রিমান্ডের ডিমান্ড এবং জাফর ইকবালের গলার দড়ি

0
330

মাসুদ মজুমদার:

ক.

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো মনে করে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গণতন্ত্রকে রিমান্ডে পাঠিয়েছে। অনেক আগেই মানবাধিকারকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করেছে। আইনের শাসন নির্বাসনে রয়েছে। মৌলিক অধিকার নজরবন্দী। আইন-আদালত মামলার চাপে আড়ষ্ট, নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপে কাবু। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ ও স্বাধীন বিচার বিভাগের দাবি নীরবে-নিভৃতে কাঁদে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আস্থাহীনতার গভীর খাদে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন শুধু আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি করেনি, ইসির সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতাও প্রশ্নবিদ্ধ। একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও সর্বজনীন জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা করার জন্য যে যোগ্যতা ও সামর্থ্য থাকার প্রয়োজন, বর্তমান ইসির সেটা আছে বলে জনগণও মনে করে না।
সংসদের আরো একটি অধিবেশন বসেছে। জাতীয় সংসদ জনগণের মনোযোগহীন ১৪ দলীয় মঞ্চ। যেখানে জবাবদিহিতার প্রশ্ন নেই। বিরোধী দল নেই। আইনের চর্চা নেই। যা আছে তা বিরোধী দলের বিরুদ্ধে খিস্তিখেউড় করার ব্যবস্থা। ভাঙা হাটের এক জ্বলন্ত নমুনা এই প্রশ্নবিদ্ধ সংসদ।
রিমান্ড প্রসঙ্গে কম কথা বলাই সঙ্গত। বেশুমার ও এন্তার জিজ্ঞাসা রয়েছে এই রিমান্ড নিয়ে। রিমান্ড সম্পর্কে উচ্চ আদালতের একটা পর্যবেক্ষণ ও নিদের্শনা রয়েছে। তা মানা বা মানানোর গরজ কারো নেই। নিম্ন আদালতে পুলিশ রিমান্ড চায়, আদালত তা মঞ্জুর করেন। এতে পুলিশের ডিমান্ড পূরণ হয়, কিন্তু দলিত হয় মৌলিক অধিকার। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শারীরিক ও মানসিক শাস্তিটা এখানেই দিয়ে দেয়া হয়। এ কারণেই গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, আইনের শাসনের অভাবের ভেতর প্রতিপক্ষ দমনের কৌশল হিসেবে রিমান্ডের রাজনৈতিক ডিমান্ড বেড়েছে। আদালতে দোষী প্রমাণিত হওয়ার আগে রিমান্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কোমর ভেঙে দেয়া হয়। বিচারের আগে শাস্তি পাইয়ে দেয়ার এই এক অসভ্য ব্যবস্থা। এখানে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের বাবা কাকে বলে তা হাতেনাতে বুঝিয়ে দেয়া হয়। চোখ বেঁধে তার জীবনটাকেই শুধু অন্ধকার করে দেয়া হয় না, নানাভাবে তাকে এমন এক নির্যাতন-নিপীড়নের মুখোমুখি করা হয়- যা আবুগারিবে জঙ্গি, তালেবান, আলকায়েদা, মুজাহিদ নামে যাদের গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্র অত্যাচার চালায়, যে অত্যাচার করার অনুমোদন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও প্রচলিত আইনও অনুমোদন করে না- তার সাথে তুলনীয়। আমেরিকার দেশজ আইনে এ ধরনের নির্যাতন, জুলুম-অত্যাচার সম্ভব নয় বলে ‘মুসলিম তরুণ প্রতিবাদীদের জেহাদি’ সাজিয়ে তাদেরকে কিউবার মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় কারাগার বানিয়ে অত্যাচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই আবুগারিব কারাগারে নানা ধরনের বন্দী নির্যাতনের চিত্র বিশ্ববাসী দেখেছে। বাধ্য হয়ে আমেরিকার সংবেদনশীল প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা আবুগারিব কারাগার বন্ধ করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমাদের দেশকে আমরা আবুগারিব কারাগার বানিয়ে নিয়েছি কি?
