বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় মুসলিম উম্মাহর প্রয়োজন নিরপেক্ষ মিডিয়া

0
601

 

ডা. মাহাথির মোহাম্মদDr. Mahatir Muhammod 01
আমি নিশ্চিত যে, এই সেমিনারে স্থানীয় বা বিদেশী, ইসলামী বা অ-ইসলামী মিডিয়া ইসলাম সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা পাবে; আমি আশা করি, তাদের সবার মধ্যে ইসলামের জ্ঞান প্রসারে এই সেমিনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চার্চিলের একটা বক্তব্য পরিবর্তন না করে আমি শব্দান্তরে অর্থ প্রকাশ চাই : ‘মানব জাতির ইতিহাসে কখনই এমন একটা ক্ষুদ্র জিনিস এমন বিপুল সংখ্যক লোককে এমন বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রাপ্তির সুযোগ করে দেয়নি।’ ব্রিটিশ রয়াল এয়ারফোর্স সম্পর্কে যুদ্ধকালীন সময়ে তাঁর প্রসিদ্ধ ভাষণকে বিকৃত করার জন্য উইনস্টন চার্চিল আমাকে ক্ষমা করবেন, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। কিন্তু একথা সত্য যে, বিশ্বের ছ’বিলিয়ন মানুষ যে সব সত্য পেতে চায় তার সবকিছুই, এমনকি তার চেয়েও বেশি তাকে আক্ষরিক অর্থে একটা মাইক্রোচিপ দিতে পারে। এই সুযোগকে মানবজাতি এখন যে কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে।
কেউ কল্পনা করতে পারেন যে, মানব জাতির জন্য এটা আল্লাহ প্রেরিত সুযোগ। প্রাচীনকালে কোনো কিছু রেকর্ড করে রাখার ও মৌখিক ছাড়া অন্য কোনোভাবে সংবাদ প্রেরণের জন্য মানুষ যখন লেখা আবিষ্কার করে তখন খুব কম লোকই পড়তে বা লিখতে পারতো। তাছাড়া, পাথর বা পাতার ওপর লেখার প্রক্রিয়া ছিলো শ্রমসাধ্য ও কষ্টকর। বহুদূরে কাউকে প্রেরণ করা ছিলো একেবারে অবাস্তব। কিন্তু আজকাল পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে ও স্থানে লিখিত বাক্য, কণ্ঠস্বর, এমনকি ছবিও তাৎক্ষণিকভাবে প্রেরণ করা যায়। ফলে গত তিন হাজার বছরের বেশি সময় ধরে যে সব জ্ঞান সঞ্চিত হয়েছে এবং বর্তমানে যা মন্থন করা হচ্ছে তার সবকিছুই সব স্থানের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে শেখা ও কাজে লাগানো যেতে পারে। এ বিশ্ব এখন নিশ্চিতভাবে একটা উত্তম স্থান হতে পারে। কারণ সব তথ্য আক্ষরিকভাবে মানুষের আঙ্গুলের মাথায় রয়েছে। শুধু কম্পিউটার ‘কী-বোর্ডে’র ‘কী’-তে স্পর্শ করা হলে ‘কী-বোর্ড’ অপারেটরের সামনে মুক্ত জ্ঞানের দরজা খুলে যাবে। জ্ঞানের সাথে সাথে আরও পাওয়া যাবে সব ধরনের দক্ষতার বিবরণ যা প্রত্যেককে অধিক চাকরির সুযোগ, অধিক উৎপাদনশীল এবং অধিক আয় করতে যোগ্য করে তুলবে। এর ফলে সব ব্যক্তিই লাভবান হবে; সবার জ্ঞান ও জীবনমান উন্নত হলে সব সমাজ ও জাতিও উন্নত হবে।
আমরা জানি যে, পুরো লাইব্রেরি অব কংগ্রেস ইন্টারনেট-এ পাওয়া যায়। আমরা যে জ্ঞান অর্জন করতে চাই তা ‘সফ্টওয়ার’ ও ‘সার্চ’ আমাদের জন্য সহজ প্রাপ্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কম্পিউটার সৃষ্ট তথ্যের এ ধরনের হাজার হাজার সূত্র আছে যা পাওয়ার জন্য প্রায় কোনো অর্থ খরচ হয় না। এ জগতটা বিস্ময়কর; সীমাহীন জ্ঞানের এ জগত মুহূর্তের মধ্যে যাওয়া যায়। সব ধরনের তথ্যের ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা প্রধান; হতে পারে তা ছাপার অক্ষর ও ছবির মাধ্যমে, রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে। মিডিয়াকে দমন করা ও নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে সীমিত রাখা যায় না। বিভিন্ন দেশের সীমান্ত মিডিয়ার কাছে কোনো বাধাই নয়। মিডিয়ার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বের কাছে যে কোনো সময় তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছানো যায়। কথায় অনেক কথা বলা না গেলেও ছবির মাধ্যমে হাজার হাজার কথা বলা যায়।
