বাংলাদেশে নির্বাচন ছাড়া সঙ্কটের সুরাহা হবে না

0
229

AFP
ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশে নির্বাচন ছাড়া সঙ্কটের সুরাহা হবে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মধ্যে রেষারেষি কয়েক দশকের। দু’পক্ষের মধ্যে সহিংসতার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এ অবস্থায় পর্যবেক্ষকরা আতঙ্কিত যে, সর্বশেষ রক্তপাত ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠতে পারে। সহিংসতার জন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করা হলেও তার জনপ্রিয়তা এখনও ব্যাপক। তাকে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সুচির মতো গৃহবন্দি থাকতে হতে পারে বছরের পর বছর। গতকাল বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এএফপি। একই সঙ্গে তারা এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে সহিংসতা ও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিভঙ্গি। ‘নো অ্যান্ড ইন সাইট টু স্লো-বার্ন বাংলাদেশ টারময়েল’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন ক্রিশ্চিয়ান ওটোন। তিনি লিখেছেন, ১২ বছরের শিশু রাকিব মিয়া তার পরিবারের জন্য দু’মুঠো অন্ন সংস্থানের লক্ষ্যে বাসে চড়েছিল। বাসে দুর্বৃত্তের ছুড়ে মারা পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয় সে। ঢাকায় একটি হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাদৃষ্টে আশঙ্কা, এ অস্থিরতা বাংলাদেশে নিত্যদিনের জীবনযাত্রার একটি অংশ হয়ে যেতে পারে। বিলাপ করে রাকিবের মা রাশিদা খাতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন, আমার ছেলে কার কি ক্ষতি করেছে? ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে হুইল চেয়ারে করে মায়ের সামনে দিয়ে ছেলেকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি বলছিলেন, সে আমার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। সরকার ও বিরোধী দলের সহিংসতায় ঢাকার হাসপাতালে আহতদের উপচে পড়া ভিড়। এ বছর কমপক্ষে ৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন সহিংসতায়। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার সূত্রপাত। প্রধানমন্ত্রীর অনড় অবস্থান ও দলীয় কার্যালয়ে খালেদা জিয়া আটক থাকায়, আশার আলো খুব বেশি দেখছেন না কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ঢাকার বিশ্লেষক আতাউর রহমান বলেন, এ সহিংসতা চলতেই থাকবে। তাতে ধীরে ধীরে ক্ষতি হতেই থাকবে। ২০১৯ সালে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যাবে। আতাউর রহমান বলেন, খালেদা জিয়া সহিংসতার জন্য অনেকাংশে অবশ্যই দায়ী। তা সত্ত্বেও তিনি এখনও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। তার ধারণা, মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী অং সান সুচি’র মতো গৃহবন্দি হিসেবে কাটাতে হতে পারে বিরোধীদলীয় নেত্রী। খালেদা জিয়া বলছেন, ৩রা জানুয়ারি থেকে তিনি গুলশান কার্যালয় থেকে বের হতে পারছেন না। ‘প্রহসনমূলক’ নির্বাচনের প্রথম বার্ষিকীতে বিক্ষোভ-আন্দোলনের আহ্বান জানানোর সময় থেকেই তিনি কার্যালয়ে আটক। নতুন করে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে খালেদা জিয়া সড়ক-অবরোধের ডাক দিয়েছেন। তারপর থেকে শ’ শ’ যানবাহন পেট্রলবোমার আগুনে পুড়েছে। সরকার বলছে, এসব হামলা করছে বিরোধী দলের জঙ্গিরা। অন্যদিকে, বিএনপি এর দায় চাপাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল ও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ওপর।
বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মীকেও গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। গত বছরের নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতায় বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। নানা দিক থেকে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাপ্রবাহ বেশি আতঙ্কজনক। কারণ, এ ঘটনাগুলো ঘটছে বিশৃঙ্খলভাবে এবং ২০১৯ সালে নির্বাচন হওয়ার আগে সহিংসতা অবসানের সুনির্দিষ্ট কোন লক্ষণ নেই। