প্রত্যাবাসনের আগে স্থায়ী সমাধান চায় জাতিসংঘ

0
32

ঢাকা: রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন শুধু স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও সম্মানজনকই নয়, বরং টেকসই হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সরকারের অবস্থানও এ ক্ষেত্রে অভিন্ন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রোহিঙ্গাসংকটের স্থায়ী সমাধান দেখতে চায় বাংলাদেশ। আর এ লক্ষ্যেই সংকট সৃষ্টির মূল কারণগুলো সমাধানের ওপর বাংলাদেশসহ পশ্চিমা দেশগুলো জোর দিচ্ছে।

মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ১৯৭৮ সালে এবং ১৯৯২ সালে বড় পরিসরে ফেরত পাঠানো হলেও সেগুলো কার্যত টেকসই হয়নি। কারণ কয়েক বছরের মধ্যেই আবার রোহিঙ্গাদের এ দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরে এমন অনেক রোহিঙ্গা আছে, যারা দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

রোহিঙ্গাসংকট সমাধানে জাতিসংঘ ব্যর্থ কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি স্টিভেন করলিস বলেছেন, ‘আমার মনে হয় আমরা সবাই ব্যর্থ হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘সত্তরের দশকে প্রত্যাবাসন হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে লোকজন আবার ফিরে এসেছে। প্রত্যাবাসন উদ্যোগ কাজে আসেনি। বিভিন্ন সময়ে লোকজন ফিরে এসেছে।’

স্টিভেন করলিস আরো বলেন, ‘আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারে পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া জরুরি। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে এবারের যাওয়াটাই তাদের শেষ যাওয়া।’ আগের প্রত্যাবাসনগুলো ‘প্রিম্যাচিউর’ (যথাসময়ের আগেই) হয়েছে কি না জানতে চাইলে সরাসরি জবাব না দিয়ে ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি বলেন, ‘আমি সে সময় ছিলাম না।’ তবে তিনি বলেন, ‘অপ্রয়োজনীয় প্রত্যাবাসনগুলো সফল হয়নি। এর ফলে লোকজন আবার ফিরতে বাধ্য হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের ওপর যে জোর দিচ্ছেন তাকে আমরা স্বাগত জানাই।’

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরী গতকাল শনিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, অতীতে প্রত্যাবাসনগুলো মোটেও ‘প্রিম্যাচিউর’ ছিল না। সঠিকভাবেই তাদের প্রত্যাবাসন করা হয়েছিল দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার মাধ্যমে। তিনি বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের বিকল্প কী ছিল? তাদের না পাঠানো! সেটা তো হতে পারে না। কারণ ফেরত পাঠানোই মূল লক্ষ্য।’

শমসের মবিন চৌধুরী আরো বলেন, ১৯৭৮ সালে যারা এসেছিল তাদের সবাই ফেরত গেছে। ১৯৯২ সালে যারা এসেছে তাদেরও বেশির ভাগ ফিরে গিয়েছিল। মিয়ানমার সরকার বা মিয়ানমারের সমাজ কোনোভাবেই রোহিঙ্গাদের গ্রহণ করতে রাজি নয়—এটি এবার পরিষ্কার হয়ে গেছে। আগে তারা ছিল সামরিক সরকারের অধীনে। এখন বেসামরিক সরকারের একটি মুখোশ, যার পেছনে আছে সামরিক শক্তি। তাদের মূল লক্ষ্য আরাকানকে (রাখাইন রাজ্যকে) রোহিঙ্গামুক্ত করা। সেই পরিকল্পনায়ই তারা রয়েছে এবং সেটিই তারা এবার সফল করতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘আমি এই মুহূর্তে প্রত্যাবাসন শুরু হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারছি না। যতই আন্তর্জাতিক চাপ থাকুক, কথা হোক বা আইনি বিষয় হোক, আমার মনে হয় না, মিয়ানমার সরকার এদের গ্রহণ করতে প্রস্তুত।’

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসংকটের মূল কারণগুলো সমাধানের ওপর বাংলাদেশের আরো আগেই জোর দেওয়া উচিত ছিল কি না জানতে চাইলে শমসের মবিন চৌধুরী বলেন, “১৯৮২ সালে তারা নাগরিক আইন পরিবর্তন করেছে। তার পরই তাদের ‘স্টেটলেস’ (রাষ্ট্রহীন) অবস্থায় পরিণত করেছে। তখনই বোঝা গিয়েছিল তারা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে। আন্তর্জাতিক দৃষ্টি থাকলেও তারা এটি করত। এখন কথিত গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে তারা এটি করছে।”

গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফরকালে ইউএনএইচসিআরের ডেপুটি হাইকমিশনার কেলি ক্লেমেন্টসও বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কবে নাগাদ শুরু হবে এটি বলা ‘অত্যন্ত কঠিন’। তিনি বলেন, এটি পুরোপুরি রোহিঙ্গাদের ওপর নির্ভর করছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য এই সংকট সৃষ্টির মূল কারণগুলো সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ইউএনএইচসিআরের ডেপুটি হাইকমিশনার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আরো ভালো যোগাযোগের জন্য এই দুই দেশের সঙ্গে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সমন্বয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

এদিকে নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিজ, সংক্ষেপে আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলার শুনানি শুরু হচ্ছে আগামী সপ্তাহে। জেনোসাইড প্রতিরোধ বিষয়ক সনদ লঙ্ঘন এবং রোহিঙ্গা জেনোসাইডের অভিযোগে ৫৭টি মুসলিম দেশের জোট ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পক্ষে গাম্বিয়া গত মাসে এ মামলা করে। মামলা চলাকালে হেগে রোহিঙ্গাদের পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন সংগঠন ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) কৌঁসুলির দপ্তরের প্রতিনিধিদলের এ মাসেই বাংলাদেশ সফর করার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য আইসিসির কৌঁসুলির দপ্তর ঢাকা ও কক্সবাজারে অফিস খুলবে।

Print Friendly, PDF & Email