ফেলানী হত্যাকাণ্ড: নির্দোষ বল্লে দিল্লির দায় বাড়ে

0
323

ফরহাদ মাজহার:

“শোন বিএসএফ শোন হে ভারত হে কাঁটাতারে গুনগুন

একটা দোয়েল বসেছে যেখানে ফেলানী হয়েছে খুন
রাইফেল তাক করো হে রক্ষী দোয়েলেরও ভিসা নেই
তোমার গুলিতে বাংলার পাখি গুলি খেয়ে মরবেই”
-কবির সুমন

‘… ফেলানী, বলো তো দোষটা কার?’
ফেলানী গোলকায়নের যুগে একটি নতুন চিহ্ন; একটা ছবি, যা মানুষের চোখে কাঁটাতারের মতো আটকে গিয়েছে। তোলা যাচ্ছে না। এর বেদনা ভয়ংকর। আমার অনুমান এই বেদনা কমবে না, বাড়বে। কিন্তু সেটা যদি শুধু বেদনাবোধ ও ক্ষোভের মধ্যে খাবি খায় আর আবেগের ঘোরে কাঁটাতারের বেড়ায় মাথা খুঁড়ে রক্তাক্ত হয় তাহলে কোন ফায়দা নাই। ঝুলে থাকা ফেলানীর কিশোরি দেহের ছবি আমাদের যেন নতুন করে রাষ্ট্রীয় সীমান্ত, সীমান্তে হত্যা, কাঁটাতার ও তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণা ও অনুমানগুলোকে প্রশ্ন করতে শেখায়। যেন আমরা সীমান্ত পারাপার করবার, দেশান্তরী হবার এবং অন্য সমাজে ও অর্থনীতিতে অবদান রাখবার অধিকার থেকে কোন রাষ্ট্র কোন মানুষকেই বিশেষত ফেলানীদের বঞ্চিত করতে না পারে। কতদিন ও কতোটুকু অবদান রাখলে সেই সমাজের সদস্য হিসাবে স্বাভাবিক নিয়মেই একজন দেশান্তরী মানুষ মর্যাদা পেতে পারে যা রাষ্ট্র কোন আইনে কেড়ে নেবার অধিকার রাখে না। মানুষটির জন্ম সেই দেশে হোক বা না হোক যার সঙ্গে তার মানবাধিকারের সম্পর্ক নাই। মানবাধিকার আধুনিক রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সনদ, ঘোষণা বা চুক্তির কারণে মেনে নিয়েছে বটে, কিন্তু অধিকার রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহের দেওয়া কোন বিশেষ ‘সুবিধা’ না। এই অধিকারের ন্যায্যতা নীতি ও নৈতিকতার ক্ষেত্র থেকে উৎসারিত, মানুষের সঙ্গে ও মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা ও সম্পর্ক রচনার অন্তর্নিহিত তাগিদ থেকে তৈরি। ফেলানী যেন গোলকায়নের এই কালে আমাদের অন্তর্নিহিত নীতিবোধ ও নৈতিকতার সঙ্গে আধুনিক রাষ্ট্রের সহিংসতা ও বিধিবদ্ধ আইনের বিরোধ চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়। যেন আমরা আমাদের বর্তমানকে ঠিকভাবে পর্যালোচনা করতে পারি, যেন সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আমাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
ফেলানীর হত্যা নিয়ে বাংলাদেশসহ সারা দুনিয়ার সংবেদনশীল মানুষ ও মানবাধিকার কর্মীদের যে ক্ষোভ তার গোড়া এখানে। বিনা বিচারে কোন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাউকেই হত্যা করতে পারে না। অন্য দেশের নাগরিক হলেও নয়। অতএব দিল্লিকে আন্তর্জাতিকভাবে জবাবদিহি করতে হবে। আধুনিক রাষ্ট্র আইনের শাসন ও মানবিক অধিকারের কথা বলে, কিন্তু তারা নিজেই সেটা মানে না। অন্য দিকে আইন ভঙ্গ করা আর ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার পার্থক্যও এই ক্ষেত্রে একাকার হয়ে গিয়েছে। ফেলানী যদি সীমান্ত অতিক্রম করবার জন্য কাঁটাতার টপকায় তাহলে মেয়েটি আইন ভঙ্গ করেছে, কোন ফৌজদারি অপরাধ করেনি। ফৌজদারি অপরাধেও কাউকে বিচার ছাড়া হত্যা জঘন্য অপরাধ। আর এই ক্ষেত্রে কাঁটাতারে আটকে পড়া একটি আর্ত কিশোরিকে হত্যা ভয়ানক অপরাধ। এর বিচার হওয়া উচিত।