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন ইউনিটের সার্জন সাজ্জাদ খন্দকার (৫৫) বলেন, ককটেল বা বিশেষ হাতবোমা ও পেট্রলবোমায় দগ্ধ ৫৫ জনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ১০০ শয্যাবিশিষ্ট বার্ন ইউনিটের করিডরে চিকিৎসার অপেক্ষায় স্ট্রেচারে শুয়ে আছেন বহু মানুষ। বেশির ভাগ মানুষই বলছে, কিভাবে তাদের যানবাহনে আগুন দেয়া হলো। ৫ ডলারেরও কম পারিশ্রমিকে এ হামলা চালাচ্ছে তরুণ, যুবকরা। গাজীপুরের একটি সবজির বাজার থেকে রাস্তায় পড়ে থাকা উচ্ছিষ্ট সবজি সংগ্রহ করতে যাওয়ার পথে হামলার শিকার হয় রাকিব। তার সারা শরীর আগুনে দগ্ধ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গত সপ্তাহে আহতদের দেখতে গিয়ে বার্ন ইউনিটে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন নি। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি বিএনপি’র সঙ্গে সংলাপে বসতে চান কিনা। প্রত্যুত্তরে তিনি ক্ষুব্ধভাবে বলেন, খুনিদের সঙ্গে, যারা আগুনে মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তাদের সঙ্গে? এমন প্রসঙ্গ উঠতে পারে না। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, সরকার সংলাপ নীতির বিরুদ্ধে নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা সম্ভব নয়। এএফপি’কে ইনু বলেন, আমাদের প্রধান কাজ হচ্ছে ধর্মীয় জঙ্গি হামলা প্রতিরোধ করা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে উদ্দেশ্য করে তিনি এ মন্তব্য করেন।
গত সপ্তাহে এএফপি’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরে দাঁড়ানো ও একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, সব দলের ঐকমত্যে ও আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতেই নির্বাচন হওয়া উচিত। পাল্টা জবাবে ইনু বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে ঐক্যের সরকারে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু, সেটা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। খালেদা জিয়ার নির্বাচন বর্জনকে মারাত্মক ভুল বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, জনমত জরিপগুলো বিএনপি’র জয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। ইউরোপীয় এক কূটনীতিক বলেন, খালেদা জিয়া নির্বাচনে গেলে সেই নির্বাচন ব্যাপক পর্যবেক্ষণের আওতায় হতো। ওই নির্বাচনে ভোটে কারচুপির মাধ্যমে পরাজিত হলে, খালেদা জিয়া ব্যাপক কূটনৈতিক সমর্থন পেতেন। ওই কূটনীতিক বলেন, ঢাকায় জনজীবন স্বাভাবিক। দেশকে অচল করে দিতে বিএনপি’র প্রচেষ্টা এখন তেমন একটা প্রভাব ফেলছে না। অপর এক পশ্চিমা কূটনীতিক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, খালেদা জিয়াকে কোণঠাসা করে ফেলায়, চলমান সহিংসতাই ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থা হয়ে ওঠার মতো ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ, নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় এ সহিংসতাই হয়ে উঠতে পারে স্বাভাবিক।
এ দু’নেত্রীর বিরোধ ৩ দশকের। এ জন্য তাদেরকে ‘ব্যাটলিং বেগমস’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট। অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার স্বামী সামরিক সরকারের প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধের নায়ক। দুই জনই হত্যাকা-ের শিকার হন, যা তাদের শহীদী মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে। এমনকি পরবর্তী প্রজন্মও দুই নেত্রীর শত্রুতার বিষে আক্রান্ত। খালেদা জিয়ার পুত্র ও তার সুস্পষ্ট উত্তরাধিকারী তারেক রহমান সরকারকে ভীষণভাবে অপছন্দ করেন। তিনি এখন লন্ডনে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। ২০০৪ সালে বোমা হামলার ঘটনায় অনুপস্থিতিতে তারেকের বিরুদ্ধে মামলা চলছে। বিএনপির মধ্যে কেউ কেউ আশঙ্কা করেন যে, সরকার বিএনপি’কে ধ্বংস করে দেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত। খালেদা জিয়া ও অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগ এনে তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখার ষড়যন্ত্র করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ১৯৭১ সাল থেকে প্রায় ২০টি অভ্যুত্থানের সাক্ষী বাংলাদেশ। তবে, পুনরায় সেনা হস্তক্ষেপ হতে পারে এমন রিপোর্ট নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, দ্রুত সঙ্কট সমাধানের কোন ইঙ্গিত নেই। তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এ সংঘাত চলতেই থাকবে।

Print Friendly, PDF & Email