মিডিয়ার জন্য এখন এক অপূর্ব সুযোগ এসেছে; প্রটিটি বিষয়ের মধ্যকার সত্য প্রচার করে, অস্পষ্ট বিষয়কে স্পষ্ট করে দিয়ে সমঝোতা সৃষ্টি করে, যা ভালো তাকে উৎসাহিত করে এবং যা মন্দ তা নির্মুল করে মিডিয়া ভূমিকা পালন করতে পারে। একটা উন্নত, সুন্দর ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্ব গঠনে সহায়তা করার জন্য মিডিয়ার জন্য এখন একটা স্বর্ণোজ্জল সুযোগ এসেছে। বিশ্বকে সমৃদ্ধ করার জন্য, প্রতিটি এলাকার প্রত্যেককে সমৃদ্ধ করার জন্য মিডিয়ার সুযোগ অত্যন্ত ব্যাপক।
এ বিশ্বে অনেক বিষয়ে অনেক ভুল বুঝাবুঝি আছে। অনেক সময় ভুল তথ্যের কারণে, আবার অনেক সময় সঠিক তথ্য না পাওয়ার কারণে ভুল বুঝাবুঝি হয়। আর এই ভুল বুঝাবুঝির কারণে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চল, জাতি ও গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা একে অপরকে ঘৃণা করে, একে অন্যের দিকে ঈর্ষার দৃষ্টিতে তাকায় এবং মাঝে মাঝে একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সবাই যদি পরস্পরের বিষয়ে সঠিক তথ্য পান তাহলে তা শত্রুতা ও সন্দেহ কমাতে সহায়ক হয় এবং সবার জন্য একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ার জন্য সব গ্রুপের লোককে একটা বড় পরিবারে, মানবজাতিতে সংঘবদ্ধ করতে সাহায্য করে।
ইসলাম সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণাকে আমরা দৃষ্টান্ত হিসাবে উপস্থাপন করতে পারি। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে যতটা ভুল বুঝাবুঝি হয়েছে অন্য কোনো ধর্ম সম্পর্কে ততটা হয়নি। এ ধর্ম সম্পর্কে শুধু অমুসলিমরাই ভুল ধারণা পোষণ করে না, মুসলমানদের মধ্যেও ভুল ধারণা আছে। আর শুধু এই ভুল বুঝাবুঝির জন্য মুসলমান ও অমুসলমান এবং মুসলমান ও মুসলমানদের মধ্যে প্রতিনিয়ত সংঘর্ষ ও রেষারেষি লেগে থাকে।
গোঁড়া লোকদের একটা বড় অস্ত্র হলো অপরিবর্তনীয় ধারণা এবং নিজেকে ওইভাবে প্রকাশ করা। দৃষ্টান্ত হিসেবে সন্ত্রাসবাদের কথা উল্লেখ করা যায়। সন্ত্রাসবাদের সাথে খ্রিস্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলমান ধর্মের এবং এসব ধর্মের সাব-গ্রুপের লোক জড়িত আছে। কোনো মুসলমান সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত থাকলে ধরে নেওয়া হয় ওই সন্ত্রাসবাদের সাথে ইসলাম ধর্মের যোগসূত্র আছে। অমুসলিমরা সন্ত্রাসবাদের সাথে জড়িত হলে সন্ত্রাসীদের ধর্মকে বিবেচনায় আনা হয় না যদিও তারা তাদের বিশেষ ধর্মের স্বার্থে কাজ করে। হিন্দু ধর্মের নামে হিন্দুরা মুসলমানদের আক্রমণ করলে তাদেরকে হিন্দু সন্ত্রাসী বলা হয় না। জাপানের বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একটা শ্রেণী ‘আউম শিনরিকিও’ গ্যাসের মাধ্যমে লোককে বিষপ্রয়োগ করেছিলো; কিন্তু তাদের বৌদ্ধ সন্ত্রাসী বলা হয় না। কিন্তু বিপথগামী মুসলমানরা যদি অমুসলিম বা অন্য মুসলমানদের আক্রমণ করে তাহলে তাদেরকে চিহ্নিত করা হয় মুসলমান সন্ত্রাসী হিসেবে। ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া এভাবে পার্থক্য করে কেন?