ইতিহাস বড়ই বিচিত্র। কে কোথায় কিভাবে বড়শির মতো গেঁথে যায় বোঝা মুশকিল। ফেলানীর অর্থ হচ্ছে যাকে ফেলে দেওয়া যায়, যা আবর্জনা, মূল্য নাই। কিন্তু মুশকিল হয় সেটাই যখন অমূল্য হয়ে সেই ফেলানীই আবার ফিরে আসে ইতিহাসে এবং আমাদের কাছে তার অর্থ নির্ণয়ের দাবি তোলে। বলে, আমাকে ফেলতে চেয়েছিলে। কিন্তু এখন দেখো আমি ঝুলে আছি কাঁটাতারে, মানবাধিকার বলো, আঞ্চলিক রাজনীতি বলো কিম্বা ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর হত্যাকাণ্ড- আমি সবকিছুর ক্ষত হয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছি। আমি তোমাদের প্রশ্ন করছি, কী হিম্মত আছে তোমাদের আমাকে এখন এই কাঁটাতার থেকে নামিয়ে আনার। আমি ঝুলে আছি। ঝুলে থাকব।
ফেলানী ঝুলে আছে। কাঁটাতারে ঝুলে থাকা একটি ক্ষতবিক্ষত কিশোরির মৃত শরীরের ছায়া বাংলাদেশ ও ভারত উভয়ের ভূগোলকে অন্ধকার করে তুলবে। তুলছেও বটে। এই লাশ নামিয়ে এনে কবর দেওয়া আর না দেওয়া সমান। কারণ ক্ষতবিক্ষত লাশের ছবিটি আমাদের চোখ থেকে নামেনি। নামবে না।
এটা শুধু বাংলাদেশীদের মামলা নয়। এই ছবি মানবাধিকারকর্মী কিরিটী রায়ের চোখ থেকেও নামেনি। কবির সুমনের চোখ থেকেও নয়। সেটা গিয়ে সুমনের চোখে শুধু নয়, কণ্ঠেও বিঁধেছে। সুমন একটি গান লিখেছেন, গানটি গেয়েছেন। “ওপার বাংলা এপার বাংলা মাঝখানে কাঁটাতার/গুলি খেয়ে ঝুলে থাকলে ফেলানী বলো তো দোষটা কার?”। এই দোষ নির্ণয় করতে হলে ইতিহাসের বিস্তর দলিলদস্তাবেজ ঘাঁটতে হবে। শেষবধি জয়া চক্রবর্তীর গবেষণা (দেখুন, ‘Bengal Divided’) মানলে কলকাতার ভদ্রলোকদের কাঁধে গিয়ে বর্তাবে। সম্ভবত এখন গানটির উদ্দেশ্য দোষ খোঁজা নয়। ফেলানী কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে সংবেদনশীল বাংলাভাষীদের পরস্পরের মধ্যে হঠাৎ নতুন এক স্রোতচিহ্নকে দৃশ্যমান করে তুলছে। তাকে রূপ দেওয়া। যার মূল্য অপরিসীম। ঠিক যে এর মধ্যে আবেগ আছে। কিন্তু আবেগ ছাড়া ইতিহাস নাই। বাংলাভাষীরা এই সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলোকে তাদের বিভক্তি ও হারিয়ে যাওয়া গৌরব নিয়ে নতুনভাবে পর্যালোচনা করতে সক্ষম হবেন কি না জানি না। গোলকায়নের যুগে এই অভিমুখ গ্রহণ করা হলে অবাক হবার কিছু থাকবে না। ফেলানী নতুন চিহ্ন হয়ে ঝুলে আছে বলতে আমি সেই ক্ষেত্রগুলোর প্রতিও ইঙ্গিত করছি যা এখনো আবছা, অনেকটাই অস্পষ্ট, কিন্তু মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলাভাষীদের মধ্যে কোথাও একটা নাড়ির সূত্র রয়ে গিয়েছে যা ছেঁড়া হয়নি।

মানবাধিকার : সীমান্তে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
জানি, ফেলানী চিকিৎসা আবেগ দিয়ে প্রশমিত হবে না। প্রথমত এ নিষ্ঠুর চিহ্নের একটা ব্যাখ্যা চাই। তারপর দরকার সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবসম্মত রাজনীতির। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি। কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে বাবার সঙ্গে দেশে ফেরার সময় ১৫ বছর বয়সী ফেলানী কাঁটাতারে আটকে পড়ে। কাঁটাতারে আটকে পড়া মেয়েটি ভয়ে চিৎকার করে কাঁদছিল। সেই ভয়ার্ত কিশোরিকে চৌধুরীহাট ক্যাম্পের বিএসএফ জওয়ানরা গুলি করে হত্যা করে। তারপর তারা গুলিবিদ্ধ ফেলানীর লাশ নামায়। প্রতিবাদের মুখে পরে লাশ ফিরিয়ে দেয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনার বিচার দাবি করা হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত ৪১০০ কিলোমিটার বা ২৫৫০ মাইল, যার অধিকাংশ কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভারতীয় রক্ষীবাহিনী সীমান্তে মানুষ হত্যা করে নিয়মিত; কোন দায় নাই, বিচার নাই। ভারত কাঁটাতার দিয়ে বাংলাদেশকে কার্যত একটি কারাগারে পরিণত করেছে। দিল্লি বাংলাদেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক চর্চা করতে চায় কাঁটাতার ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড তার নিদর্শন।
