যৌন হয়রানি বিষয়ে সচেতন নন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা

0
160

Jouno Oporad

ঢাকা: কোন ঘটনাগুলো আসলে যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে তা নিয়ে কোনো রকম ধারণাই নেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের। আর এ কারণেই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যৌন হয়রানি বেড়েই চলেছে। আর এগুলো এমনভাবে ঘটছে যা চেপে যাওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যৌন নির্যাতন অভিযোগ কমিটির এক শিক্ষক জানিয়েছেন, হাইকোর্টের নিয়মানুযায়ী কোন বিষয়গুলো যৌন হয়রানিতে পড়ে তার ব্যাপারে অনেকটা অন্ধকারেই রয়ে গেছে ছাত্ররা। তিনি বলেন, ছাত্রীরাও জানে না কোন ধরনের যৌন হয়রানির ঘটনা তারা প্রকাশ করবে কিংবা কিভাবে জানাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই শিক্ষক আরো জানান, গত আড়াই বছরে তারা চারটি যৌন হয়রানির অভিযোগ পেয়েছেন। এর মধ্যে তিনটি শিক্ষার্থী এবং অপরটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, অধিকাংশ যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে স্নাতক পর্যায়ের নিচের শ্রেণীগুলোতে। সে তুলনায় স্নাতক পর্যায়ে এ ঘটনা খুবই কম ঘটে থাকে।

২০০৯ সালে হাইকোর্টের এক রুল অনুসারে যৌন হয়রানি বন্ধে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটি গঠন করার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।
জানা যায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশ অনুষদের শিক্ষার্থী জানেন না কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটি কাজ করে থাকে। তন্ময় নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, এক সপ্তাহ আগেই আমি একটি যৌন হয়রানির ঘটনা দেখেছি। সেখানে দেখলাম এক ছাত্র আরেক ছাত্রীকে ইভটিজিং করছে। তাকে যৌন হয়রানিমূলক ভাষা প্রয়োগ করতে দেখেছি। আমি ওই ছাত্রীর পক্ষ হয়ে যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটির কাছে নালিশ করবো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী জানান, দুই বছর আগে শিক্ষকের যৌন হয়রানির জন্য আমি বিভাগীয় প্রধানের কাছে নালিশ করেছিলাম। কিন্তু আমি তা যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটির কাছে বলিনি।
ওই শিক্ষার্থী জানান, বেশ কিছু দিন ধরেই স্যার চাচ্ছিলেন আমার কাছে আসার জন্য। যখন আমি তার প্রস্তাব প্রত্যাখান করলাম তিনি ভয় দেখালেন একাডেমিক ক্ষতির।তার বার বার কু-প্রস্তাবের কারণে আমি দ্বিতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারিনি।অবশেষে আমি আমার শিক্ষাজীবনের নিরাপত্তা চেয়ে বিভাগীয় প্রধানের কাছে লিখিত আবেদন জানাই।
অভিযোগের পর ওই শিক্ষককে নিষেধ করা হয় অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর ক্লাসে না যাবার জন্য। এর কয়েক মাস পরই অভিযুক্ত শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে যান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শিক্ষক জানান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উচিত যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটির বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা বৃদ্ধি করা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটির সভাপতি মাহবুবা কানিজ কেয়া বলেন, আমার কমিটির বিষয়ে প্রচারণা চালাতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটকে জানিয়েছি। কিন্তু এখনো আমরা তেমন কোনো অগ্রগতি দেখিনি।
তিনি বলেন, যৌন হয়রানি বন্ধে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা প্রতিটি বিভাগে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ বিষয়ক নির্দেশনা পাঠিয়েছি।
মাহবুবা কানিজ কেয়া জানান, যৌন হয়রানির অনেক ঘটনা ঘটে থাকলেও আমরা খুব কমি তার নালিশ পাই। কারণ পুরষ শাসিত সমাজের ধারণা থেকে মেয়েরা অভিযোগ করতে ভয় পায়। এমনকি ভবিষ্যতের কোন হুমকি এড়াতে তারা নালিশ থেকে দূরে থাকে।
২০১১ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে এই কমিটি গঠনের পর তদন্ত প্রতিবেদন অনুসারে জানা যায়, তিন শিক্ষক এবং এক নির্দেশককে যৌন হয়রানির অভিযোগে বরখাস্ত করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় যৌন হয়রানি তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর রাশেদা আক্তার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের কাছে যৌন হয়রানির অনেক অভিযোগ আসে। আর তিনি তা কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেন।
তিনি বলেন, গত চার বছরে কমিটির কাছে নয়টি অভিযোগ এসে জমা পড়েছে। এর মধ্যে চারটি ঘটনা এ বছর সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ছাত্র এবং একটি শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
রাশেদা আক্তার বলেন, কেবল একটি ব্যতীত, কারণ এর অভিযোগকারী এখন বিদেশে রয়েছেন। এছাড়া বাকি সব অভিযোগের আমরা তদন্ত করেছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও নিয়েছি।
যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সচেতনতা কম তৈরি হচ্ছে দাবি করে রাশেদা আক্তার বলেন, যৌন হয়রানির বিষয়ে হাইকোর্টের রুলের বিস্তারিত আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে বুকলেট আকারে পৌঁছে দিয়েছি। যৌন হয়রানি মোকাবেলায় তাদের কি করতে হবে সেখানে তাও উল্লেখ আছে।
ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সামাজিক মনোবিজ্ঞানী নওশিন নাহার বলেন, যৌন হয়রানি বিষয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের কোনো বুকলেট দিইনি। কিন্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি আমরা কর্মশালা ও পোস্টারিং করেছি।
নাহার বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেয়েরা সামাজিক প্রত্যাখানের ভয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে চায় না। এছাড়া তাদের পারিবারিক ভয়ও রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক মহিলা শিক্ষার্থী জানান, “পারিবারিক চাপের কারণেই অনেকে যৌন হয়রানি অভিযোগ থেকে দূরে থাকেন।” এক মাসে আগে তিনি নিজেও প্রভাবশালী এক ছাত্র নেতার প্রস্তাবের শিকার হয়েছিলেন বলে জানান।
তিনি বলেন, আমি প্রস্তাব প্রত্যাখান করলে, সে বেশ কয়েকবার আমাকে চড় দেয়। এর এক পর্যায়ে আমি মাটিতে পড়ে যাই। আমার দুই বান্ধবী আমার দিকে এগিয়ে আসলে সে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায়। এ ঘটনার পর প্রভাবশালী ওই ছাত্র নেতা ঘটনা না প্রকাশের জন্য ফোনে হুমকি প্রদান করে বলেও জানান ওই শিক্ষার্থী।
তিনি জানান, আমি এ ঘটনাটি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানাতে চাইলে বন্ধুরা তাতে রাজি হয়নি। পরে আমি তা মা-বাবার কাছে প্রকাশ করি।
তিনি বলেন, আমাকে শান্তনা না দিয়ে, বাবা বলেন, আমি যেন এ ঘটনা কোথাও প্রকাশ না করি।
ওই শিক্ষার্থী জানান, এ ঘটনার জন্য আমার পোশাককে কারণ হিসেবে মা অভিযোগ করলে আরো কষ্ট বেড়ে যায়। তিনি আমাকে পরামর্শ দেন আমি যেন ক্যাম্পাসে সব সময় পর্দা করে যাই। এর একদিন পরই মা রাজশাহীতে আসেন এবং আমাকে নেকাব কিনে দেন। এরপর থেকে আমি নেকাব পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই।

