রেলমন্ত্রীর পৌষ মাস বনাম পটু মিয়ার সর্বনাশ!

0
612

Roni 01
গোলাম মাওলা রনি: বন্ধু মহলে তার ভারি সুনাম। একজন মার্জিত, শিক্ষিত, সৎ ও সফল মানুষ হিসেবে আমরা তাকে যতটা না বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা করি তার চেয়েও বেশি করেন আমাদের স্ত্রীরা। বন্ধুদের স্ত্রীরা যখন শুনেন যে, তাদের স্বামীরা পটু মিয়ার সঙ্গে আছেন তখন আর আপত্তি বা সন্দেহ করেন না। মেয়ে মহলে পটু মিয়ার এই শ্রদ্ধাজাগানিয়া ভাবমূর্তির মূল রহস্য হলো সে মেয়েদের পাত্তা দেয় না, কোনো মেয়ে উপযাচক হয়ে পরিচিত হতে এলেও সে নির্লিপ্ত ভাব দেখায়। বন্ধুরা বহুবার বহু সুন্দরী মেয়ে দিয়ে পটু মিয়াকে পটাতে চেয়েছে কিন্তু পারেনি। ব্যর্থ হয়ে এসব কথা যখন স্ত্রীদের কাছে বলেছে তখন মেয়ে মনের অপার লীলায় বন্ধুস্ত্রীরা পটু মিয়াকে একটি আলাদা সম্মানজনক স্থানে বসিয়েছে।
আমাদের বন্ধু পটু মিয়াকে কেনইবা আমরা এত ভালোবাসি এবং হঠাৎ করে রেলমন্ত্রীর বিয়ে-বাসর সংক্রান্ত পৌষ মাসের দাপটে কীভাবে পটু মিয়ার সর্বনাশ হলো সে ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে রেলমন্ত্রীর বিয়ে নিয়ে নিজের কিছু অভিজ্ঞতার কথা বলে নিই। তিনি তখন জাতীয় সংসদের হুইপ আর আমি সংসদ সদস্য। আমাদের প্রথম পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল একটি অনাহুত ঘটনার মাধ্যমে। আমরা সংসদ চলাকালীন প্রায়ই কথা বলতাম। তিনি নির্দ্বিধায় আমার সিটের কাছে চলে আসতেন এবং দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ রঙ্গ-রসের কথা বলতেন। আমি তাকে বিয়ে করার জন্য উদ্বুদ্ধ করতাম। এটা ছিল ২০১০ সালের গোড়ার দিকের কথা। আমার একপাশে বসত ইকবালুর রহিম আর অন্যপাশে নসরুল হামিদ বিপু এবং তারপরই নজরুল ইসলাম বাবু। আমি পরবর্তীতে এই বিয়ের আলাপে তাদেরও সংযুক্ত করে নিই। আমাদের পাত্র চলে যাওয়ার পর আমরা কি আলাপ করলাম তা শোনার জন্য কয়েকজন মহিলা এমপি একে একে আগ্রহভরে এগিয়ে আসতেন। আমি নানা রকম রসকষ মিশিয়ে মহিলা এমপিদের অনুরোধ করতাম মুজিব ভাইয়ের জন্য একটি পাত্রীর সন্ধান করতে।
এবার নিজের প্রসঙ্গ ছেড়ে পটু মিয়ার প্রসঙ্গে ফিরে যাই। আগেই বলেছি পটু মিয়ার অসাধারণ কতগুলো গুণের জন্য আমরা সবাই তাকে ভালোবাসি। বন্ধুদের আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে তোলার ক্ষেত্রে পটু মিয়ার জুড়ি নেই। সে অনায়াসে যে কাউকে যে কোনো কথা বলতে পারে। বন্ধুরা তার সব কথাই মেনে নেয়। তার বুদ্ধিমত্তা, উপস্থাপনা এবং আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের দ্বারা সে অনেককে এমনভাবে প্রভাবিত করে ফেলে যে, তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা দুষ্কর। একটি উদাহরণ দিলেই পাঠক বিষয়টি সহজে বুঝতে