ষড়যন্ত্র রাজনীতিরই একটি কৌশল

0
117

মেজর (অব.) মো. আখতারুজ্জামান: বিষয়টি জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যজনক এবং অশনি সংকেত। বিরোধী জোটনেত্রী সম্প্রতি নেত্রীর ছেলে ও ছেলের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে গেছেন। বিরোধী জোটনেত্রীর এই লন্ডন সফর একান্তই ব্যক্তিগত। অথচ এই সফর নিয়ে বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যম অনেক ধরনের সত্য বা মিথ্যা, বাস্তবসম্মত বা কাল্পনিক বিভিন্ন খবর তৈরি করে যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় তুলছে এবং বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস ছড়াচ্ছে। সেই ভাইরাস নিয়ে দেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা মুখরোচক শিরোনাম দিয়ে খবর প্রচার করছে। তাই দেশের ও জনগণের স্বার্থে এই মুখরোচক খবরগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা মনে হয় সময়ের দাবি হয়ে গেছে।

বিএনপি কোনো গোপন সংগঠন নয়। বিএনপি দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল। বিএনপি মধ্যপন্থি এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বিএনপির গঠনতন্ত্রে পরিষ্কারভাবে লেখা আছে। তা ছাড়া বিএনপি দেশের আইন অনুযায়ী একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। বিএনপিকে অন্য সব রাজনৈতিক দলের মতো নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের কর্মকাণ্ডেরও আর্থিক হিসাব-নিকাশের তথ্য রিপোর্ট আকারে নিয়মিতভাবে দাখিল করতে হয়। বিএনপির সুনির্দিষ্ট বৈদেশিক নীতি আছে। বিএনপি সব দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, বন্ধুত্ব— এই বৈদেশিক নীতিতে বিশ্বাস করে। বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে বিএনপির পরিষ্কার রাজনৈতিক স্লোগান আছে, যা হলো বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, প্রভু নেই। যেহেতু বিএনপি সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বে বিশ্বাস করে সেখানে দেশের বাইরে গেলে অনেক দেশের বড় বড় ব্যক্তি দেখা করতেই পারেন বা তাদের সঙ্গে দেখা হতেই পারে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষরাও বিদেশে গেলে অনেক দেশের মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ ও খানাপিনা হয়। বিদেশে অনেক সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের দেখা-সাক্ষাৎ হয় বা নিজেরাও অনেক সময় বিভিন্নভাবে তদবির করে দেখা করার চেষ্টা করে বা কখনো দেখা হয়। জাতিসংঘের কোনো সভায় বা সেখানে ঘুরতে গেলে পৃথিবীর অনেক দেশের রাজনৈতিক বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে হরহামেশা দেখা হয়। এমনকি ইসরায়েলের ব্যক্তিত্বের সঙ্গেও দেখা-সাক্ষাৎ হয়ে যায় বা কুশল বিনিময় হয় বা অনেক সময় জাতিসংঘের ক্যাফেটেরিয়াতে চা পানের সময় বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। সেই আলোচনায় দেশ, জাতি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাগুলো উঠে আসে। তা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক এবং ব্যবসায়িক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বা সাধারণ ব্যবসায়ী, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক বা এনজিও ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মেলা বা প্রদর্শনীতে অহরহ যাচ্ছেন। সরকারি দল ও জোটের নেতা, সংসদ সদস্য এবং সরকারের মন্ত্রী-আমলারাও ঘন ঘন বিদেশ সফর করেন। সরকারের বড় বড় আমলা প্রশিক্ষণের জন্যও নিয়মিত বিদেশে যান। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং বিদেশে জাতিসংঘের মিশনে নিয়মিত যাচ্ছেন যেখানে পাকিস্তান, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের সামরিক ও সেসব দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও যান। একমাত্র ইসরায়েল ছাড়া পাকিস্তানসহ প্রায় সব দেশেই বাংলাদেশের ছোট-বড় দূতাবাস রয়েছে। আমি নিশ্চিত পাকিস্তানের গোয়েন্দাসহ বিভিন্ন বিতর্কিত ব্যক্তিদের সঙ্গে দূতাবাসের ব্যক্তিদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়, যা খুবই স্বাভাবিক এবং রুটিন ম্যাটার।

