সফল হতে হলে কয়েকটি অভ্যাস বর্জন করতে হবে

0
157

শিব্বির আহমদ ওসমানী: বহুল প্রচলিত একটি কথা আছে ‘মানুষ অভ্যাসের দাস’। মানুষ সফল হয়, সম্মানীত হয় তার ভালো অভ্যাস ও উত্তম গুনাবলীর কারণে। অপরদিকে মানুষের জীবনে হতাশা ও ব্যর্থতা আসে তার মন্দ ও খারাপ অভ্যাসের কারণে। সফলতার কিছু অংশ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কিছু অভ্যাস এর উপর নির্ভর করে। কিছু মানবীয় গুনাবলী বা উত্তম অভ্যাস তার জীবনকে সফল ও স্বার্থক করে তুলে। তেমনি কয়েকটি অভ্যাস নিয়ে আজকে আলোচনা করবো।
পরনির্ভরশীলতা বর্জন করতে হবে: সফল হতে হলে পরনির্ভরশীলতা বর্জন করতেই হবে। তা না হলে সফলতার মূখ দেখতে পরবেন না। যুদ্ধে সৈনিকদের মনোবল বাড়ানোর উপায় হলো- তাদের জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া। তখন তাদের যুদ্ধ করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় থাকে না। ঠিক তেমনি যতক্ষণ সন্তানরা জানবে তাদের পেছনে বিত্তশালী বাবা আছেন; ততদিন তারা স্বাবলম্বী হবে না। তাই পরনির্ভরশীলতা নয়, আত্মনির্ভশীল হতে বারবার চেষ্টা করতে হবে।
অতিরিক্ত চিন্তা করা ত্যাগ করতে হবে: একেবারে নির্ভীক বা চিন্তামুক্ত হওয়া ভালো না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিন্তার প্রয়োজন হয়। তবে সামান্য বিষয়ে বেশি বেশি চিন্তা করা একেবারে সমীচীন নয়। জীবনে সফল হতে হলে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। তাই চিন্তা আসাটাই স্বাভাবিক। তবে মাত্রাতিরিক্ত চিন্তা আমাদের ব্যর্থ হওয়ার অন্যতম কারণ।
অলসতা ত্যাগ করতে হবে: অলসতা বা ফাঁকিবাজি আমাদের ব্যার্থতার অন্যতম একটি কারণ। বেশিরভাগ সময়ে আমাদের অলসতা আমাদের সফলতা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দেয়। সফলতার জন্য এই অভ্যাসটি আমাদের জীবন থেকে দূর করতে হবে, সময়ের কাজ সময়ে করতে হবে।
আমিই সেরা- এই ধারণা বর্জন করতে হবে: অনেকেই ভেবে থাকেন আমিই সেরা, আমিই ঠিক, আমি যা করছি তাই সঠিক। তবে এ ধরনের আচরণ কর্মক্ষেত্র ও ব্যক্তিগত আচরণের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তাই সফল হতে হেল এগুলো বর্জন করতে হবে। কখনও আপনি সহপাঠী ও বন্ধুদের মাঝে নিজেকে অনন্য মনে করবেন না। চেষ্টা করবেন সবার সাথে সমান ভাবে মিশতে। সকলের মতামতকে গুরুত্ব দিতে শিখতে হবে।
অতিরিক্ত ক্রোধ ত্যাগ করতে হবে: রাগ করা মানুষের একটি সাধারণ অভ্যাস। আর প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত রাগ সর্বনাশের কারণ। অনেকেই আছে কারণে অকারণে অতিরিক্ত রেগে যায়। তাই জীবনে সফল হতে হলে এই অভ্যাসটি বর্জন করতেই হবে।
গরিবি আচরণ ত্যাগ করতে হবে: গরিব হয়ে জন্মানোতে আপনার কোনো হাত নেই। কিন্তু গরিব হয়ে থাকাটা আপনার অপরাধ। গরিব হলেও মনটা সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলুন। সেটা সম্পূর্ণই আপনার হাতে। মনের দিক থেকে ধনি হতে পারেন যে কেউ। সে জন্য গরিবি আচরণকে মনের ভেতর থেকে তাড়াতে হবে সবার আগে। রাজার মতো আচরণ করুন। তবে রাজার মতো বিলাসিতা করতে যাবেন না।
মন্দ আচার-ব্যবহার ত্যাগ করতে হবে: সফল হতে হলে আপনাকে অবশ্যই মন্দ আচার-ব্যবহার বর্জন করতে হবে। সফল মানুষদের আচার-ব্যবহার উত্তম হয়। শূন্য পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করা আমেরিকার সোলপক বলতেন, ‘খদ্দেরের সঙ্গে আমার ব্যবহারই আমার ক্যাপিটাল। আমি তাদের প্রত্যেকের সাথে অতিথির মতো ব্যবহার করি।’