পারবেন। পটু মিয়া নিয়মিত শরীরচর্চা করেন রাজধানীর অভিজাত একটি পাঁচতারা মানের হেলথ ক্লাবে। তাদের ক্লাবটি ১৮ তলাবিশিষ্ট ভবনের উপরে। ক্লাবের বেশির ভাগ সদস্যই বয়সে পটু মিয়ার চেয়ে বড়। তাছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিতেও অনেকের অবস্থান অনেক উঁচু তলায়। তারপরও তারা সবাই পটু মিয়াকে বন্ধুর মতো সমাদর করেন এবং তার সব কথা নির্দ্বিধায় মেনে নেন।
পটু মিয়াদের ক্লাবে শরীরচর্চার আধুনিক সব উপকরণই রয়েছে। রয়েছে স্টিম, সোওনা, জ্যাকুজি ও সাঁতার কাটার জন্য অত্যাধুনিক সুইমিং পুল। পটু মিয়া ক্লাবের মোটাসোটা কয়েকজন সদস্যকে বুদ্ধি দিলেন টেডমিলে চড়ে দৌড়ঝাঁপ না করার জন্য। তারা বললেন অসুবিধা কি? পটু মিয়া ব্যাখ্যা করলেন এবং সদস্যরা সেদিন থেকে টেডমিলে চড়া বন্ধ করে দিলেন। পটু মিয়া বললেন, আপনারা স্টিম ও সোওনা করতে পারেন। এরপর বেশ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে শরীর ঠাণ্ডা হলে সুইমিং করতে নামবেন। এতে করে ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে। সবাই একবাক্যে পটু মিয়ার উপদেশ মেনে নিলেন। এখন সমস্যা দেখা দিল দুটি- প্রথমত কারও পছন্দ সোওনা আবার কারও পছন্দ স্টিম। কোনটা কার জন্য ভালো তা কেউ বলতে পারছেন না। দ্বিতীয়ত শরীর পরিপূর্ণ স্বাভাবিক না হলে সুইমিংয়ে নামা যাবে না কিন্তু শরীর স্বাভাবিক হলো কিনা তা বোঝা যাবে কেমনে?
পটু মিয়া অতীব মনোযোগ সহকারে সমস্যাগুলো শুনলেন। প্রথম সমস্যার সমাধান দিলেন এই বলে যে, যাদের ত্বক তৈলাক্ত তারা সোওনা নিবেন এবং যারা খসখসে রুক্ষ ত্বকের অধিকারী তাদের জন্য স্টিম নেওয়াটা উত্তম। তারপর দ্বিতীয় সমস্যাটির ব্যাপারে তার অভিনব তত্ত্ব উপস্থাপন শুরু করলেন। হ্যাঁ, শরীর স্বাভাবিক হলো কিনা তা বোঝার উত্তম উপায় হলো বগল, কুঁচকি এবং পুটুতে হাত রেখে তাপমাত্রা অনুভব করা। যদি ওইসব স্থানে তখনো অধিক তাপমাত্রা থাকে তাহলে বুঝতে হবে শরীর ঠাণ্ডা হয়নি। পটু মিয়া যখন এসব কথা বলছিলেন তখন সবাই সুইমিং পুলের পানিতে গলা পর্যন্ত শরীর ডুবিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পটু মিয়ার কথা শুনে একজন বলে উঠলেন, ভাই পুটুটা কি? উত্তরে পটু মিয়া বললেন, সারা জীবন মানুষের পুটুতে তেল মেখে ও তোয়াজ করে নিজেরটা স্ফীত করতে করতে ১৮ তলার উপরে সুইমিং করতে চলে এলেন আর এখন কিনা সেই স্থানটিই শনাক্ত করতে পারলেন না! সবাই একসঙ্গে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলেন এবং বগল, কুঁচকি এবং পুটুতে হাত রেখে নিজেদের তাপমাত্রা অনুধাবনের চেষ্টা করলেন। ভিন্নতর পরিবেশে অদ্ভুতসব কথা বলে কিংবা কাজ করেও পটু মিয়া সব সময় বহাল তবিয়তে ছিলেন। কিন্তু রেলমন্ত্রীর বিয়ের পর পটু মিয়ার জীবনের প্রথম অনাহুত আঘাতটি