মৃত্যু হচ্ছে বিবেক, চেতনা ও মানবিকতার

0
334

সৈয়দা পাপিয়া: বর্তমানে জাতি এক ক্রান্তিকালে উপনীত হয়েছে। রাজনৈতিক আকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা, অন্ধকারাচ্ছন্ন কালো মেঘ, গুমোট হাওয়া ও দমবন্ধ হয়ে আসার মতো পরিবেশ বিরাজ করছে। গণতন্ত্র অবরুদ্ধ। সংশোধনের নাম করে সংবিধান ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ ক্ষমতাসীন দলের ফ্রন্টগুলো ও দলীয়কৃত পুলিশের হাতে পিষ্ট হচ্ছে মানবতা। হত্যা, গুম, সন্ত্রাস, অপহরণ ব্যাপক আকার ধারণ করছে। বিরোধী দল নিধন অভিযান ’৭২-৭৫ এর শাসনামলের চেয়েও বৃদ্ধি পেয়েছে।

যদি একজন কবিকে বলা হয়, তুমি আজ থেকে কবিতা লিখতে পারবে না; একজন সঙ্গীতশিল্পীকে বলা হয়, তুমি গান গাইতে পারবে না; একজন লেখকের কলম কেড়ে নিয়ে লেখা বন্ধ করতে বলা হয়; তাহলে অবস্থাটা কেমন দাঁড়াবেÑ স্বাভাবিক, না অস্বাভাবিক?

সন্ত্রাসীদের জেলখানা থেকে মুক্ত করে বাইরে আনা হয়, আর যদি নিরপরাধ মানুষকে জেলখানায় রাখা হয়, তবে কেমন হবে? ঠিক তেমনি রাজনৈতিক কর্মীকে মাঠে নামার আগেই যদি মামলা দিয়ে মাঠ ছাড়া হতে বাধ্য করা হয়, তাহলে পরিবেশ কী রকম হবে?