জনগণ মনে করে বিদেশে কারও সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ, ব্যবসায়িক স্বার্থে সাক্ষাৎ বা পরস্পর স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বা নিছক পরিচয়ের জন্য দেখা হতেই পারে। এতে দেশের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব রাখতে পারে না বা রাখে না। অতীতে অনেক বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিদেশে বহু দিন কাটিয়েছেন কিন্তু মনে হয় না বিদেশে থেকে দেশের ভিতরে কোনো প্রভাব বা রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আমাদের একজন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব বেশির ভাগই বিদেশে থাকেন এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঝড় তুলতে চান। ওনার সেই ঝড় তোলার প্রচেষ্টার সঙ্গে পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের খোদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরাসরি সহযোগিতা করেও দেশের ভিতরে ঝড় তো দূরের কথা পুকুরের পানিতেও ঢেউ তুলতে এখনো পারেননি। যদিও ঝড় তুলতে ওনার চেষ্টা বিরতিহীনভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই জনগণ বিশ্বাস করে বিদেশে থেকে দেশে কিছু করা যায় না বা যাবে না। যা কিছু করতে হয় তা দেশে থেকেই করতে হবে তাতে যতই জেল-জুলুম মোকাবিলা করতে হোক না কেন। তা ছাড়া দেশে এমন কোনো বৈরী রাজনৈতিক অবস্থা সৃষ্টি হয়নি যে, কাউকে দেশ থেকে পালিয়ে থাকতে হবে। বিএনপি কোনো অবস্থায়ই রোমান্টিক রাজনৈতিক দল নয়। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে এবং বিএনপির অতীত ও বর্তমান সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে যদিও সরকার তা মানতে রাজি নয়। তা ছাড়া বিএনপি নেত্রী দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী। তার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বিরোধী জোটের নেত্রীকে সরকার বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা দিয়ে হয়রানি করতে পারবে; যা এখন সরকার করছে। কিন্তু চরম বাস্তবতা হলো, বিরোধী জোটের নেত্রীকে জেল দেওয়ার ক্ষমতা বর্তমান সরকারের নেই। তবে এই সরকার যদি আবার ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে বিরোধী জোটনেত্রী এবং বিএনপির জন্য সমূহবিপদের আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি তখন বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নিয়ে টান দেবে। তবে এ মুহূর্তে বিএনপির সামনে কোনো ঝুঁকি নেই। কারণ সরকার জানে বিরোধী জোটনেত্রীর বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলাগুলোকে জনগণ বিশ্বাস করে না। তাই সরকার যদি বিরোধী জোটের নেত্রীকে জেল দিতে যায়, তাহলে বিরোধী জোটনেত্রীর জনপ্রিয়তা তুঙ্গে চলে যাবে, যা সরকারের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। তা ছাড়া বিরোধী জোটের নেত্রীর জেল হলে দেশে-বিদেশে প্রচণ্ড ঝড় উঠবে এবং সরকারের তখ্ত কেঁপে উঠতে পারে। বর্তমান সরকার প্রধান এত বোকা নন যে, তিনি নিজেই খাল কেটে কুমির এনে নিজের বিপদে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেবেন। কাজেই বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বিরোধী দলের নেত্রীকে সরকার এই টার্মে বেশি ঘাঁটাবে না এবং জেল দেওয়ার ঝুঁকিও নেবে না।

দেশের রাজনীতিবিদদের বেশির ভাগই সুবিধাবাদী। যার পূর্ণ সুযোগ সরকার অবশ্যই নেবে। বিএনপির সামনে এখন তিনটি পথ খোলা আছে। হয় নির্বাচনে যেতে হবে, আর না হলে জীবনবাজি রেখে সর্বাত্মক আন্দোলনে নামতে হবে এবং সেই আন্দোলনকে যে কোনো মূল্যে সফল করতে হবে। তৃতীয় পথটি খোলা যা বিএনপির জন্য সম্মানজনক হবে না। তা হলো— দেশ ও জাতির প্রয়োজনে সরকারের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। বিএনপি যদি সঠিক সিদ্ধান্ত সঠিক সময়ে নিতে পারে তাহলে বিএনপির হারানোর কিছু থাকবে না। পিছিয়ে আসা যুদ্ধের একটি কৌশল। যখন পরাজয় অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে তখন চূড়ান্ত পরাজয়ের এবং অস্তিত্ব বিলোপ হওয়ার আগেই রণেভঙ্গ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অতিশয় বুদ্ধিমানের কাজ। সন্ধি যুদ্ধেরই একটি অংশ এবং কৌশল। যুদ্ধে কৌশলী হতে না পারলে পরাজয়ের আশঙ্কাই বেশি সৃষ্টি হয়।