এলো একুশ বছর বয়সী এক অচেনা রমণীর কাছ থেকে। ব্যক্তিগত জীবনে পটু মিয়া একজন সফল ব্যবসায়ী। হাজার হাজার লোক তার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে বহুদিন ধরে। অনেক মহিলাও চাকরি করেন। কারও বয়স হয়তো ২০ বছর থেকে ৩০ বছর। আবার কারও কারও হয়তো ৫০ বছরের ওপরে। অনেকে রয়েছেন খুবই সুন্দরী, আবার কেউ কেউ হয়তো অতটা দর্শনীয় নয়। কেউ কেউ বিবাহিতা, আবার কেউবা কুমারী কিংবা ডিভোর্সি। পটু মিয়া কোনো দিন কোনো মেয়ে কর্মচারী বা কর্মকর্তাকে আলাদাভাবে তার রুমে ডাকেননি কিংবা চলতি পথে দু দণ্ড দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে দুই-এক মিনিট খোশগল্প করেননি। পটু মিয়ার এই ব্যবহারে অফিসের সুন্দরী মেয়েরা ভারি বিরক্ত। তারা সব সময় চায় যে, তাদের বস যেন তাদের একটু পাত্তা-টাত্তা দেয়। কিন্তু বস বোধ হয় ইচ্ছা করেই সুন্দরীদের সেই শুভ কামনা প্রত্যাখ্যান করে এক ধরনের পৌরুষ দেখানোর চেষ্টা করে। অফিসের মেয়েরা তাই অনেকটা জিদের বসে বিভিন্ন ফন্দি-ফিকির করে পটু মিয়ার মনের গভীরতা ও চিত্তের দুর্বলতা খোঁজার চেষ্টা করে। মেয়েদের সহেলীদের দ্বারা মাঝে মধ্যে ফোন করিয়ে তারা বসকে বিব্রত করে এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করে। পটু মিয়া প্রথম প্রথম খুব অশ্বস্তি বোধ করলেও পরে সব কিছু সামলে নেন। এভাবেই চলছিল সব কিছু। একটি মেয়ে মিহি কণ্ঠে অনেক দিন থেকে ফোন করে পটু মিয়ার সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করে আসছিল। পটু মিয়া মোবাইলের অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারতেন দুষ্ট মেয়েটির উপস্থিতি। কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু বলতেন, ভীষণ ব্যস্ত আছি, পরে ফোন করুন। মেয়েটি কথা না বাড়িয়ে ভদ্রভাবে ফোন রেখে দিত। রেলমন্ত্রীর বিয়ের পরের দিন হঠাৎ করেই মেয়েটা ফোন দিল। তার গলায় অসম্ভব দৃঢ়তা, আত্দবিশ্বাস এবং ভিন্নমাত্রিক কৌতুক খেলা করছিল। সে প্রথমেই পটু মিয়াকে অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন করে, পটু কেমন আছ ডার্লিং! পটু মিয়ার মাথায় যেন ঠাটা পড়ল! রাগে-অভিমানে তার ঘাড় এবং তলপেটে বিশেষত নাভির গোড়ায় শির শির করতে লাগল। সে অনেকটা ধরা গলায় মিউ মিউ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করল, কে বলছেন প্লিজ! মেয়েটি বোধ হয় বহুদিন থেকে এমন একটি মুহূর্তের অপেক্ষা করছিল। সে তার মেয়েলি কণ্ঠে কুয়া কুয়া ঢং যোগ করে বলল, হাই হানি! আমাকে চিনতে পারলা না! এটা কোনো কথা হলো জান! এক বছর ধরে তোমাকে ফোন করছি। কোনো দিন নামটা পর্যন্ত জানতে চাওনি, আজ চেয়েছ! আমার যে কি ভালো লাগছে তা বোঝাতে পারব না, মনে হচ্ছে খুশিতে মরে যাই! আমার নাম সিলভিয়া!