বনের পাখির ডানা ভেঙে, বেঁধে উড়তে না দিলে, পাখির প্রতিদিনের যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, তা থেকে বঞ্চিত হবে প্রকৃতি। পানির মাছ ডাঙায় তুলে আনলে অল্প সময়ের ব্যবধানে ছটফট করে মারা যাবে। প্রকৃত সন্ত্রাসীরা যদি অবাধে বিচরণ করতে পারে আর নিরীহ নিরপরাধ মানুষ যদি জেলখানায় থাকে, তাহলে দেশ সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হবে। জনমনের স্বস্তি, শান্তি-শৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা উঠে যাবে। সর্বত্রই ভারসাম্যহীনতা, অরাজকতা এবং অস্বস্তিকর ও বসবাসের অযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের অবস্থা তদ্রƒপ।
রাজনীতিবিদেরকে মিছিল, মিটিং, রাজনৈতিক বক্তব্য, টকশো, থেকে অনুপস্থিত রেখে মিথ্যা মামলা, গুম, খুন, ক্রসফায়ার, গ্রেফতারÑ এসবের মাধ্যমে বিরোধী মত মুছে ফেলার এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে বর্তমান সরকার।
সব বেসরকারি চ্যানেল বিটিভিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। সরকারের সুবিধাভোগী কিছু ব্যক্তিÑ তাদের মধ্যে আছেন কোনো কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান ভিসি, কিছু দলীয় শিক্ষকÑ টকশোর নাম করে প্রতিনিয়ত সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া আর নীতিবিবর্জিতভাবে বিরোধী দলের সমালোচনায় মুখর। প্রতিনিয়ত তারা বিএনপিকে জ্ঞান দিচ্ছেন। বিএনপির কী অনুচিত, কোনটা উচিত, বিএনপির কোন কমিটি ব্যর্থ, কোনটি সফলÑ তা নিয়ে কথার শেষ নেই। বিরোধী মত নির্মমভাবে দমনের মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চলছে। এক দিকে সরকার বলছে হরতাল-অবরোধ হচ্ছে না, অন্য দিকে বলছে এসএসসি পরীক্ষা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই লোকসানের পাহাড়। এসব কথা প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। দেখলাম, মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে সরকারি স্থাপনা রক্ষার জন্য সিসি ক্যামেরা এবং বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার। অথচ জনগণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা বর্তমান সরকার গ্রহণ করেনি গুরুত্বের সাথে। জনগণকে যেভাবে দুর্ভোগের শিকার করা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে ৫ জানুয়ারি জনগণ যেহেতু ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যায়নি, সেহেতু জনগণ মরলেই কী আর বাঁচলেই কী। আওয়ামী লীগের ওপর থেকে জনগণের যেহেতু আস্থা উঠে গেছে, তাই এই জনগণের প্রতি যেন সরকারের কোনো দায় নেই। অথচ কথায় কথায় এই সরকার বলে, ‘জনগণ খুব স্বস্তিতে আছে, নিরাপদে আছে, জনগণের নিরাপত্তার জন্য যা যা করার তাই করা হবে।’ তাহলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন কি নাগরিক হিসেবে জনগণের একজন নন? ছাত্রদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুজ্জামান খোকন কি মানুষ নন? এদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কি সরকারের ওপর বর্তায় না ?
আমেরিকার নাগরিক হওয়ার কারণে যদি অভিজিতের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে এফবিআই বাংলাদেশে আসতে পারে তাদের দেশের নাগরিক বাংলাদেশে খুন হওয়ার কারণে এবং অভিজিতের স্ত্রীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসার বিবেচনায় ত্বরিত তাকে নিয়ে যেতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কাছে সালাহউদ্দিন আর খোকনের সন্ধান চাওয়া কি অপরাধ? সন্ধান দিতে না পারা কি সরকারের বিরাট ব্যর্থতা নয়? একের পর এক ব্যর্থতার দায় নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা কি লজ্জাকর নয়?
যে বাংলাদেশে অভিজিত জন্মেছিলেন সেই বাংলাদেশেই কয়েক দিনের জন্য বেড়াতে আসা তার নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে, যে কারণে মর্মান্তিকভাবে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছে তাকে। সরকার ভাবছে নিজেদের নিরাপত্তা এবং অবৈধ পথে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে, অর্থাৎ ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে প্রশাসনের যারা সহযোগিতা করেছিল তাদের নিরাপত্তা নিয়ে। পুলিশের সামনেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে; অভিজিতের স্ত্রী বন্যার ভাষ্য মতে, পুলিশ নীরব-নিথরভাবে দাঁড়িয়ে তা দেখেছে। ধর্মে বিশ্বাস করে না এমন কেউ মারা গেলে সরকার বলবে, জঙ্গিরা মেরেছে। এ খেলা কত দিন চলবে? নাগরিক হিসেবে আমরা বুঝি, জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা আর সরকারি দলের নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রতিটি মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা। এটা দিতে সরকার পেরেছে কি? একজন স্ত্রীর কাছে স্বামী তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, সন্তানের কাছে তার শ্রেষ্ঠ মানুষ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে সন্তান তার সর্বাধিক ভালোবাসার নিদর্শন।
বাবা, মা, স্বামী, সন্তান তথা প্রতিটি পরিবারের সদস্য এবং সর্বোপরি, রাষ্ট্রের নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এই সরকার। মাহমুদুর রহমান মান্নাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ২৩ ঘণ্টা পর স্টার কাবাবের ওখান থেকে তুলে আনা হয়েছে বলে অবিশ্বাস্য গল্প বানিয়ে ডিবি অফিসে হস্তান্তর করেছে। সরকারকে ধন্যবাদ, গল্প বানিয়ে হলেও অবশেষে মান্নাকে জীবন্ত ফেরত দিয়েছে।