অভাবের তাড়নায় দেশান্তরী ছিল ফেলানীর পরিবার। ফেলানীর বয়স যখন ছয় বছর তখনই পুরো পরিবার ভারতে চলে গিয়েছিল। মেয়ে সেখানেই বড় হয়েছে। বয়স যখন তার পনেরো, তাকে বিয়ে দেবার দায় দেখা দেয়। মেয়েকে নিয়ে ফিরে আসছিলেন বাবা মোহাম্মদ নুর ইসলাম। বিয়ের সম্বন্ধ দিন তারিখ সবই ঠিক ছিল। কিন্তু ফেরার সময় কাঁটাতারের বেড়ায় আটকে যায় ফেলানী।
ফেলানী হত্যাকাণ্ড সারা দুনিয়ার মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। তারা প্রশ্ন তোলে, ভারত নিজেকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সভ্য দুনিয়ার অন্তর্ভুক্ত ভাবে। তাহলে কিভাবে আইনবহির্ভূতভাবে তাদের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী মানুষ খুন করে? কী অপরাধ করেছে সাধারণ মানুষ? অপরাধী হলে তাদের বিচার হোক। কিন্তু কোন সভ্য দেশ এভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে না। কই কোন ভারতীয় গরু পাচার বা ফেনসিডিল ব্যবসায়ীকে কি ভারত খুন করেছে? কিম্বা গ্রেফতার করে কি কারো বিচার করেছে? ফেলানীর মতো যাদের খুন করা হোল তাদের কী অপরাধ? পেটের দায়ে মেয়েটি পুরা পরিবারসহ দেশান্তরী হয়েছে। তাদের প্রতি দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় নীতির দরকার। কিন্তু তা না করে তাদের হত্যা? এ কেমন নিষ্ঠুর দেশ যারা আন্তর্জাতিক আইন বা মানবাধিকারসম্মত রীতি মানে না! ফেলানী হত্যায় ভারতের ভাবমূর্তি যথেষ্ট কালো ও কুৎসিত হয়েছে।
তখনই কথা উঠেছিল ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বর্ডারও এতো রক্তস্নাত নয়। পৃথিবীতে এমন কোন সীমান্ত পাওয়া যাবে না যেখানে দেয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া তোলার মতো রাজনৈতিক দুশমনি থাকলেও মানুষকে এভাবে নির্বিচারে খুন করা হয়।
ভারতের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী এই প্রথম আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে মোটেও তা নয়। দুই হাজার এগারো সালের আগের দশ বছরের হিসাব ধরে হিউম্যান রাইটস তখনই বলেছিল বিএসএফ প্রায় এক হাজার বাংলাদেশীকে খুন করেছে। তার মানে তারা প্রতি চার দিনে একটি করে মানুষ মেরেছে। এই সংখ্যা উল্লেখ করে ইকনমিস্ট পত্রিকা মন্তব্য করেছে যে খুবই লজ্জার কথা যে স্নায়ুযুদ্ধের সময়, যখন দুই জার্মানি একত্র হয়নি মাঝখানের দেয়াল অতিক্রম করতে গিয়েও এতো মানুষ নিহত হয়নি। (দেখুন, Shootings on the India-Bangladesh border : Felani’s last steps)।
দ্বিতীয়ত, সীমান্তে কাঁটাতার টপকে এই প্রথম কুড়িগ্রামের মোহাম্মদ নূর ইসলাম কিম্বা অন্যান্যরা পারাপার করছে তা নয়। নূর ইসলাম অনেকবারই এসেছেন। এই ব্যবস্থা তারা করে নিয়েছেন ভারতের রক্ষীবাহিনীকে ঘুষ দিয়ে। নূর ইসলাম বলেছেন, তিনি এবার আসার জন্য বিএসএফকে তিন হাজার টাকা দিয়েছেন। নূর ইসলাম হিসাব মেলাতে পারছিলেন না যে ঘুষ দেবার পরও কেন তারা হত্যা করল। ইকনমিস্ট সেই তথ্যও উল্লেখ করেছে। বিএসএফ শুধু খুনি নয়, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ ও অসৎ বটে। যারা টাকা খায়, কিন্তু কথা রাখে না।
