বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে আওয়ামী লীগের নিরব বিরোধিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট

0
328

এস এইচ সোহাগ: ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকে বলা হয় বাঙালী জাতির পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে যে চরম মূল্য দিতে হয়েছে বিশ্বের অন্য কোন দেশের স্বাধীনতার জন্য তা হয়নি। এবং বলাবাহুল্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক সংগঠন হচ্ছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু আওয়ামী লীগের সবাই যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন এমন দাবি যদি কেউ করে বসেন, তাহলে সেটা সঠিক হবে না। কারণ ১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সামরিক বাহিনীর নিয়োজিত প্রাদেশিক গভর্নর ডা: এ এম মালেকের নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগের নেতারাও ছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্রের সপ্তম খণ্ডে মালেক মন্ত্রিসভা সম্পর্কে যে তথ্য ছাপা হয়েছে তাতে দেখা যায়, মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন ১০ জন এবং তারা ছিলেন রংপুরের আবুল কাশেম, বগুড়ার আব্বাস আলী খান, বরিশালের আখতারউদ্দীন আহমদ, ঢাকার এ এস এম সোলায়মান, মাওলানা এ কে এম ইউসুফ, পাবনার মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, কুষ্টিয়ার নওয়াজেশ আহমদ, নোয়াখালীর ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, চট্টগ্রামের অধ্যাপক শামসুল হক ও পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশু প্রু চৌধুরী।
আবুল কাশেম ও নওয়াজেশ আহমদ ছিলেন কাউন্সিল মুসলিম লীগের নেতা। আব্বাস আলী খান ও মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা। ওবায়দুল্লাহ মজুমদার ও অধ্যাপক শামসুল হক ছিলেন আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য। এ এস এম সোলায়মান, মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাক ও আখতারউদ্দীন আহমদ ছিলেন যথাক্রমে কেএসপি, নেজামে ইসলাম ও কনভেনশন মুসলিম লীগের নেতা। আর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান দেয়া হয়েছিল অংশু প্রু চৌধুরীকে (সংগৃহীত)। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, মালেক মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী ওবায়দুল্লাহ মজুমদার স্ত্রী-পুত্রসহ দু’ মাস ভারতে অবস্থান করার পর দেশে ফিরে এসে মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং ভারত সেখানে আশ্রয় গ্রহণকারী আওয়ামী লীগের নবনির্বাচিত ‘এমএনএ ও এমপিএ’দের দেশে ফিরে আসতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্রের নবম খণ্ডে মুদ্রিত বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের বিবৃতিটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। কারণ তার ওই বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ এমপি হাবিবুর রহমানের আত্মসমর্পণের তথ্য যেমন রয়েছে তেমনি বগুড়ার মুসলিম লীগ নেতাদের মুক্তিযুদ্ধে আবদান রাখার কথাও রয়েছে। তার দেয়া তথ্য মতে, এমপি হাবিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের পক্ষপাতী ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সত্যি সত্যিই পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন এবং তাদের সহযোগিতাও করেন বলে জানা যায়।
এ এস এম সামছুল আরেফিন তার ‘মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান’ শীর্ষক বইয়ের ৩৮৫-৩৮৬ পৃষ্ঠায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ অথবা সহযোগিতাকারী যে ১৩ জন এমএনও ও ১৫ জন এমপিএ’র নাম উল্লেখ করেছেন তাদের মধ্যে প্রায় সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত।
এখন প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের যেসব এমএনএ ও এমপিএ পাক সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন, কেন তারা তা করেছিলেন ? হইত এর কিছু কারণ আছে, কারণ গুলো হতে পারে এমন : ১. নিজ এবং নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণ ২. স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগা এবং ৩. ভারতের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করা উচিত হবে কি না সে ব্যাপারে মনের মাঝে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হওয়া।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার উইটনেস টো সার্রেন্দার বইয়ে লিখেছেন, ‘ এপ্রিলের প্রথম দিকে দেশের ভেতরে অবস্থানরত ৯০ জন আওয়ামী লীগ নেতা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তারা জানিয়েছিলেন, তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হলে তারা পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে সহযোগিতা করতে রাজি আছেন।
মার্চ মাসের শেষ দিকে ইপিআর ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেনাকর্মকর্তাদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া সশস্ত্র সংগ্রাম এপ্রিলে স্তিমিত হয়ে পড়লে আওয়ামী লীগের নেতারা ভারতে চলে যান। ভারতের পক্ষ থেকে তখন পর্যন্ত ব্যাপক সাহায্য-সহযোগিতা না পাওয়ায় তাদের অনেকের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়। তারা তখন প্রকাশ্যেই দেশে ফিরে যুদ্ধ অথবা পাকিস্তানি সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আপস করার কথা বলতে শুরু করেন। জুলাই মাসে শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের এ বৈঠকে মিজানুর রহমান চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের এক নৈরাশ্যজনক চিত্র উপস্থিত করে বলেন, ‘এর চেয়ে বরং দেশে ফিরে গিয়ে যুদ্ধ অথবা আপস করা ভালো’ (সংগৃহীত)।
যেহেতু আওয়ামী লীগের বয়স্ক নেতাদের প্রায় সবাই পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন সে কারণে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে অনেকের মনে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের অনেকেই অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। অনেকে ভালোমতো পড়ালেখাও শেষ করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় নিজেকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম লীগের একজন সংগ্রামী সদস্য হিসেবে দাবি করে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এ সংগ্রামে আমাকে আমার লেখাপড়া পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্রের পঞ্চদশ খণ্ডে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের বিবৃতি থেকে জানা যায়, পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশের সময় তাজউদ্দীন আহমদের মনও বিসন্ন হয়ে পড়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী তাজউদ্দীন আহমদের মনের অবস্থাই যদি এমন হয় তাহলে অন্যদের মনের অবস্থা কী ছিল তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। সে কারণে এটা বলা খুব একটা ভুল হবে না যে, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই পাকিস্তানের ব্যাপারে মানসিকভাবে দুর্বল ছিলেন। যে কারণে তারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি বা নিতে পারেননি।
স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠনগুলোর নেতাদের মনের অবস্থাও ছিল ওই একই রকম। তবে তাদের মধ্যে এক দিকে যেমন ছিল পাকিস্তানপ্রীতি, অন্য দিকে ছিল ভারতভীতি। যে কারণে তারা মুক্তিযুদ্ধের সাথে একাত্ম হতে পারেননি !

লেখক:  আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য।

Print Friendly, PDF & Email