পটু মিয়ার শরীর দিয়ে দর দর করে ঘাম বের হচ্ছিল। রাগে হাত-পা কাঁপছিল এবং গলাও শুকিয়ে গিয়েছিল। তারপরও মাথা ঠাণ্ডা রেখে পটু মিয়া যথাসম্ভব শান্ত কণ্ঠে বললেন, সিলভিয়া! এভাবে হয় না! আপনাকে দেখিনি, আপনিও আমাকে দেখেননি। অথচ টেলিফোনে হানি-জান ইত্যাদি বলে সম্বোধন করছেন! এটা কি ঠিক! আচ্ছা আপনার বয়স কত? সিলভিয়া বলল ২১ বছর। পটু মিয়া প্রচণ্ড আঘাত পেলেন মনে। বললেন, আমার বড় ছেলের বয়সও তো ২১ বছর। পটু মিয়ার কথায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল সিলভিয়া। বলল, সো হায়াট! তাতে কি? রেলমন্ত্রী যদি তার চেয়ে ৪০ বছরের ছোট একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে পারেন তবে তুমি-আমি পারব না কেন? তোমার-আমার বয়সের পার্থক্য তো ২৫-২৬ বছরের বেশি হবে না!
পটু মিয়া ফোন রেখে দিলেন এবং ভয়ে ফোনের সুইচ পর্যন্ত অফ করে দিলেন। তার পেটের মধ্যে গুড়গুড়ানি শুরু হলো। মাথাটাও চক্কর দিতে আরম্ভ করল। তাড়াতাড়ি ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে সোজা চলে এলেন আমার অফিসে। বিরস বদনে সব কথা খুলে বললেন। আমার খুব হাসি পাচ্ছিল এবং পটু মিয়ার জন্য হিংসা হচ্ছিল। কিন্তু বন্ধুটির সিরিয়াসনেসের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা থাকার কারণে আমি নিজেকে সামলে নিলাম। চোখে-মুখে সিরিয়াস ভাব ফুটিয়ে তুলে জিজ্ঞাসা করলাম, তা বন্ধু! এত মানুষ রেখে তুমি কেন আমার অফিসে এলে? পটু মিয়া বললেন, তুমি মোগল হেরেমের দুনিয়া কাঁপানো প্রেম লিখছ প্রায় দুই বছর ধরে। আমি অনেকগুলো পর্ব পড়েছি। আমার মনে হয়েছে, তুমি মানব-মানবীর প্রেম, দৈহিক এবং মনোজাগতিক সম্পর্ক নিয়ে বেশ চিন্তাভাবনা কর। তাই তোমার কাছে জানতে এসেছি, আমাদের সমাজের হলোটা কি? একটি অসম প্রেম এবং অসম বিয়ে কেন এতটা জনপ্রিয়তা পেল? আমাকে একটু তাত্তি্বক ব্যাখ্যা দিলে খুব খুশি হব।
পটু মিয়ার কথায় আমি বেশ আনন্দ অনুভব করলাম। সে আমার লেখা বিশেষ করে মোগল হেরেম পড়ে একথা জানার পর বেশ উৎসাহ বোধ করলাম তাকে কিছু বলার জন্য। আমি বললাম, মানুষের যৌনতা জীবনের সবচেয়ে গোপনতর বিষয়। এটা যখন প্রকাশ্যে চলে আসে তখন মানুষ আর ইতর প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য থাকে না।
অন্যদিকে, পরকীয়া কিংবা অসম প্রেমের প্রতি নারী-পুরুষ উভয়েরই থাকে এক দুর্নিবার আকর্ষণ। সমাজ, সংসার, রাষ্ট্র সব সময় মানুষের এই নিষিদ্ধ দুর্বার প্রণয়াকাঙ্ক্ষাকে ঘৃণা করে থাকে। সবাই সমস্বরে এ কাজকে নিরুৎসাহিত করে। কখনো সখনো সীমা অতিক্রম করলে শাস্তির ব্যবস্থা করে। সমাজ, সংসার এবং রাষ্ট্রের চিরায়ত এই প্রথার ব্যত্যয় ঘটিয়ে কেউ যখন তার কর্মের জন্য ব্যাপক আলোচিত, প্রশংসিত কিংবা অভিনন্দিত হন তখন ধরে নিতে হবে মাথায় পচন ধরেছে।
লেখক: রাজনীতিক।

Print Friendly, PDF & Email