন্য কোথাও আইসিলের উত্থাণ হবে। আপনি যুদ্ধের বিস্তার করবেন। এমনকি মালয়েশিয়াতেও আইসিলের প্রতি সহানুভূতিশীল মানুষ আছে। এমন কট্টরপন্থীরা থাকবে যারা এতোটা ক্রদ্ধ যে তারা এসব কিছু করবে। এটা আমাদের সংস্কৃতিতে নেই। আর মালয়েশিয়ানদের সপরিবারে অনৈসলামিক এমন কিছুতে যোগ দিতে যেতে দেখে আমরা স্তম্ভিত। এটা ইসলামের শিক্ষা বিরোধী।

প্রশ্ন: অপেক্ষাকৃত ভালো নীতি কোনটা হবে?

মাহাথির: আপনি আমার মানুষকে হত্যা করলে আমি আপনার মানুষকে হত্যা করবো- প্রতিহিংসার এ নীতি কাজে আসবে না। খুঁজে বের করুন কোন এসব মানুষ এ ধরণের ভয়ঙ্কর কর্মকান্ড চালাচ্ছে। ত্রাস সৃষ্টির নতুন নতুন উপায় আবিস্কার করা হচ্ছে, শেখা হচ্ছে। এখন তারা টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালানোর পদ্ধতি খুঁজে বের করেছে। এটা তাদের নতুন অস্ত্র। এখন পুরো বিশ্ব আতঙ্কিত। মুসলিম দেশগুলো আতঙ্কগ্রস্থ। তারা শুধু সেনাদের খুন করেনা, তারা যে কাউকে খুন করে; পুরো বিশ্বের সামনে নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে।

প্রশ্ন: আর, ঘনীভূত হওয়া এ দ্বন্দ্বের মানবিক পরিণতি কি?

মাহাথির: আমি মনে করি সাহায্য করাটা প্রত্যেকের দায়িত্ব। আমরা যদি অনেক দেশের মধ্যে এসব শরণার্থীদের ভাগ করে দেই তাহলে তা কোন এক দেশের জন্য অনেক বড় একটি বোঝা হয়ে দাড়াবে না। ৪০ লক্ষাধিক মানুষ পালিয়ে গেছে যা কিনা সিরিয়ার জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক। প্রতিটি দেশকে সাহায্যের হাত বাড়ানো প্রয়োজন। এসব মানুষ এ দেশগুলোতে সারাজীবন থাকবে না। তারা নিজেদের দেশে ফিরতে চায়।
সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সমাধান করা। শুধু আকাশ থেকে বোমা ফেললে কিছু হবে না। সমস্যা ভুখন্ডে, আকাশে নয়। এ প্রক্রিয়ায় আপনি শুধু আইসিলকে নয়, নিরপরাধ মানুষকে আঘাত করবেন। ধ্বংস করবেন পুরো দেশকে।

Print Friendly, PDF & Email