চাপে পড়েই বিএসএফ সদর দফতর এ ঘটনার বিচার করতে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স আদালত গঠন করে। শুরু থেকেই বোঝা গিয়েছিল এটা একান্তই লোক দেখানো ব্যাপার। তারা ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করেছে একজন সিপাইকে। সে আবার বাঙালি। নাম অমিয় ঘোষ। অথচ দরকার ছিল ভারতীয় রক্ষীবাহিনী কেন সীমান্তে মানুষ হত্যা করে তার সামগ্রিক পর্যালোচনা। একজন সিপাইকে অভিযুক্ত বা শাস্তি দেওয়া এখানে গৌণ দিক। বরং দরকার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত তাদের সকলকেই বিচারের সম্মুখীন করা। ঘটনার তদন্ত, পর্যালোচনা ও বিচারের উদ্দেশ্য হতে হবে সীমান্তে আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কারণ চিহ্নিত করা এবং তা চিরতরে বন্ধ করা। এটা নিছক সামরিক আদালতে একজন সৈনিকের সামরিক বিচার বা কোর্ট মার্শালের ব্যাপার নয়। ভারতীয় সেনাবাহিনী নিজের তাগিদে সেটা করতেই পারে। সেই বিচারের আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক মূল্য নেই। মূল প্রশ্ন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লংঘন এবং আন্তর্জাতিক মহলে দিল্লির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
কিন্তু দিল্লি ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। একে তারা তাদের রক্ষীবাহিনীর শৃঙ্খলার বিচারে পর্যবসিত করে। কী ফল দাঁড়াল তার? অমিয় ঘোষ কি দোষী? না, মোটেও না, নির্দোষ। কেন নির্দোষ? কারণ ঘোষ সৈনিক হিসাবে তার নির্দেশ পালন করেছে। বাংলাদেশীদের সীমান্তে হত্যা জায়েজ। এই নির্দেশ তো আছেই। এটাই দিল্লির নীতি।
এই প্রহসনমূলক বিচার করা হয়েছিল একান্তই বাংলাদেশে ক্ষোভ প্রশমনের জন্য। ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকারের মুখ রক্ষা ছাড়া এর আর কোন উদ্দেশ্য ছিল না। এই দিকটি বোঝা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অতএব বিএসএফের নিজস্ব আদালত জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্ট বা জিএসএফসি ২০১৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রথম রায়েই বলে দিয়েছিল মি. ঘোষ নির্দোষ। এতে বাংলাদেশের জনগণ আবারও বিক্ষুব্ধ হয়। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া উপলব্ধি করে ভারতীয় রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক রায়টি পুনর্বিবেচনার আদেশ দেন। পুনর্বিবেচনার কাজ শুরু করতে প্রায় এক বছর লেগেছিল, আর তা তিনবার নানা কারণে স্থগিত হয়ে গিয়েছিল।
আবার বিচার করেছেন কারা? না, নতুন কেউ নয়। পাঁচ সদস্যের আদালতের প্রধান ছিলেন বিএসএফ আধিকারিক সি পি ত্রিবেদী। এই পাঁচজনই মূল মামলার শুনানিতে বিচারক ছিলেন। একই বিচারক তাদের দেওয়া রায়ের পুনর্বিবেচনা করে ২ জুলাই ২০১৫ বৃহস্পতিবারে। তারা সেই একই রায় বহাল রেখেছেন। ভাল তামাশা। তবে বিএসএফ আনুষ্ঠানিকভাবে রায়ের কথা ঘোষণা করেনি। রায়কে অবশ্য বাহিনীর মহাপরিচালকের অনুমোদন পেতে হবে। বলা হচ্ছে, ভারতের আদালতে ফেলানীর পরিবারের এই রায় চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের একজন নাগরিকের ফরিয়াদ ভারতের আদালত আদৌ শুনবে নাকি শুনবে না সেটা আগামী দিনগুলোতে বোঝা যাবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ফেলানী হত্যার এই মামলা দেখাশোনা করছেন কুড়িগ্রাম জেলা পাবলিক প্রসিকিউটর আব্রাহাম লিঙ্কন। তারা ঠিকই আশংকা করেছিলেন যে বিচারকেরা প্রথম মামলাটা শুনেছেন, তারাই আবার পুনর্বিবেচনা করছেন, এখানে একটা গোলমাল থাকবেই। তারা অন্য রায় কিভাবে দেবেন? যদি দিতেন তাহলে তাদের মেনে নিতে হোত যে তারা প্রথম রায়ে ভুল করেছেন। তাদের ভিন্ন রায়ই সেই ভুলের প্রমাণ হয়ে থাকত।
