বড় দুই দলের মনোভাব আর জনমানুষের অনুভব

0
343

ইকতেদার আহমেদ: বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়-পরবর্তী তিনটি দল যথা- আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পায়। বিগত দশকের ’৯০-পরবর্তী পর্যায়ক্রমে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন রয়েছে। জাতীয় পার্টি একাদিক্রমে প্রায় ৯ বছর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকলেও বর্তমানে দলটির তেমন জনসমর্থন নেই। জামায়াতে ইসলামী কখনো পৃথকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না হলেও পঞ্চম সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী বিএনপি জামায়াতের নিঃশর্ত সমর্থনে সরকার গঠন করে। অষ্টম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসনে বিজয়ী হলেও জামায়াতে ইসলামীকে সরকারের অংশীদার করে দু’টি মন্ত্রিত্ব প্রদান করে। ’৯৬-পরবর্তী জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী এককভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ না হওয়ায় এ দল দু’টির জনসমর্থনের সঠিক হার নিরূপণ সম্ভব হয়নি। বর্তমানে বড় দু’টি দল বলতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে বোঝায়, যদিও দশম সংসদ নির্বাচনটি বিএনপি ও অন্যান্য দলের বর্জনের মুখে একতরফাভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিএনপি বিষয়ে যে মনোভাব, তা হলো এ দলটি ক্ষমতাসীন হলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবেন। এ আশঙ্কা থেকেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় এমন কোনো নির্বাচন করতে চায় না, যাতে দলটিকে পরাভূত হয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়। আওয়ামী লীগের এ মনোভাবের কারণেই দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তার জোটভুক্ত জামায়াতে ইসলামীর অংশগ্রহণ সম্ভব হয়নি।

বিএনপির আওয়ামী লীগ বিষয়ে যে মনোভাব, আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে সে নির্বাচনে অবশ্যম্ভাবীভাবে দলটির বিজয় নিশ্চিত করবে। এখানে বিএনপির প্রতি জনসমর্থনের বিষয়টি গৌণ। মুখ্য হলো কূটকৌশল ও অপকর্মের মাধ্যমে বিএনপিকে নির্বাচনে পরাভূত করা হবে এবং নির্বাচন-পরবর্তী দলের নেতাকর্মীদের ওপর এমনভাবে নিষ্পেষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে দলটি মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে। বিএনপির মতো আওয়ামী লীগও মনে করে, বিএনপি ক্ষমসতাসীন থাকাবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করলে আওয়ামী লীগের পক্ষে কখনো বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন সম্ভব নয়।
বড় দু’টি দলের পরস্পরের প্রতি এ অবিশ্বাসের কারণেই একদা আমাদের দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল এবং এ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত দু’টি নির্বাচনের প্রথমটিতে আওয়ামী লীগ এবং দ্বিতীয়টিতে বিএনপি জয়লাভ করে। এ দেশে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামী যুগপৎভাবে আন্দোলন করে সফল হয়।

অষ্টম সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগ লগি-বৈঠা হাতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ শুরু করলে দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী নির্মমভাবে হতাহত হয়। এ পরিস্থিতিতে দলটির নেতাকর্মীরা ভীতসন্ত্রস্ত ও হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনসংক্রান্ত সব বিকল্পকে নিঃশেষিত না করেই বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থনপুষ্ট সমসংখ্যক সদস্য উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেছিলেন। এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি সংবিধান নির্দেশিত পন্থায় কাজ না করার কারণে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে যারা উপদেষ্টা পদে নিয়োগ লাভ করেছিলেন, তারা পদত্যাগ করেন। অতঃপর এদের স্থলাভিষিক্ত হয়ে যারা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন, তাদের সমভিব্যহারে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর স্থলাভিষিক্ত হয়। সে সময় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ পেছন থেকে সমর্থন জুগিয়েছিল। এমনকি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারটি ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন হলে এ সরকারের সব কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেবেন। পরবর্তীকালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশের অধিক আসন লাভ করে বিজয়ী হলে উচ্চ আদালত কর্তৃক এক দিকে পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হয়, অপর দিকে সংসদ সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সাংবিধানিক বৈধতার পরিবর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বৈধতাবিষয়ক আপিল রায়ে অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার অবতারণায় আদালত ওই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেয়া হয়। এ কাজগুলো যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশনায় করা হয়েছিল, সেটুকু বোঝার বোধশক্তি এ দেশের জনমানুষের রয়েছে।
অষ্টম সংসদের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী বিএনপি সরকারের নিয়োগ দেয়া রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নবম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হতে পারবে না, মূলত এ আশঙ্কার কারণেই আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এর স্থলাভিষিক্ত হয়। এ দু’টি তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধান অনুযায়ী গঠিত না হওয়ার কারণে উভয়ের বৈধতা বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আর আদালত অপ্রাসঙ্গিক আলোচনার অবতারণায় যে বৈধতা দেয়া হয়েছে তা নিয়েও জনমনে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়েছে।