ইসলামের ব্যাপারে মিডিয়ার এ ধরনের অন্যায় কাজের অনেক দৃষ্টান্ত আছে। ইসলামের বিরুদ্ধে মিডিয়া বিভেদমূলক আচরণ করে। এ কারণে ইসলাম শুধু বিভ্রান্তির ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়নি, এ ধর্মের বিরুদ্ধে অমুসলিমরা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই কুৎসা রটিয়েছে।
ইসলাম সম্পর্কে অসত্য তথ্য ও ভুল ধারণা ঠিক করে দেওয়ার একটা বিরাট সুযোগ মিডিয়ার আছে। মিডিয়া যদি এই সুযোগকে কাজে লাগায় তাহলে তা মুসলমান ও অন্য ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় বিরাট অবদান রাখতে পারে; এ কাজের মাধ্যমে মিডিয়া পৃথিবীতে সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারে; মিডিয়ার জগতে অনেকে অবশ্যই আছেন যারা ভালো কাজ করতে চান, বিশ্বের অনেক সমস্যার সমাধানে সহায়তা করতে চান। পরস্পরকে চেনা-জানার কাজে মানুষকে সহায়তা করে মিডিয়া ওই লক্ষ্য অর্জন করতে পারে।
ইসলাম শান্তির ধর্ম। মুসলমানরা পরস্পরকে এবং অন্যদেরকেও শান্তি কামনা করে অভিবাদন জানায়; বলে, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আমরা কামনা করি-সবাই শান্তিতে থাকুক। কিন্তু আজকাল কেউ বিশ্বাস করে না যে, মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ লোক-মুসলমান ও অমুসলমান সবার জন্য তারা শান্তি কামনা করে একথাও কেউ বিশ্বাস করে না। আমি একথা স্বীকার করি যে, আমাদের যে খারাপ পরিচিতি আছে তার জন্য আমরা মুসলমানরাই দোষী। আমাদের মধ্যে অনেক লোক আছে যারা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কাজ করে যার জন্য অন্যরা ইসলাম সম্পর্কে কুৎসা ছড়ায়। তারা এসব কাজ করে ইসলামের নামে, অথচ তারা যে কাজ করে তা ইসলামসম্মত নয়। ইসলাম চরমপন্থা অবলম্বনের ও অসহিষ্ণু হওয়ার কথা বলে না। আমাদের আদেশ দেয়া হয়েছে সহিষ্ণু হওয়ার এবং বলপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকার জন্য। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দল বা গ্রুপ ক্ষমতায় আসার পর সবাইকে ধার্মিক হওয়ার জন্য বলপ্রয়োগ করে। তারা ভুলে যায় যে, বল প্রয়োগে কাউকে ধার্মিক হতে বাধ্য করা হলে তা ধার্মিকতা হয় না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও আমাদের নিন্দাকারীরা অপবাদ থেকে মুক্ত হতে পারে না। তারা ও তাদের মিডিয়া মুসলমানদের খারাপ পরিচিতিকে চিহ্নিত করেছে।
মুসলমানরা তাদের খারাপ পরিচিতির সংশোধন করতে প্রস্তুত আছে; এজন্য প্রয়োজন মিডিয়া, বিশেষ করে পশ্চিমা মিডিয়ার সহযোগিতা। যে কেউ তার নিজের চারপাশে তাকালে দেখতে পাবে যে, মুসলমানরা সর্বত্রই নির্যাতিত হচ্ছে, নিজের দেশ থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে-বস্তুত এটা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মুসলমানদের স্বদেশভূমি থেকে উচ্ছেদ করে অন্য কোথাও বসবাস করতে বাধ্য করার প্রক্রিয়া। তারা নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কারণ সত্যি তারা অন্য মুসলমান কর্তৃক এবং বারবার অমুসলিম কর্তৃক নির্যাতিত হচ্ছে। তারা সত্যি হতভাগ্য। কিন্তু এর পরিবর্তে তাদেরকে সাধারণভাবে দায়ী করা হচ্ছে নির্যাতনকারী হিসেবে এবং এজন্য তাদের ওপর পতিত হচ্ছে দুর্ভাগ্য।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনা, কসোভো, চেচনিয়া এবং অন্য অনেক মুসলিম দেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন; ওইসব ঘটনা উচ্চস্বরে বলা আমার জন্য অকূটনৈতিকসূলভ হতে পারে। সর্বত্রই মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে। এসব ঘটনা বলার প্রয়োজন আছে। সেব্রেনিকা (Srebrenica)-য় যে হত্যাযজ্ঞ হয়েছে তা বলা দরকার। গ্রেফতার, নির্যাতন ও হত্যার কথা বলা প্রয়োজন। মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসী সন্ত্রাসীদের বলা হয় মুসলমান সন্ত্রাসী। কিন্তু মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে, তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে এবং স্বদেশ থেকে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে- ক্ষতিগ্রস্ত ও নির্যাতিত এসব মুসলমানদের কথা কেউ বলে না।
তাদের একমাত্র অপরাধ তারা মুসলমান। হ্যাঁ, নিরাশ হওয়ার পর প্রতি-আক্রমণ করেছে, কোনো কোনো সময় নিষ্ঠুরতার সাথে। তারা ভীতিকর কাজ করে। প্রায়ই তারা নির্বোধের মতো, নির্বিচারে হত্যা করে। কিন্তু হতাশা ও ক্রোধের বশবর্তী হয়ে শুধু তারাই একাজ করে না। প্রচলিত ধারায় তাদের কাজকে ঘৃণা না করে, পক্ষপাতিত্ব না করে তাদের কাজের বিবরণ কি সঠিক তথ্য দিয়ে বলা যায় না? কিভাবে তাদেরকে ভীতিগ্রস্ত করা হয়েছে, তাদের শত্রুরা, তাদের নির্যাতনকারীরা তাদেরকে কিভাবে নির্যাতন করেছে তার বিবরণ কি বর্ণনা করা যায় না?