স্বাধীন বাংলাদেশ তার মুক্তিযুদ্ধের জন্য অহঙ্কার করে বৈষম্য বিলুপ্তি, আইনের শাসন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও জাতিসত্তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্য রক্ষার অঙ্গীকারের জন্য। পাকিস্তানি শাসকদের বাড়াবাড়ি ও সেনাদের অত্যাচার-জুলুম এ জাতি ঘৃণার সাথে স্মরণ করে। ৯ মাসের বর্বরতা জাতি বারবার স্মরণ করে ধিক্কার জানায়। সেই সাথে স্বাধীনতার মাধ্যমে বৈষম্য ও জুলুমের অবসান হয়েছে বলে ধারণা করতে চায়, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আজ আমরা এমন এক শাসনের নিগড়ে বন্দী, যা আমাদের স্বাধীনতার অঙ্গীকারকেই শুধু ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করছে না, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রহসনের মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির জন্য বিশ্ববাসীর কাছে হেয় করে রেখেছে। ভিন্নমত দমন, রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রচর্চার পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে দেশকে এক অপশাসনের মধ্যে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। দূষিত এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে সরকার ভাবছে মামলার পাহাড়, জেল-জুলুম, রিমান্ড দিয়ে বিরোধী দলকে কাবু করেই উত্তরণ ঘটাতে পারবে। বিভিন্ন স্তরে বিরোধী দলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিদায় দিয়ে চৌকিদার থেকে বঙ্গভবন পর্যন্ত দলীয় লোক বসালেই সামনে চলার পথ একেবারে ফকফকা হয়ে যাবে বলে ধারণা করছে। সব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতাকে দখলের মাধ্যমেই সিদ্ধি লাভ করার জন্য শক্তি প্রয়োগ ও জাল-জালিয়াতি কোনো কিছুই বাদ দিচ্ছে না। এর ভেতর সুবিধাভোগী শ্রেণী হাত-পা ছড়িয়ে বসেছে। তাই দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
বারবার বলছি, এই মাটির নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই মাটি শুধু সোনা ফলায় না, দ্রোহ ও অভ্যুত্থানের চাষবাসও করে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর হামলা ও আগ্রাসনকে একটা সময় পর্যন্ত সহ্য করে। তারপর এমন প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে, যা অপশক্তির শিকড়টাও তুলে ছুড়ে ফেলে দিতে কার্পণ্য করে না।
আদালত ভুলে যাওয়ার কথা নয়, রিট পিটিশন নম্বর ৩৮০৬/১৯৯৮-এর মাধ্যমে ২০০৩ সালে উচ্চ আদালত কিছু পর্যবেক্ষণ ও প্রায় ১৩টি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। উচ্চ আদালতে ২০০৪ সালে সিভিল আপিল নম্বর ৫৩/২০০৪-এর মাধ্যমে সরকার আপিলও করেছিল, যা এখনো পেন্ডিং রয়েছে। কিন্তু আদালত নির্দেশনাগুলো স্থগিত করেননি। যে কেউ ৫৫ ডিএলআর/২০০৩-৩৬৫ দেখে নিতে পারেন। রিমান্ড ও পুলিশি আচরণের একটা গ্রহণযোগ্য গাইডলাইন সেখানে রয়েছে।

খ.
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নিম্ন আদালত সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানতে বাধ্য। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নিম্ন আদালত কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা মানছেন না। সংবিধান অনুযায়ী নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের ক্ষমতা সুপ্রিম কোর্টের থাকলেও রিমান্ডের বিষয়ে উচ্চ আদালতের প্রয়োজনীয় তদারকি নেই। ৫৪ ধারায় গ্রেফতার ও পুলিশের রিমান্ড-সংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনার রায়টি ১০ বছর ধরে আপিল বিভাগে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
এই সুযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় পুলিশ যাদের গ্রেফতার করছে, তাদেরকে নিম্ন আদালতে সোপর্দ করে যুক্তিহীন ও অসংখ্য দিনের জন্য রিমান্ড চাচ্ছে। অর্ধশত দিনের জন্য রিমান্ড চাওয়ার নজিরও সৃষ্টি করা হয়েছে। নিম্ন আদালত রিমান্ডের যৌক্তিকতা কিংবা এতদসংক্রান্ত হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় রিমান্ড মঞ্জুর করছে। মামলার অধিকতর তদন্তের জন্য রিমান্ডের কথা বলা হলেও রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসামিকে পঙ্গু করে দেয়া হচ্ছে। একজন সুস্থ মানুষ রিমান্ডে যাওয়ার পর সে আর সুস্থ হয়ে ফেরত আসছে না।
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারে প্রথম দফা জিজ্ঞাসাবাদে কোনো তথ্য না পাওয়া গেলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিন দিন পুলিশ হেফাজতে আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবে। কিন্তু নিম্ন আদালত জেলখানায় জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি পুলিশের কাছে রিমান্ডে দিচ্ছেন। কোনো মামলায় তিন দিনের বেশি রিমান্ড না দেয়ার ব্যাপারে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও তিন দিনের অনেক বেশি রিমান্ড দেয়া হচ্ছে। সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের বাধ্যবাধকতামূলক কার্যকারিতার নির্দেশনা রয়েছে। এতে স্পষ্ট করে উল্লেখ রয়েছে, ‘আপিল বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন হাইকোর্ট বিভাগের জন্য এবং সুপ্রিম কোর্টের যেকোনো বিভাগ কর্তৃক ঘোষিত আইন অধস্তন সকল আদালতের জন্য অবশ্যই পালনীয় হইবে।’
হাইকোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়েছে,
১. আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করতে পারবে না।
২. কাউকে গ্রেফতার করার সময় পুলিশ তার পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য থাকবে।
৩. গ্রেফতারের কারণ একটি পৃথক নথিতে পুলিশকে লিখতে হবে।
৪. গ্রেফতারকৃতদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলে তার কারণ লিখে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারি সনদ আনবে পুলিশ।
৫. গ্রেফতারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারকৃতকে এর কারণ জানাতে হবে।
৬. বাসা বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো স্থান থেকে গ্রেফতারকৃতের নিকটাত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে টেলিফোন বা বিশেষ বার্তাবাহক মারফত বিষয়টি জানাতে হবে।
৭. গ্রেফতারকৃতকে তার পছন্দসই আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের সাথে পরামর্শ করতে দিতে হবে।
৮. গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদের (রিমান্ড) প্রয়োজন হলে ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে কারাগারের অভ্যন্তরে কাচনির্মিত বিশেষ কক্ষে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কক্ষের বাইরে তার আইনজীবী ও নিকটাত্মীয় থাকতে পারবেন।
৯. কারাগারে জিজ্ঞাসাবাদে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া না গেলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশক্রমে সর্বোচ্চ তিন দিন পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ থাকতে হবে।
১০. জিজ্ঞাসাবাদের আগে ও পরে ওই ব্যক্তির ডাক্তারি পরীক্ষা করতে হবে।
১১. পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে ম্যাজিস্ট্রেট সাথে সাথে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করবেন। বোর্ড যদি বলে, ওই ব্যক্তির ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, তাহলে পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ম্যাজিস্ট্রেট ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন এবং তাকে দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় অভিযুক্ত করা হবে।
১২. পুলিশ হেফাজতে বা কারাগারে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি মারা গেলে সাথে সাথে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটকে জানাতে হবে।
১৩. পুলিশ বা কারা হেফাজতে কেউ মারা গেলে ম্যাজিস্ট্রেট সাথে সাথে তা তদন্তের ব্যবস্থা করবেন। মৃত ব্যক্তির ময়নাতদন্ত করা হবে। ময়নাতদন্ত বা তদন্তে যদি মনে হয় ওই ব্যক্তি কারা বা পুলিশ হেফাজতে মারা গেছে, তাহলে ম্যাজিস্ট্রেট মৃতব্যক্তির আত্মীয়ের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তা তদন্তের নির্দেশ দেবেন।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে এবং নির্দেশনার ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করা হয়। কিন্তু আপিল বিভাগ নির্দেশনাগুলো স্থগিতাদেশের আবেদন নাকচ করে দেয়। সুতরাং হাইকোর্টের এই নির্দেশনা মান্য করা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকার, পুলিশ এমনকি খোদ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ওই নির্দেশনাগুলো মানছেন না।
এ ধরনের আইনি নির্দেশনা, যা উচ্চ আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা, তাও সরকার উপেক্ষা করছে। পুলিশ কোনো কিছুই আমলে নিচ্ছে না। রিমান্ড দেয়া ও রিমান্ডে নেয়ার প্রক্রিয়া, জিজ্ঞাসাবাদের সময় আইনজীবীর উপস্থিতি, জেল গেটে জিজ্ঞাসার তাগিদের কোনো মূল্য এ সরকার দিচ্ছে না; বরং সব নির্দেশনা উপেক্ষাকেই রেওয়াজে পরিণত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আইনের আশ্রয় পাওয়ার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি কোনো মূল্য পাচ্ছে না।
চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, মাদক পাচারকারী, অস্ত্র ও চাঁদাবাজ থেকে শুরু করে প্রথম কাতারের রাজনীতিবিদ, স্বনামধন্য সাংবাদিক সবাইকে এক কাতারে ফেলে রিমান্ড দেয়ার পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। হ্যাঁ, অপরাধী খুনি এবং জঘন্য মামলার আসামিদের কাছ থেকে গোপন ও সত্য তথ্য জানার জন্য নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ বেআইনি নয়। তাই বলে ৮৫ বছর বয়সী এম কে আনোয়ারসহ দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদ, যাদের দেশপ্রেম প্রশ্নাতীত, তাদেরকে ঠুনকো কারণ দেখিয়ে জেলে পাঠানো হবে? মাহমুদুর রহমান ও শওকত মাহমুদের মতো সাংবাদিক যারা শুধু পরিচিত নন, তাদের সামগ্রিক জীবন জনগণের সামনে স্পষ্ট, তাদেরকে দিনের পর দিন রিমান্ডে নেয়া রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ছাড়া আর কিভাবে ব্যাখ্যা করা হবে?