রাষ্ট্রের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে জানতে চাই, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন ও ছাত্রনেতা খোকন ফেরত আসবে কি? এলে জীবিত, না মৃত ? জীবিত হলে কথা নেই; কিন্তু মৃত এবং না পাওয়া গেলে কথা আছে অনেক। ৭২ বছর বয়সে নির্মল সেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চেয়েও দেখে যেতে পারেননি। খান আতাউর রহমান ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছায়াছবিতে যাদেরকে মানুষ হতে বলেছেন তারা আজো কি মানুষ হতে পেরেছে? ছড়াকার সালেহ লিখেছেনÑ ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কথা, রক্ত দিয়ে পেলাম এমন আজব স্বাধীনতা।’ স্বাধীনতার ৪৪ বছর পার হয়ে গেলেও কষ্টার্জিত স্বাধীনতার কথিত সেবকেরা স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি পর্যন্ত দিতে পারেননি। সরকারকে হৃদয়ের আকুতি দিয়ে বলতে চাইÑ সালাহউদ্দিন ও ছাত্রনেতা খোকনের ভাগ্যে যাতে ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলমের মতো কোনো ঘটনা না ঘটে। রাষ্ট্রের একজন নাগরিকের মৃত্যুর কারণ কোনো দিন পরিবারের সদস্যরা জানবে না,স্বজনেরা মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে পারবে না, পরিবারের লোকেরা লাশ নিয়ে গোরস্থানে যেতে পারবে না, কবর জিয়ারত করতে পারবে না, সহকর্মীরা ফুল দিয়ে কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবে নাÑ এ কোন করুণ পরিণতির সম্মুখীন করেছে সরকার? রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, মতের পার্থক্য, পছন্দ, অপছন্দ, প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতার পালাবদল সবই থাকবে; কিন্তু এসব কারণে পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দিতে হবেÑ এ কোন নিষ্ঠুর বিধান? চরম শত্রুও যেন এ রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন না হয়, এটাই সবার প্রত্যাশা হওয়া উচিত।
১৪ মার্চ ২০১৫-তে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভায় বলেছেন, সালাহউদ্দিনকে ময়লাভর্তি ব্যাগে করে কোথাও পাচার করা হতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বলেছেন, নিখোঁজ বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর মতো যুগ্ম মাহসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। ১৫ মার্চ সংশ্লিষ্ট আদালতে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছেন, সালাহউদ্দিনের খোঁজ তাদের কাছে নেই, যদি খোঁজ পায় তাহলে সরকারপক্ষ আদালতকে অবহিত করবে। ঠিক ইলিয়াস আলীর ব্যাপারেও একই রকম কথা সরকারকে বলতে শোনা গিয়েছিল।
ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের চেয়ে এক দিক থেকে অভিজিৎ ভাগ্যবান। যে দেশে তিনি জন্মেছেন, সে দেশের সরকার তার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে; কিন্তু তার দ্বিতীয় দেশ যেটি, রাষ্ট্রীয়ভাবে সেই দেশের সরকার তাদের নাগরিক অভিজিৎ-বন্যার পাশে দাঁড়িয়েছে। অভিজিৎকে আর ফেরত পাওয়া যাবে না ঠিকই, কিন্তু বিদেশের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের শেখার কিছু আছে। নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী কীÑ আশা করি, সরকার তা বুঝতে পারবে। অভিজিতের প্রতি তার দ্বিতীয় রাষ্ট্র যে দায়িত্ব পালন করেছে, বর্তমান সরকার যগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ছাত্রনেতা খোকনের ক্ষেত্রে সে দায়িত্ব কি পালন করবে? সহকর্মীর অস্বাভাবিক পরিণতি দেখে আবেগ-অনুভূতি, হৃদয়ের বোবাকান্না, চোখের পানি, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার স্মৃৃতি আমার মতো নিশ্চয়ই অনেককেই দুমড়ে-মুচড়ে তছনছ করে দিচ্ছে। জীবনের কোথায় কখন যে ছন্দ পতন ঘটে গেছে, তা বুঝে উঠতে পারছি না। অসহ্য যন্ত্রণা নিত্যদিনের সাথী। জীবনে বেঁচে থাকার সুযোগটাও মনে হয় সীমিত হয়ে গেছে। জীবন্ত-প্রাণবন্ত, যগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ছাত্রনেতা খোকনসহ সব অপহৃত ব্যক্তিকে ফেরত চাই। সরকারের দায়িত্বশীলপর্যায় থেকে যে বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে, তা অশান্তির বার্তা বহন করে। যারাই এদের তুলে নিয়ে যাক, অনুগ্রহ করে ওদের ফেরত আসার ব্যবস্থা করে সমাজে শান্তি ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনুন। রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার চেয়ে সরকার জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালন করুকÑ এটাই সর্বস্তরের জনগণের প্রত্যাশা। এই প্রত্যাশার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে দায়িত্বশীল হোন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিরা।
বর্তমান সরকার বেঁচে থাকার আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। প্রতিটি মানুষের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত দুঃসহ মনে হচ্ছে। শুধু মানুষের মৃত্যু হচ্ছে না; মৃত্যু হচ্ছে বিবেক, বুদ্ধি, চেতনা ও মানবিকতার। এত মানুষ মেরে, বাংলাদেশকে জিম্মি করে ক্ষমতা দখল করে রাখার পেছনে কোন মহত্ত্ব নিহিত আছে?
নাগরিকের সেবা নিশ্চিত করার জন্যই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের জন্য নাগরিক নয়। অবশ্যই সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা আছে; কিন্তু নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা বিঘিœত করে নয়। মানুষের জন্য সরকার, রাষ্ট্র ও সংবিধান। রাষ্ট্র কিংবা সরকারের প্রয়োজনে মানুষ ও সংবিধান নয়। সরকারের দীর্ঘ স্থায়িত্বের জন্য মানুষের জীবনকে উৎসর্গ করতে হবে কেন? গুম, খুন, বোমায় দগ্ধ হয়ে কত দীর্ঘ হবে মৃত্যুর মিছিল, কত দিন দীর্ঘায়িত হবে পরিকল্পিত অপহরণ আর গুম-খুনের নাটক? টেলিফোনে আড়ি পেতে এবং সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ফুটেজ সংগ্রহ করে যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন ও ছাত্রনেতা খোকন কোথায় আছে সরকার খুঁজে বের করুক। এটাই সময়ের দাবি।
লেখিকা : আইনজীবী ও সাবেক সংসদ সদস্য

Print Friendly, PDF & Email