ইরাকের কথায় ধরা যাক। কুয়েতের বিরুদ্ধে ইরাকের আক্রমণকে আমি সমর্থন করি না। ইরাকের হয়তো একটা ঐতিহাসিক দাবি আছে, কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকেরই পাশের দেশের ওপর ঐতিহাসিক দাবি থাকতে পারে। দক্ষিণ থাইল্যান্ডের ওপর মালোশিয়ার দাবি আছে কিন্তু তা ইতিহাসের বিষয়। আমরা মেনে নিয়েছি যে, তা এখন থাইল্যান্ডের অংশ এবং ঐ বিষয়ে আমরা আর কিছু বলব না। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে বিপ্লব আমরা সমর্থন করব না। ইরাকের অবশ্যই মেনে নেয়া উচিত ছিল যে, কুয়েত এখন স্বাধীন। কিন্তু আসল কথা হলো, কুয়েত আক্রমণ করেছিল ইরাক এবং পরে পরাজয় বরণ করেছিল তথাকথিত আন্তর্জাতিক শক্তির কাছে। আক্রমণকারী বাহিনী অগ্রসর হতে পারতো এবং ইরাকের নেতাকে বন্দী করতে পারতো। কিন্তু তা ঘটেনি। এর পরিবর্তে কুয়েতের তথাকথিত মুক্তি দাতারা ইরাকের ওপর সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে- ঐ নিষেধাজ্ঞার ফলে বেসামরিক লোক শাস্তি পায়-শাস্তি পায় শিশু, বৃদ্ধ, রুগ্ন ও মহিলারা। দীর্ঘ দশ বছর ধরে ইরাকের জনগণ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করে। এর কারণ ইরাকের নেতাকে পশ্চিমারা পছন্দ করত না।
এটা কি ন্যায় বিচার? যে লোকটাকে তারা পছন্দ করত না এবং যাকে তারা ক্ষমতাচ্যুত করতে পারছিল না, সে একজন লোকের জন্য ইরাকের সব মানুষকে শাস্তি দেওয়া কি ন্যায় বিচার? ইরাকের সত্যিকার দুঃখজনক ঘটনা, জনগণের দুঃখ-কষ্ট প্রকাশ করা কি মিডিয়ার উচিত ছিল না? নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য কি পত্রিকায় প্রচারণা চালানো উচিত ছিল না? এমনকি জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের ইরাকের অপরাধমূলক কাজ তদারকি করার জন্য দায়ী করা হয়; তারা ঐ দেশের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নিষ্ঠুরতার সমালোচনা করে এবং পদত্যাগ করেন। তবুও পদত্যাগকারী কর্মকর্তাদের কথা পুরোপুরি বলা হয়নি। আর ইরাকের জনগণ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করতেই থাকে।
তারা মুসলমান, এ কারণে কী মিডিয়া তাদের দুঃখ-কষ্টের বিষয় উপেক্ষা করে? আমরা তা মনে করি না। কিন্তু মাঝে মাঝে আমাদের মনে হয় যে, তারা মুসলমান বলেই এমন হয়েছে। সার্বিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত করা হয়নি। এটা কী এ কারণে যে তারা খ্রিস্টান এবং তাদের ওই অপরাধ ছিলো শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে?