তখন প্রশ্ন উঠত কী সেই ভুল? তাই আগের রায়ই তারা বহাল রাখলেন। লিঙ্কন আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। বিএসএফের মতো একটা শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর একজন সদস্যের অপকর্মের দায় গোটা বাহিনীটাই নিজের কাঁধে নিয়ে নিল আর সেই দায় রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের ওপরেও বর্তালো। লিঙ্কন বিস্মিত হলেও এতে অবশ্য বিস্ময়ের কিছু নাই। এটাই সীমান্তে বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় নীতি।
সীমান্তে বিএসএফের গুলি চালানোর বিরুদ্ধে সরব মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’-এর প্রধান কিরিটী রায় বিবিসিকে বলেছেন বিএসএফের আদালতে আগেই স্থির করা ছিল যে কী রায় দেওয়া হবে। বিচারটা ছিল লোক দেখানো।
বলেছি, ফেলানী গোলকায়নের যুগে নতুনভাবে রাষ্ট্র ও সীমান্ত নিয়ে ভাববার চিহ্ন হয়ে উঠেছে। বলবার বেশ কিছু কারণ আছে। একটা প্যারাডক্স বা ধাঁধা তৈরি হয়েছে। সেটা হোল গোলকায়নের যুগে রাষ্ট্র এক দিকে পণ্য, পুঁজি ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বিচলন অবাধ করে দিচ্ছে, অথচ অন্য দিকে মানুষের চলাচল নানান অভিবাসন আইন ও কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রুদ্ধ করছে।এই রুদ্ধকরণের প্রক্রিয়া রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহিংস হয়, বিশেষত ফেলানীর মতো মানুষগুলো যে শ্রেণি থেকে এসেছে তারা নিত্যই রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সীমান্তে দেয়াল ও কাঁটাতারের বেড়া তুলে রাষ্ট্র তার সার্বভৌম ক্ষমতার যে প্রদর্শনী দেখাচ্ছে তা আসলে ফাঁপা। এর কারণ হোল ওয়েস্টফেলিয়ার ধাঁচে সার্বভৌমত্ব সম্বন্ধে যে পুরানা ধারণার ওপর আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল, গোলকায়নের কালে সেই বাস্তবতা আর নাই। পৃথিবী বদলে গিয়েছে। তাহলে দেয়াল বা কাঁটাতার তুলবার সঙ্গে সার্বভৌমত্ব মজবুত রাখার কোন সম্পর্ক নাই। এর ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষার যে দাবি রাষ্ট্র করে তার সঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সম্পর্ক ক্ষীণই বলতে হবে। গোলকায়নের কালে রাষ্ট্র টিকে থাকছে অবশ্যই, আমরা তা দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু টিকে আছে সন্ত্রাস ও সহিংসতার হাতিয়ার হিসাবে যার সঙ্গে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দরকারে সীমান্ত পাহারা দেবার কোন সম্পর্ক নাই।
মানুষের সঙ্গে মানুষের, দেশের সঙ্গে দেশের এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে বদল ঘটছে। এই দ্রুত রূপান্তরশীল সময়ে ফেলানী আমাদের চিন্তার জগতে রাষ্ট্র, সীমান্ত, অভিবাসন ও মানুষের নিরাপদে দেশ থেকে দেশান্তরে যাবার অধিকার সম্পর্কে নতুনভাবে ভাববার দিশা হয়ে উঠুক।
শেষ কথা হচ্ছে, ভারত ফেলানী হত্যার বিচার করবে না। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মহলে দিল্লির জবাবদিহিতার দায় কমবে না, বরং বাড়বে। আশা করি, ভারতের উচ্চ আদালতে সেটা খেয়ালে রাখবেন। অমিয় ঘোষ নির্দোষ বললে দিল্লির দায় কমে না, বাড়ে।
ফেলানী কাঁটাতারে দিল্লির কাঁটা হয়ে ঝুলে থাকবে আরো বহুকাল। সেটা নিশ্চিত।
৬ জুলাই ২০১৫। ২২ আষাঢ় ১৪২২। শ্যামলী।
farhadmazhar@hotmail.com

Print Friendly, PDF & Email