সঙ্কট উত্তরণে জাতীয় ঐক্যমতের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব

0
280

Dr. Emaz Uddin 02
স্টাফ রিপোর্টার: দেশের চলমান জাতীয় সংকট থেকে উত্তরণে সব রাজনৈতিক দল ও সামাজিক শক্তিগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজ উদ্দিন আহমদ। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে বুধবার এক আলোচনা সভায় তিনি দেশের বিবেকবান ও চিন্তাশীল সুশীল সমাজের পক্ষে এ প্রস্তাব দেন। এমাজ উদ্দিন আহমেদ সভায় চলমান সঙ্কট সমাধানে এ প্রস্তাব পেশ করে বলেন, একটি বিশ্বাসযোগ্য স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই জাতিকে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণের সহায়তা করতে পারে।
লিখিত প্রস্তাবে তিনি বলেন, যেহেতু সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কারণে বর্তমান কাঠামোই সুষ্ঠূ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে সংকট নিরসনের ক্ষেত্র অকার্যকর হয়ে পড়েছে, ক্ষমতার উৎস হিসেবে জনগণের ইচ্ছা এই সংশোধনের প্রতিফলিত হয়নি, জনগণের ব্যক্তি স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক অস্থিশীলতা গ্রাস করেছে। তাই অর্থনৈতিক অগ্রগতিও স্তব্ধ হয়ে চলেছে। সেজন্য সময় এসেছে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের প্রধান কাজ হবে প্রজাতন্ত্রের সব কর্মকান্ড যথাযথভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে সবার অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান। ঐক্যমতের সরকারের প্রধান কর্তব্য হবে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং বিচারবিভাগসহ সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের অর্থবহ সংস্কারের মাধ্যমে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি করা।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন সভাপতিত্বে আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সভায় জাতীয় ঐক্যমতের সরকার প্রস্তাবে নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধিও সমর্থন জানিয়েছেন।
আলোচনায় অংশ নেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ, কবি ও গবেষক ফরহাদ মজহার, সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. কর্ণেল (অব.) কাজী সেলিম উদ্দিন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি, কবি ও সাংবাদিক আব্দুল হাই শিকদার, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রো-ভিসি অধ্যাপক ডা.আবদুল মান্নান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সুকমল বড়–য়া, এডভোকেট তাজুল ইসলাম প্রমুখ। সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের আহবায়ক রুহুল আমিন গাজীর অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
এমাজ উদ্দিন আহমেদের সাথে দেশের বিবেকবান ও সুশীল সমাজের পক্ষে যে সব বিশিষ্ট নাগরিক এ প্রস্তাব পেশ করেছেন তারা হলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন, অধ্যাপক এম এ মাজেদ, বিচারপতি আবদুর রউফ, মোহাম্মদ আসাফুদ্দৌলা, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়–য়া, সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, রুহুল আমিন গাজী, আব্দুল হাই শিকদার, অ্যাডবোকেট তাজুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট এস এন গোস্বামী ও লে. কর্ণেল (অব.) কাজী সেলিম উদ্দিন।
লিখিত প্রস্তাবের শুরুতে এমাজ উদ্দিন আহমদ বলেন, একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছাড়া এমন ঘোর সংকট জাতির জীবনে কখনো আসেনি। জনগণের অংশগ্রহণ এবং সমর্থনবিহীন একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের মাধ্যমে অকার্যকর ও ধ্বংস করে ফেলেছে। সংবিধানকে ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছায় নির্বিচারে কাটাছেঁড়ার মাধ্যমে একটি অর্থহীন সংবিধানে পরিণত করা হয়েছে। যা আজ জাতির সংকটকালে দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ ও অক্ষম। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে অব্যাহত আন্দোলন করে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার তাদের দাবি বিবেচনার পরিবর্তে দমন পীড়ন ও নিঃশেষ করার নীতি গ্রহণ করেছে। সরকার ও বিরোধী শক্তির এই প্রাণঘাতী লড়াইয়ে জনগণ এক নিরাপত্তাহীন, সংকাকুল এবং অনিশ্চিত সময়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এই অনিশ্চিত অচলাবস্থার সমাধান হওয়া জরুরি।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ছাড়া অন্য কোনো তন্ত্রের সুযোগ আছে বলে মনে করি না। প্রশাসনে যেভাবে দলীয়করণ করা হয়েছে তাতে পরিবর্তন না আনা গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এজন্য ব্যক্তি নয়, নির্বাচন প্রক্রিয়াকে নিরপেক্ষ করতে হবে। জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার যে প্রস্তাব এসেছে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া উচিত।
কবি ও গবেষক ফরহাদ মজহার বলেন, আমাদেরকে সঙ্কটের গোড়ায় যেতে হবে। শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সঙ্কটের কোনো সমাধান হবে না। মুক্তিযুদ্ধের পর সংবিধান প্রণয়নের সময় জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। এখনো ফ্যাসিস্ট সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে। তিনি বলেন, আরাফাত রহমান কোকোর জানাজায় অসংখ্য মানুষ উপস্থিত হয়েছেন। যদিও জানাজা রাজনৈতিক কিছু নয়। কিন্তু নিগৃহিত মানুষ নিঃশব্দ প্রতিবাদের উপকরণ হিসেবে এটিকে ব্যবহার করেছে। বিএনপির নেতৃত্বের ব্যর্থতার কারণে এই বিপুল মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। পাকিস্তানের সংবিধান মেনে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ হয়নি।
ফরহাদ মজহার বলেন, বাংলাদেশ ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে এগোচ্ছে। ধীরে ধীরে আমরা আফগানিস্তান-ইরাকের মতো পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছি। পেট্রোল বোমা থেকে বোমার দিকে যেতে বেশি সময় লাগবে না। এ অবস্থায় ভেতর অথবা বাইর থেকে তৃতীয় শক্তির আর্বিভাব ঘটতে পারে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, দেশ একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এ অবস্থায় চুপ করে থাকলে চলবে না। সরকার যদি ক্ষমতা মোহ ত্যাগ না করে তাহলে সংকট আরো ঘনীভূত হতে থাকবে। তাই এখনো সময় আছে সরকারের সমঝোতায় আসা উচিত। বর্তমান সংবিধানে সংকট সমাধানের জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কোনো সমাধান নেই। তাই সংবিধানের সংশোধনের মাধ্যমে একটি জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেন একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা করা যায়।
তিনি বলেন, সরকার যদি মনে করে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের মামলা হামলা, দমন নিপীড়ন করে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। জনগণের স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদকে জঙ্গিবাদের তকমা দেয়া হলে সেটাও হবে ভুল। এ আলোচনা সভায় যে প্রস্তাব এসেছে তা সংকটের সমাধান করতে পারে। কারণ এতে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন রয়েছে। তাই আসুন দেশ ও জনগণকে রক্ষা করি। ১৬ কোটি মানুষ চলমান সংকটের সমাধান চায়। আশা করি, সারা দেশের মানুষের আকাক্সা অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের মাধ্যমে সংকটের সমাধান হবে।

Print Friendly, PDF & Email