এটা অবশ্যই স্মরণ করা উচিত যে সংখ্যাগরিষ্ঠ খ্রিস্টান, বৌদ্ধ বা হিন্দুদের মতো মুসলমানরাও ভালো মানুষ এবং তারা কাউকে কোনো ক্ষতি করতে চায় না। তবু তাদের সবার মধ্যকার পারস্পারিক পরিচিতি বিকৃত হয়ে গিয়েছে। প্রত্যেক সমাজে কিছু লোক আছে যারা যুক্তিহীন, কঠোর বা চরমপন্থী ও আবেগপূর্ণ। অন্যান্য ধর্মীয় গ্রুপের মধ্যেও এ ধরনের লোক আছে এবং তাদের চেয়ে মুসলমানদের সংখ্যা বেশি নয়। তারা কেমন ছিলো এবং এখন কেমন হয়েছে তা সত্যিকারভাবে উপলব্ধির প্রয়োজন আছে।
চরমপন্থা অবলম্বন অনৈসলামিক। ইসলাম চরমপন্থাকে সমর্থন করে না। বিশৃঙ্খলাকে ঘৃণা করে। ইসলামে যুদ্ধের প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে শুধুমাত্র মুসলমানদের রক্ষা করার জন্য। কিন্তু মুসলমানরা আক্রান্ত হলে তাদের কর্তব্য হলো নিজেদের রক্ষা করা। ইসলামে সন্ত্রাসী কোনো কাজের স্থান নেই। কিন্তু মুসলমান ও মুসলিম দেশের ওপর অবিচার দেখে যারা হতাশা ও কষ্ট পেয়েছে তারা ইসলামের শিক্ষাকে উপেক্ষা করে ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য তাদের নিজস্ব উপায়ে যুদ্ধ করে; বস্তুত অন্যদের তারা যেভাবে যুদ্ধ করতে দেখে সেই পথই তারা অনুসরণ করে। কারণ সন্ত্রাসবাদ ইসলামের উদ্ভাবন নয়- এটা তারা শিখেছে অন্যদের কাছ থেকে।
বিমান ছিনতাই করার বিষয়টি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে- এর উদ্ভাবন বা শুরু মুসলমানরা করেনি। একাজ শুরু করে অমুসলিমরা। তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে আখ্যায়িত করা হয় না বা তাদের ধর্মের সাথেও একাজকে জড়ানো হয় না। যে সব মুসলমান বিমান ছিনতাই করে তারা সাধারণ অপরাধীদের মতো নিজেদের সম্পদ বৃদ্ধির জন্য এ কাজ করে না। এ কাজ করার পেছনে তাদের একটা যুক্তি আছে এবং আন্তরিকভাবে
চিন্তা করে যে, মুসলমানদের স্বার্থে তারা জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে। হতে পারে এ কাজের মাধ্যমে তারা অন্যকে বিপদের মাঝে ঠেলে দিচ্ছে এবং যারা অন্যকে বিপদের মাঝে ঠেলে দিচ্ছে এবং যারা যুদ্ধে জড়িত নয় এমন লোকের ওপর বোমা নিক্ষেপ করছে তারা কী একই ধরনের অপরাধ করছে না? এটা অবশ্য তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, কিন্তু মুসলিম বিশ্ব এ ধরনের কাজকে উপেক্ষা করে না। আমরা সমঝোতার জন্য আলোচনা করতে চাই; আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা এগিয়ে আসি একটা শূন্য দেওয়ালের বিপরীতে। আমাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অমুসলিম দেশগুলোর আছে পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। আর পশ্চিমা দেশগুলোর মিডিয়া সব সময়ই পক্ষপাতমূলক। তাদের রিপোর্টিং, পর্যালোচনা ও ঘটনার বিবরণ তীর্যক ও বিকৃত- তারা একথা প্রমাণ করতে চায় যে, কিছু বিপথগামী ও হতাশাগ্রস্ত মুসলমানদের কাজে এক বিলিয়ন লোকের মুসলিম উম্মাহার ইচ্ছা ও নির্দেশ প্রতিফলিত।
এতদসত্ত্বেও প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে এবং সত্য প্রকাশ করে মিডিয়া এ অবস্থার অবসান ঘটাতে পারে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব পশ্চিমা মিডিয়া মুসলমান সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে ইচ্ছাকৃতভাবে তীর্যক কাহিনী বলে ও ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশের মাধ্যমে পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। ওইসব মিডিয়া ভুলে যায় যে, পশ্চিমা দেশগুলোর অনেক উপনিবেশের সন্ত্রাসীদের গণ্য করা হয় রাজনীতিজ্ঞ ব্যক্তি হিসেবে এবং আসলে তারা স্বাধীনতার যোদ্ধা ও নিজের দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করছে। আর স্বাধীনতা অর্জনের পর তারা নিজেদের স্বাধীন দেশের সরকারে দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে স্বীকৃত। কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট জোমো কেনিয়াতো (Jomo Keûata) কী ছিলেন? তিনি কী একজন সন্ত্রাসী ছিলেন না? এটা কী হতে পারে না যে, আজকের বা গতকালের তথাকথিত মুসলমান সন্ত্রাসী আগামীকাল মুসলিম রাজনীতিজ্ঞ ব্যক্তি হবেন না, তাদের জনগণকে পরিচালিত করবেন না এবং বিশ্বের বাকি অংশের সাথে শান্তিতে বসবাস করবেন না? অবশ্য এই সময়ে এটা কল্পনা করা কষ্টকর যে, নির্যাতনের বিরুদ্ধে দায়িত্বহীন যোদ্ধা এবং বিশেষ লক্ষ্যে যুদ্ধের পশ্চিমা পদ্ধতি অনুসরণকারী আদৌ রাজনীতিজ্ঞ হবেন কি না। তবে আমরা কী সত্যিকারভাবে বলতে পারি যে, এ ধরনের ঘটনা ঘটা একেবারে অসম্ভব?