গ. কিছু দিন আগ থেকে শুরু হয়েছে আরেক রাজনৈতিক হয়রানির প্রক্রিয়া। জেল গেটে এই নতুন হয়রানি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার নাম হচ্ছে জামিন নিয়ে বেরোনোর পর জেল গেট থেকে পুনঃগ্রেফতার। একটা-দুটো এমনকি ১০টি মামলায় জামিন নিয়ে জেল থেকে বেরোনোর পর জেল গেটে আরেক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আবার জেলে ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এটা এমন এক জুলুম, যা সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের সাথে শুধু সাংঘর্ষিক নয় অন্যায়ও। সব মামলা একসাথে রুজু হয় না কেন। সব অভিযোগ একসাথে তোলা হয় না- এতে আইন-আদালতের ঝামেলা বাড়ে। মামলার স্তূপ বৃদ্ধি পায়। অন্য দিকে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নতুন হয়রানির মুখে পড়েন। সরকার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এসব ভোঁতা অস্ত্র ব্যবহার করে বগল বাজালেও জনগণ এসব অরাজনৈতিক আচরণ, অন্যায় ও গর্হিত তৎপরতা দেখে যাচ্ছে, বাধ্য হয়ে সহ্যও করছে। কারণ, একচোখা আইন-আদালত এক দিক দেখছে, অন্য দিক দেখছে না। এই না দেখার শেষ কোথায়? জনগণ এ ধরনের অপকর্ম আর দেখতে চায় না।
ঘ. রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে দূষিত করে দিয়ে সরকার যেসব নজির সৃষ্টি করছে, তার খেসারত এক সময় তাদেরকেও দিতে হবে। ইতিহাস যেমন চেপে রাখা যায় না। তেমনি জুলুম-অত্যাচারের খেসারতও মাপ হয় না। আওয়ামী লীগ-জাসদ বিতর্ক কি প্রমাণ করে না, নিজেদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে দাঁড়িয়ে গেছে। আল্লাহ বলছেন, এটা কিয়ামতের আলামত। কিয়ামতের সময় স্বজন-প্রিয়জন সবাই ইয়া নফসি ইয়া নফসি করবে, আর নিজের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সব পাপের সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। আমরা রাজনৈতিক কিয়ামতের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে গেলাম না তো?
জাসদের সাধ্য নেই সত্য আড়াল করার। প্রকৃত ইতিহাস চাপা দেয়ার সাধ্য নেই আওয়ামী লীগেরও। তাই আপনারা উপসর্গ নয়, রোগের প্রতিকার করুন। গণতন্ত্রে ফিরে গেলে এসব উপসর্গ কমবে। নয়তো জাফর ইকবালেরা মর্মদহনে বিবেকের দংশন ও তাড়নায় গলায় দড়ি দিয়ে মরতে চাইবেন। লজ্জায় অবনত হবেন। তাতে চেতনার সওদাগরদের চেতনা ফিরে আসবে না। যতক্ষণ না রিমান্ড থেকে গণতন্ত্র ফেরত আসবে। ছাত্রলীগের উপদ্রব আজ সস্ত্রীক জাফর ইকবালদেরকে দংশন করছে। কই তারা তো ছাত্রলীগের বাজিকরদের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি। গেল ক’বছরে ছাত্রলীগ কী-না করেছে। ধর্ষণের সেঞ্চুরি থেকে শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী পেটানো পর্যন্ত। তারা হেন কাজ বন্ধ রাখেনি। জাফর ইকবাল সাহেবেরা টুঁ-শব্দটি করেননি। এখন আপদ এসে নিজের ঘাড়ে পড়ার পর ভাবছেন গলায় দড়ি দেয়া দরকার। এক সময়ের আওয়ামী লীগের কাণ্ডারি মরহুম আব্দুল মালেক উকিল বলতেন- ছাত্রলীগারদের ঠেঙ্গাড়ে বাহিনী হিসেবে রাজনীতির জন্য ব্যবহার করা যায়, জামাই বানানো যায় না। ছাত্রলীগের বুকের পাটা শক্ত করার জন্য, আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়ার জন্য জাফর ইকবালদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ দুই রকমেরই ভূমিকা রয়েছে। এখনো সময় আছে, ছাত্রলীগের ভেতর ‘শিবির হান্দানোর’ গল্প বন্ধ করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করতে শপথ নিন। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়, ঘটনাটিও বিচ্ছিন্ন নয়। দুঃশাসনের উদর থেকে জন্ম নেয়া সব পাপ উপড়ে ফেলে দিন। তাতেই গ্লানিমুক্ত হওয়ার পথ খুলবে।

Print Friendly, PDF & Email