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের গণপরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন সত্ত্বেও দলটিকে সরকার গঠন করতে না দেয়ার কারণে পরবর্তীকালে সে সময়কার আওয়ামী লীগের অসহযোগ আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ লাভ করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অবধি আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক দল হলেও স্বাধীনতা-পরবর্তী এর গণতান্ত্রিক চরিত্রের বিলোপ ঘটে।
গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে শাসনক্ষমতা না দেয়ার কারণে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম হলেও এ রাষ্ট্রটিতে কখনো জনমত সপক্ষে থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীনদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধীদের জয়লাভ করতে দেয়া হয়নি। ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় নির্বাচন বিষয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আচরণে কোনো ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয় না।

এ দেশে ক্ষমতাসীনদের অধীনে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে যেমন ক্ষমতাসীনেরা কখনো পরাভূত হয়নি, অনুরূপ ক্ষমতাসীন-বহির্ভূতদের অধীন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কখনো নির্বাচন অনুষ্ঠান-পূর্ববর্তী যারা ক্ষমতাসীন ছিল, তারা কখনো জয়লাভে সমর্থ হয়নি।
এ দেশের বড় দু’টি দলের একের প্রতি অপরের আস্থা না থাকার কারণেই এদের পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ দানা বেঁধেছে। এ অবিশ্বাস সহজে দূর হওয়ার নয়। অতীতে দেখা গেছে অস্থায়ী সরকার, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাভূত দল পরাজয়কে সহজভাবে বরণ করে নিতে পারেনি। আর এ কারণেই দেখা গেল প্রতিটি নির্বাচন-পরবর্তী পরাভূত দল বিজয়ীদের সরকার পরিচালনায় সহযোগিতার আশ্বাসের পরিবর্তে সরকারকে অসহযোগিতার বাণী শুনিয়ে অস্থিতিশীল করার হুমকি দিয়েছিল।
আমাদের দেশে একটি সরকারের মেয়াদ অবসান-পরবর্তী নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে জনমানুষের সমর্থন ছিল। এ বিষয়ে এখনো জনমানুষের সমর্থন চাওয়া হলে তাদের ব্যাপক অংশ যে এর পক্ষে অবস্থান নেবে, এ প্রশ্নে কোনো সংশয় নেই; যদিও বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের ব্যবস্থা বাতিল করে সে পথে বাধায় সৃষ্টি করেছে।

বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের একক সিদ্ধান্তে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল এবং সাধারণ জনমানুষের জনমতকে উপেক্ষা করে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এ ব্যবস্থাটি বাতিল-পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে সংবিধানের বর্তমান যে অবস্থান, তা হলো সংসদ বহাল থাকাবস্থায় ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃবৃন্দের আচরণ পর্যালোচনায় এ দেশের জনমানুষ ইতোমধ্যে পর্যবেক্ষণ করেছে, সংসদ বহাল থাকাবস্থায় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের জন্য সমসুযোগ সংবলিত মাঠ সৃষ্টি করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন যেমন সম্ভব হয় না, অনুরূপ ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারও এরূপ নির্বাচন আয়োজনে সক্ষম এমন প্রমাণ রাখতে ব্যর্থ হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন-পরবর্তী আওয়ামী লীগ প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ হয়েছে। দলটির এ ব্যর্থতার কারণে আগামীতে এ দলটির অধীন অথবা অন্য কোনো দলীয় সরকারের অধীন জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সে নির্বাচন যে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে না, জনমানুষের মধ্যে এমন ধারণা বিরাজমান। যেহেতু আওয়ামী লীগের একক সিদ্ধান্তে জনমানুষের নিকট গ্রহণযোগ্য নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। সেহেতু আওয়ামী লীগেরই দায়িত্ব এমন নির্বাচনব্যবস্থার উদ্ভাবন যাতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনমতের প্রতিফলনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল সরকার গঠনপূর্বক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করতে পারে।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনমানুষের সমর্থনের প্রতিফলনে একটি দল সরকার গঠন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করে। আমাদের দেশে এ প্রতিফলন অস্থায়ী সরকার, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্ভব হলেও ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কখনো সম্ভব হয়নি। আর এ কারণেই জনমানুষের অনুভব ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের পরিবর্তে অন্তর্বর্তী কোনো সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে জনসমর্থন অনুযায়ী বড় দু’টি দল আসন লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার গঠনপূর্বক রাষ্ট্্র পরিচালনার দায়িত্ব লাভ করবে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এ দেশটির জন্মলাভ ঘটেছিল। কোনো ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এ দেশে দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আর তাই সংবিধানের চেতনার আলোকে আমরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে এগিয়ে যেতে চাইলে অবশ্যম্ভাবীভাবে আমাদের দলীয় মনোভাব পরিহার করে জনমানুষের অনুভবকে প্রাধান্য দিতে হবে।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

E-mail: iktederahmed@yahoo.com

Print Friendly, PDF & Email