একথা সত্য এবং সবাই স্বীকার করেন যে, মুসলমান ও তাদের জগতকে শুধু একপাশে ঠেলে দেওয়া হয়নি, তারা সত্যিকারভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। এ বিশ্বে একক মুসলিম শক্তি বলে কিছু নেই। তাদের নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতা থেকে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তারা তাদের নিন্দাকারী ও প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে তাদের বিরোধীদের ওপর তারা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। মুসলমানদের ওপর যে কোনো অন্যায় করা যাবে এবং নির্যাতনকারীরা শুধু অন্যায় করেই যাবে না, এজন্য তারা সত্যিকারভাবে প্রশংসিত হবে।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় মুসলমান বসনিয়ানদের বিরুদ্ধে সার্বদের ভয়াবহ নৃশংসতার দৃশ্য সারা বিশ্ব টেলিভিশনে প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করে। একটা ঘটনায় একজন ব্রিটিশ অফিসার খুবই বিপর্যস্ত ও ক্ষীপ্ত হয়-একটা ঘরের মধ্যে জীবিত মহিলা ও শিশু থাকা সত্ত্বেও ওই ঘরে আগুন লাগানোর ঘটনাকে সে নিন্দা করে। সেব্রেনিকা (Srebrenica)-য় হাজার হাজার লোককে সার্বরা হত্যা করে-তাদের রক্ষা করার জন্য সেখানে ইউরোপীয় বাহিনী মোতায়েন ছিলো। কিন্তু ঘটনার সময় তারা সেখান থেকে ফিরে আসে এবং অন্যদিকে তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখে।
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা ইউরোপীয় দেশগুলো ও আমেরিকা বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ও সার্বিয়ার সার্বদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে অস্বীকার করে। তারা আশঙ্কা করে যে, সার্বদের রক্ষায় রাশিয়ানরা এগিয়ে আসবে। কিন্তু অন্য কোনো এলাকায় তারা রাশিয়ানদের ভয় করেনি। তারা রাশিয়ার মিত্র ইরাকের ওপর ইচ্ছামতো বোমা নিক্ষেপ করেছে। কিন্তু সাবেক যুগোশ্লাভিয়ায় তারা রাশিয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভয় পেয়েছে। যা হোক, তারা সার্বদের নৃশংস অত্যাচার অব্যাহত রাখতে দিয়েছে। দু’লাখের বেশি বসনিয়ানদের যাদের অধিকাংশই ছিলো যুবক, তারা হত্যা করেছে এবং তড়িঘড়ি করে খোড়া কবরে তাদের নিক্ষেপ করেছে।
অনেকে ঘৃণার সাথে মন্তব্য করে যে, পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য বসনিয়া-হার্জেগোভিনা যদি তেল উৎপাদন করতো অথবা সার্বরা যদি মুসলমান হতো তাহলে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা লক্ষ্য করা যেত।
এখন আমরা দেখছি, রাশিয়ানরা বিশ্ব থেকে চেচেনদের আক্ষরিক অর্থে নিশ্চিহ্ন করছে। চেচনিয়ায় যা ঘটছে তা গণহত্যা। চেচনিয়ার বিদ্রোহীরা বিপথে চালিত। তারা জানে, তারা সম্ভবত রাশিয়ানদের পরাজিত করতে পারবে না। এটা একটা অসম প্রতিযোগিতা- দু’শ ষাট মিলিয়ন সশস্ত্র ও নির্দয় রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে মাত্র এক মিলিয়ন চেচেন। কিন্তু তারা তাদের ক্ষুদ্র ওই দেশটার জন্য স্বাধীনতা চেয়েছিলো।
কোনো দেশই তার নিজ এলাকার এক বর্গইঞ্চি ছেড়ে দিতে রাজি হবে না। কোনো দেশই তার নিজ কোনো এলাকার পৃথকীকরণকে সমর্থন করবে না, কারণ এটা একটা পূর্বদৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে তাদের নিজ এলাকার ভূমি ব্যবহারের জন্য। কিন্তু রাশিয়ান ফেডারেশন ভেঙে গিয়েছিলো এবং তার ফলে অনেক স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিলো। কিন্তু চেচনিয়া স্বাধীন হতে পারবে না কেন? সাম্প্রতিককালে ইন্দোনেশিয়া থেকে পূর্ব তিমুর-এর বিচ্ছিন্ন হওয়াকে বিশ্ব সম্প্রদায় সমর্থন করেছিলো। অনেক মুসলিম রাষ্ট্র আছে যারা রাশিয়ান ফেডারেশনের অংশ হিসেবে থাকতে সুখী বলে মনে হয়। কিন্তু চেচনিয়া স্বাধীন হতে চায়।
অন্যান্য অনেক দেশের মতো মালয়েশিয়া কোনো রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্ন হওয়াকে উৎসাহিত বা সমর্থন করে না। কারণ মালয়েশিয়া হলো কয়েকটি রাষ্ট্রের ফেডারেশন এবং আমরা আমাদের কোনো রাষ্ট্রের বিচ্ছিন্ন হওয়াকে সমর্থন করবো না। কিন্তু রাশিয়া ফেডারেশন বা যুগোশ্লাভ ফেডারেশনের অন্য অনেক রাষ্ট্রের মতো চেচনিয়া বিচ্ছিন্ন হওয়ার অধিকারী। চেচেনরা অত্যন্ত স্বাধীনচেতা মানুষ এবং একই সাথে তারা মুসলমান। তাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়টি কী শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করা যায় না?