বিএনপি এখন সঠিক রাজনৈতিক চাল চালতে পারলে জয়ের সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। বিএনপির এখন সরকারের ফাঁদে পা দেওয়া কোনো অবস্থাতেই সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হবে না। সরকারের এখন মূল এজেন্ডা হলো কীভাবে বিএনপিকে আগামী নির্বাচনের বাইরে রাখা যায়। তাই সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে বিএনপিকে জনগণের সামনে হেয় এবং সন্ত্রাসী দল হিসেবে চিহ্নিত করে বিরোধী জোটনেত্রীর জনপ্রিয়তায় ধস নামাতে চায়। বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে এখন অ্যাডভেঞ্চারিজমের কোনো সুযোগ নেই। জাতিসংঘ আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয়। তা ছাড়া রাজনৈতিক বিভেদ আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ রয়েছে। কাজেই বিশ্ব জনমতের এই সুযোগ নিয়ে সরকার বিএনপিকে ফাঁদে আটকাতে চায় যা খুবই দৃশ্যমান।

রাজনীতিতে বর্তমানে একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বিএনপি সে সুযোগ নিতে পারলে বিএনপির সুদিন আসবে বলে জনগণ মনে করে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকারের সামনে একটি মাত্র পথ খোলা আছে, যা হলো আগামী নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা এবং সেই নির্বাচনে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ থাকা। সরকার প্রধান নিজের ইচ্ছাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছেন। আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে তার মূল্য সরকার প্রধানকেই দিতে হবে। সরকার ভালো করেই জানে তার বর্তমান অবস্থা কোথায় এবং তার সামনে কী ঝুঁকি কাজ করছে। ‘এই দিন দিন নয় আরও দিন আছে, এই দিনেরে নিয়ে যাবে সেই দিনেরই কাছে’ প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের উক্তির অর্থ সরকার ভালো করেই জানে বলে মনে হয়। নির্বাচনে জয়-পরাজয় আছে। কে হারবে, কে জিতবে তা নির্ধারণ করে দেবে জনগণ। জনগণের সেই সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য সরকার সাংবিধানিক শপথ নিয়েছে। সেই শপথ সরকার ভঙ্গ করলে তার মূল্য সরকারকেই দিতে হতে পারে। কাজেই জনগণের বিশ্বাস আগামী নির্বাচন অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হবে; না হলে তা কেউ মানবে না। আমলারা শপথ নেয় না। কাজেই আমলাদের কথা শুনে বা আমলাদের কায়েমি স্বার্থে তাদের সুপারিশ শুনে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সঠিক হবে না বলে জনগণ বিশ্বাস করে। তাই সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা সরকার আমলাদের কথামতো না চলে আমলাদের সঠিক নির্দেশ দেওয়াই হবে সরকারের ভালো পদক্ষেপ, যা জনগণের কাম্য।

পরিশেষে বলতে চাই, ষড়যন্ত্র রাজনীতিরই কৌশল। রাজনীতিতে কৌশল করে জনগণের বিজয় প্রতিষ্ঠিত করা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্যতম লক্ষ্য এবং সে জন্য রাজনীতিতে কৌশল অবলম্বন করা সব রাজনৈতিক দলের অধিকার। সরকার যেমন রাজনীতিকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে তেমনি বিরোধী জোটনেত্রীর কৌশল অবলম্বন করার অধিকার রয়েছে। চরিত্র হননের রাজনীতি রাজনীতির সবচেয়ে ঘৃণ্যতম কৌশল, যা থেকে সবার বিরত থাকা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য অত্যাবশ্যক—তা যেন কোনো রাজনীতিবিদ ভুলে না যান, তা জনগণ প্রত্যাশা করে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সব রাজনীতিবিদ জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। রাজনীতিতে সুবাতাস বহক এটাই জনগণের চরম কাম্য। ‘আগে গণতন্ত্র পরে উন্নয়ন’ জনগণ এই স্লোগানে বিশ্বাস করে। সবাইকে ধন্যবাদ।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য।

Print Friendly, PDF & Email