হাইকোর্টের রুল অনুসারে যে বিষয়গুলো যৌন হয়রানি হিসেবে গণ্য হবে তা হলো:
১. সরাসরি কিংবা কারো ইচ্ছায় কাউকে শারীরিকভাবে লাহ্ছিত করা বা তার দিকে অগ্রসর হওয়া।
২. প্রশাসন , কর্তৃপক্ষ কিংবা কোন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির অপপ্রয়োগে কারো সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন কিংবা স্থাপনের চেষ্টা করা।
৩. যৌন হয়রানিমূলক বাচনগত অঙ্গি-ভঙ্গি।
৪. যৌন আচরণের জন্য দাবি কিংবা আবেদন।
৫. পর্ণোগ্রাফি প্রচার করা।
৬. যৌনতামূলক কথাবার্তা কিংবা অঙ্গি-ভঙ্গি।
৭. অশালীন অঙ্গ-ভঙ্গি, বাজে কথা বলে বিরক্ত করা, গোপনে কারো দিকে এগিয়ে যাওয়া, যৌন বিষয়ে উপহাস করা।
৮. চিঠি দিয়ে অপমান করা, ফোন-মোবাইলে কল করা, এসএমএস করা, জোর করে বিরক্ত করা, নোটিশ, কার্টুন, বেঞ্চ, চেয়ার, টেবিল, দেয়াল, ফ্যাক্টরি, শ্রেণীকক্ষ, বাথরুমে যৌন ইঙ্গিতময় লেখালেখি।
৯. কাউকে ব্ল্যাকমেইল কিংবা চরিত্র হননের জন্য স্থির চিত্র কিংবা ভিডিও ধারণ করা।
১০. লিঙ্গগত কারণে কিংবা যৌন হয়রানির উদ্দেশ্যে কাউকে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক, সাংগঠনিক এবং একাডেমিক কাজ থেকে দূরে রাখা।
১১. কাউকে ভালোবাসার প্রস্তাব দেয়া, ভালোবাসা প্রত্যাখান করলে তার জন্য হুমকি দেয়া।
১২. প্রতারণা করে কিংবা জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা।

Print Friendly, PDF & Email