কিন্তু রাশিয়ানরা এখন তাদের ওপর বল প্রয়োগ করছে, তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করছে এবং দৈহিকভাবে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করা হচ্ছে। রাশিয়ানদের ক্ষমতার অপব্যবহার, তাদেরকে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে কতজন লোক প্রশ্ন তুলেছে? এটা খুবই অযৌক্তিক ও অন্যায়। বিশ্বের সব মুসলমান এই অন্যায় অনুভব করেছে। তবু চেচনিয়ার সত্যিকার অবস্থা যথার্থভাবে প্রকাশ করা হয়নি। এ রকম অমানবিক, নৃশংসতাকে মিডিয়া স্পষ্টরূপে উপেক্ষা করেছে। অপরদিকে মুসলমান ও মুসলিম দেশের সামান্য অন্যায় বা দৃশ্যত অন্যায়কে একই মিডিয়া বার বার প্রকাশ করে। কাউকে বিচার ছাড়া আটকে রাখা অন্যায়। আবার সবার সামনে উন্মুক্ত বিচার কার্য সম্পাদনও অন্যায়, কারণ সেখানে নিরপরাধ বলে ঘোষণা করার কেউ থাকে না। মিডিয়ার দৃষ্টিতে মুসলিম দেশগুলো কখনও সঠিক বা ভালো কিছু করতে পারে না।
মুসলমানরা মিডিয়াকে তাদের পক্ষে পক্ষপাতিত্ব করার জন্য বলছে, এটা নয়। তারা যা চাচ্ছে তা হলো যৌক্তিক রিপোর্টিং। তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বমূলক রিপোর্ট প্রকাশের পর তাদের কথা শোনার, ঘটনা সম্পর্কে তাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, ইসলাম ও ন্যায় বিচারের জন্য তারা তাদের সব কাজের ব্যাখ্যা বা যুক্তি দিতে পারবে না। তবে এক্ষেত্রে বিশ্ব তাদের নিজস্ব মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবে।
মিডিয়ার ক্ষমতা আছে। তারা যখন একযোগে কাজ করে তখন তাদের ক্ষমতা হয়ে ওঠে আরও বেশি শক্তিশালী। আর আমরা সবাই জানি ক্ষমতা নীতিহীন। পশ্চিমা মিডিয়ার সর্বাত্মক ক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি নীতিহীন।
মিডিয়ার এখন একটা নিজস্ব এজেন্ডা আছে। বিশ্বকে নতুনভাবে গড়তে চায় মিডিয়া। বিশ্ব বা বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যা চিন্তা করে তা মিডিয়ার রিপোর্টিং-এ প্রতিফলিত হয় এমন নয়। বরং মিডিয়া যা চিন্তা করে এবং বিশ্বের জন্য যা যথার্থ বলে মনে করে তা-ই এখন মিডিয়ার বিবেচ্য বিষয়।
ফলে মিডিয়া যদি কোনো কিছুর পক্ষে বা বিপক্ষে যায়, তাহলে মিডিয়ার রিপোর্ট তার প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু অন্য অনেক গোষ্ঠীস্বার্থের মতো মিডিয়াও ভুল করতে পারে। আর কোনো ভুল করলে এবং তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারে অটল থাকলে যে ক্ষতি হয় তা ব্যাপক।
বর্তমানে বিশ্বমিডিয়া ব্যাপকভাবে পশ্চিমাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। পশ্চিমা দেশের সরকারগুলো অবশ্য তাদের নিয়ন্ত্রণ করে না, অবশ্য বাহ্যিকভাবে তাই মনে হয়। কিন্তু মিডিয়ার দৃষ্টিভঙ্গিতে পাশ্চাত্যের পক্ষপাতিত্ব ও রাজনীতির প্রতিফলন ঘটে। আর পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় ক্ষেত্রেই ইসলাম বিরোধী। ইচ্ছাকৃতভাবে মিডিয়া ওই ইসলাম বিরোধী মনোভাবকে উৎসাহিত করে।
সংজ্ঞানুযায়ী মুসলমানরা পশ্চিমা নয়। কেউ কেউ হয়তো পশ্চিমা সমর্থক, অনেক ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় পশ্চিমা সমর্থক। কিন্তু সংঘবদ্ধভাবে তারা মুসলমান এবং সব দেশ মুসলিম দেশ। ফলে তারা মিডিয়ার কাছ থেকে সহানুভূতি বা যথার্থ রিপোর্টিং পায় না। আর যেহেতু মিডিয়ার রিপোর্টিং যথার্থভাবে হয় না, সেহেতু তা হয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট। এর ফলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা জনগণ হয়ে পড়ে পক্ষপাতদুষ্ট এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি হয় ব্যাপক আকারে। এভাবে মিডিয়া মুসলমান ও অমুসলিমদের মধ্যেকার বিরোধকে জিইয়ে রাখে। এ কাজের মাধ্যমে কিছু হয়তো অর্জন করা যায়। কিন্তু তার চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করা যেতো যদি মুসলমান ও অমুসলমানদের মধ্যেকার এই বিরোধের নিষ্পত্তি হতো। আমরা সবাই একে অপরকে ভাবতে পারতাম মানবগোষ্ঠীর এক একজন সদস্য হিসেবে।