দেরি করে কর্মক্ষেত্রে পৌছানো ত্যাগ করুন: দেরি করে ক্লাসে বা কর্মক্ষেত্রে পৌছানোর স্বভাব অনেকেরই রয়েছে। এ অভ্যাস আপনার সফলতার পথে অনেক বড় বাধা। সময় মত কাজ করলে আপনার কর্মক্ষেত্রে পৌছাতে দেরি হবে না। সময় মত সবটুকু কাজ গুছিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। সফল হতে হলে সময়ের কাজ সময়েই শুরু করতে হবে।
অযুহাত দেখানো ত্যাগ করতে হবে: কোন কাজ শুরু করার আগে কখনও বলবেন না, আপনি এ কাজটি পারেন না। এ রকম অযুহাত দেখানো পরিত্যাগ করুন। আগে কাজ করার জন্য চেষ্টা করে দেখুন পারেন কি না, যদি পারেন তো খুবই ভালো। আর যদি না পারেন তবে এটি নিয়ে বসে থাকবেন না, হতাশ হয়ে পড়বেন না। একটা কথা সব সময় মনে রাখবেন, পৃথিবির সবাই সব কিছু করতে পারে না। আপনি যে কাজ পারেন সেগুলো একে একে করার চেষ্টা করুন।
নিজেকে পরাজিত ভাববেন না: সকল মানুষই জিততে চায় তবে জেতার মতো হারার জন্যও প্রস্তুত থাকুন। হেরে যাওয়া মানে আবার কোনো বড় সফলতার হাতছানি। পরাজিত মানসিকতা, বিপর্যস্ত মানসিকতার চেয়েও ক্ষতিকর। সাফল্য ও ব্যর্থতা পাশাপাশি চলে। মিল্টন অন্ধ হওয়ার পর মহাকাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’ লেখেন।
বাচালতা বর্জন করুন: সব সময় বেশি কথা বলবেন না। এটি বাচালতার লক্ষণ। তাই কথা বলার আগে ভেবে চিনতে কথা বলুন। তাছাড়া বেশি কথা বলা ব্যক্তিত্ব হীণতার লক্ষন। তাই কম কথা বলে বেশি কাজ করার চিন্তা করুন।
পরিকল্পনা বহির্ভূত জীবন ত্যাগ করুন: আপনার ভবিষ্যত নির্ভর করছে আপনার সঠিক পরিকল্পনার উপর। পরিকল্পনা বহির্ভূত জীবন যাপন করবেন না। আজ রাতে ঘুমানোর আগেই সেরে ফেলুন আগামীকালের পরিকল্পনা। আগামী মাসের পরিকল্পনা এ মাসে করুন। আগামী বছর কী করবেন এ বছর পরিকল্পনা করে গুছিয়ে রাখুন।
দোষারোপ ত্যাগ করতে হবে: আপনার বর্তমান অবস্থার জন্য আপনি নিজেই দায়ী। আপনি যদি আপনার নিজের দায়িত্ব নিতে না পারেন তবে অন্য কেউ তো তা নিবেই। আপনার নিজের জীবনের এই সব ভূল সিদ্ধান্তের জন্য অন্যকে দোষারোপ করা ছেড়ে দিন। অন্যকে দোষারোপ করে শুধু সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই পারবেন না। নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে কাজে মনোনিবেশ করুন।
দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ত্যাগ করুন: শুধুমাত্র সকালে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস দেখেই বলে দেয়া যায় একজন মানুষ ভবিষ্যতে সফল নাকি সাধারণ হবে। পৃথিবীর বড় বড় সফল মানুষদের জীবনী থেকে দেখা যায় তাঁরা প্রায় সবাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠতেন, এবং ওঠেন। সফল ব্যক্তিরা তাঁদের তরুণ বয়স থেকেই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে কাজ শুরু করেন। তাই সফল হতে হলে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
সময় নষ্ট করা পরিহার করুন: সারাদিন টিভি, ইউটিউব/ফেসবুকে পড়ে থাকা সময় নষ্টের একটি অন্যতম মাধ্যম। টিভি দেখা ও সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিমিত সময় ব্যায় করতে হবে। এমনিতেই সময় নষ্ট করা সফলতার অন্তরায়। তাই সফল হতে হলে সময়ের গুরুত্ব দিতে হবে।
এছাড়াও আমারা দৈনন্দিন এমন কিছু কাজ করি যা আমাদের সফল হওয়ার অন্তরায়। আসুন আমরা আমাদের সকল বদ অভ্যাসগুলি পরিহার করে ভালো ও মানবীয় অভ্যাসগুলি চর্চা করে জীবনে সফল হওয়ার চেষ্ঠা করি।

লেখক: শিব্বির আহমদ ওসমানী- উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও সাংবাদিক।

Print Friendly, PDF & Email