মিডিয়া যেমন শক্তিশালী, তেমনি প্রভাবশালী। বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় মিডিয়া যথেষ্ট অবদান রাখতে পারে। আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির জন্য মিডিয়া এখন বহু লোকের কাছে পৌঁছে যায়। মিডিয়া যদি সত্যিকারভাবে কল্যাণ চায় তাহলে বিশ্বব্যাপী তা শান্তি ও সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে অধিক জানারও সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে পারে মিডিয়া। অবশ্য মুসলমানদের নিজেদেরও কিছু করা উচিত। কিন্তু মিডিয়ার ভূমিকা এত বেশি ও এর ক্ষমতা এত ব্যাপক যে, শুধুমাত্র মুসলমানদের ভালো আচরণ কোনো কাজে আসবে না যদি তারা মিডিয়ার সহযোগিতা না পায়।
মুসলমানরা স্বভাবগতভাবে পাশ্চাত্য, খ্রিস্টান বা ইহুদিদের বিরুদ্ধে নয়। অন্য সবার মতো মুসলমানরা শান্তি চায়। জগতের বদান্যতায় আমরা অংশ নিতে চাই। সন্ত্রাসী ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণের মতো মুসলমানরা আবেগপূর্ণ নয়। আমাদের মধ্যে অনেকে হয়তো অন্যায় আচরণ করে; কিন্তু অন্যদের অন্যায় আচরণের চেয়ে বেশি কিছু করে না। অন্যদের মতো আমাদের একইভাবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। আমাদের মধ্যেকার সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ভালো, শান্তিকামী ও বিচারশক্তি সম্পন্ন।
আমাদের যা প্রাপ্য তা অবশ্যই মিডিয়ার দেওয়া উচিত। আমি নিশ্চিত যে, মুসলমানরা ইতিবাচক সাড়া দেবে। তবে সম্ভবত সবাই নয়, আমাদের মধ্যেকার সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ইতিবাচক সাড়া দেবে।
আমরা বলি বিশ্বভিত্তিক গ্রামের কথা। আমরা কেউ উপদ্বীপ হতে পারি না। আমরা নিকটবর্তী প্রতিবেশী, গ্রামে বসবাসরত সব মানুষই যেমন নিকট প্রতিবেশী। গ্রামের মানুষ তাদের মত পার্থক্য নিরসনে যেভাবে কাজ করে সেভাবে আমাদের সবার এগিয়ে আসা এবং সমস্যার সমাধান করা উচিত। গ্রামের লোকেরা বিরামহীনভাবে একে অন্যের বিরোধিতা করতে পারে না।
গ্রামের এই সংস্কৃতির উন্নয়নে মিডিয়া একটা বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। গ্রামে মুসলমান ও অমুসলিম বসবাস করে, তারা একসাথে কাজ করে, একসাথে তারা তাদের শ্রমের ফল ভোগ করে সমানভাবে এবং যথার্থভাবে।
বিশ্বব্যাপী অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগের ফলে বর্তমানে আমাদের সামনে এক স্বর্ণোজ্জল সুযোগ এসেছে। মিডিয়ার এ সুযোগকে হারানো উচিত নয়। বিশ্বের লোকেরা যেন ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে সঠিকভাবে জানতে পারে সে ব্যাপারে অবদান রাখার জন্য মিডিয়াকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কারণ বিশ্বব্যাপী গ্রামের ধারণার বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। একে বিকৃত করা হলে তৃতীয় সহস্রাব্দের মানুষের কাছে তা বিকৃত হয়ে থাকবে। একে সৌন্দর্যের বস্তু হিসেবে গড়ে তুলুন, তাহলে তা চিরস্থায়ী হবে।
মিডিয়ার সামনে এখন একটাই চ্যালেঞ্জ। আমরা মুসলমানরা প্রার্থনা করি ও আশা করি, বিশ্বের বাকি অংশের মানুষের কাছে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে যে বিকৃত ধারণা আছে তা নিরসনে আপনারা আপনাদের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার করে আমাদের সাহায্য করবেন। (সূত্র: এনালাইসিস ডট কম, মালেশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদের একটি ভাষণ)

Print Friendly, PDF & Email