সিটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ: ‘জবানবন্দী’র সুরাহা না করেই গেজেট প্রকাশ

0
134

Logo ecLogo ec
ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে মর্মে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের (প্রিসাইডিং অফিসার) স্বীকারোক্তি ও সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা অভিযোগ দিলেও তা আমলে নেয়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের অভিযোগ, ভোটগ্রহণে হওয়া অনিয়মের বিষয় আমলে না নিতেই ইসি তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করেছে।
ইসি সূত্রে জানা যায়, ভোটগ্রহণের দিন থেকে রবিবার পর্যন্ত অর্ধশতাধিক অনিয়মের অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা পড়েছে।
এদিকে গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দেওয়ার বিধান থাকলেও রবিবারও অভিযোগ জমা নিয়েছে ইসি। তবে গেজেট প্রকাশ হয়ে যাওয়ার অজুহাতে এ সব অভিযোগের কোনো সুরাহা করবে না কমিশন।
গত ৩০ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী (মিষ্টি কুমড়া) মো. শফিকুল ইসলাম। ওই ওয়ার্ডের ৪৭ ও ৪৮ নম্বর কেন্দ্রে জাল ভোটের ঘটনা ঘটেছে মর্মে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের লিখিত স্বীকারোক্তিসহ তিনি ইসিতে অভিযোগ করেন। কিন্তু অভিযোগ আমলে না নিয়ে ইসি ওইদিন মধ্যরাতেই গেজেট প্রকাশ করে।
শফিকুল অভিযোগে বলেন, ‘আমার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী কফিল উদ্দিন খান (ট্রাক্টর মার্কা) তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ৪৮, ৪৭, ৪১, ৪০, ৪৬, ৫২ ও ৫৩ নম্বর ভোটকেন্দ্র দখল করেন এবং ব্যাপক জাল ভোট প্রদান করেন।’
অভিযোগে আরও বলেন, ‘জাল ভোট প্রদানের সময় তার হাত থেকে একটি ব্যালট পেপারে বই উদ্ধার করি। ওই বইয়েরে (পৃষ্ঠা নম্বর ৩৬২২-৩৬৯৮) প্রতিটি ব্যালট পেপারে ট্রাক্টর মার্কায় সিল মারা ছিল। সেগুলো আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।’ এ ছাড়াও ৪৮ কেন্দ্র (হাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) ০০২৬১৫৫৭-০০২২৬২০০ ব্যালট পেপারে জাল ভোট প্রদান করলে উপস্থিত সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে একটি অভিযোগ ভোটগ্রহণের দিনই লিখিত দিয়েছেন। এ ছাড়া ৪৭ নম্বর কেন্দ্র (আশেকানে আউলিয়া আব্দুস মোনায়েম উচ্চ বিদ্যালয়) একই ঘটনা ঘটলে ওই কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার নাজনীন আরা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে লিখিত দিয়েছেন।
শফিকুল ইসলাম জানান, লিখিত স্বীকারোক্তিতে ৪৭ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. সালাউদ্দিনের সিল ও স্বাক্ষর করা রয়েছে। একইভাবে ৪৮ নম্বর ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার শফিকুল আলম স্বাক্ষর করেছেন। কিন্তু এ বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারকে অভিযোগ দিলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।
কাউন্সিলর প্রার্থী শফিকুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘এ সব কেন্দ্রে জাল ভোটের ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কর্মকর্তারা চুপ ছিলেন। তখনই ব্যবস্থা না নেওয়ায় কমিশনে আসতে হয়েছে।’
সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার আমিনুল ইসলাম তার লিখিত স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ‘৪৮ নম্বর ভোটকেন্দ্রে দুপুর ১টায় হঠাৎ কিছু লোক এসে আমার কাছে থেকে নীল রঙের বই কেড়ে নিয়ে সিল মারতে শুরু করে। আমি প্রিসাইডিং অফিসারকে এ ব্যাপারে জানাই এবং ব্যালট বাক্স সরিয়ে ফেলি। তারা বইয়ের ০০২৬১৫৭ থেকে ০০২২৬২০০ নম্বর ব্যালটে সিল মারে। তবে ব্যালট পেপারে আমার কোনো স্বাক্ষর ছিল না। নিরাপত্তার কারণে ভোটগ্রহণ আপাপত বন্ধ রাখি। অবস্থা অনুকূলে এলে পুনরায় শুরু করব।
৪৭ কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার নাজনীন আরা তার স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, ‘বেলা ১টা ২০ মিনিটে হঠাৎ কিছু লোক এসে আমার কাছ থেকে নীল রঙের বই কেড়ে নিয়ে সিল মারতে শুরু করে। আমি প্রিসাইডিং অফিসারকে জানাই এবং বাক্স সরিয়ে ফেলি। বইয়ের ০০২৩৮৭১ থেকে ০০২৩৮৯০০ নম্বর পর্যন্ত সিল মারতে থাকে। তবে এখানে আমার কোনো সিল ছিল না। নিরাপত্তার কারণে আমরা ভোটগ্রহণ বন্ধ রাখি।’
এদিকে রবিবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনে চট্টগ্রাম থেকে অনিয়মের অভিযোগ দিতে আসেন ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী চৌধুরী সায়েফুদ্দীন সিদ্দিকী।
তিনি দ্য রিপোর্টকে, ‘নির্বাচন কমিশন দায় এড়াতে তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করেছে। যাতে অনিয়মের অভিযোগ এলে সেগুলোকে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে পারে। কিন্তু সিটি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম হলেও ইসি সেটা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনি।’
রবিবার একই অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম সিটির ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মোহাম্মদ হোসেন, ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী হাজী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সির প্রার্থী মো. আব্দুল মালেক। এ ছাড়া ঢাকা উত্তর-দক্ষিণের সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা একই অভিযোগ করেছেন।
তবে এ সব অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচনী অভিযোগ ইসিতে দেওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ম অনুযায়ী প্রার্থীদের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করতে হবে। ট্রাইব্যুনাল তদন্ত করে রায় দেবেন।’
ইসির আইন শাখা এক কর্মকর্তা দ্য রিপোর্টকে জানান, নির্বাচনী অনিয়ম অভিযোগ তদন্ত করতে প্রতি সিটিতে একজন যুগ্ম-জেলা জজের নেতৃত্বে নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে। সংক্ষুব্ধরা ওই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করতে পারবেন।
ইসি কর্মকর্তারা বলেন, ভোটগ্রহণের ৩০ দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ করে বিজয়ীদের শপথ পাঠ করানোর আইনী বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসেবে ইসির হাতে এক মাস সময় থাকলেও রিটার্নিং অফিসারদের পাঠানো ফল যাচাই-বাছাই না করে ৩০ এপ্রিল মধ্যরাতে গেজেট প্রকাশ করে। অতীতে ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে কমিশন গেজেট আটকে রেখে তা তদন্তের নির্দেশ দিত। কিন্তু এবার তেমনটি লক্ষ্য করা যায়নি।
৩০ এপ্রিল রাতে ইসির উপ-সচিব মো. সামসুল আমল দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘যতদ্রুত সম্ভব গেজেট প্রকাশ করতে কমিশন থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
গত ২৮ এপ্রিল তিন সিটিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে কারচুপি, জোরপূর্বক ভোটদান, কেন্দ্র দখল, জাল ভোট ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্যে এ সব অনিয়ম ঘটলেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে ইসি। অনিয়মের অভিযোগ এনে বিএনপি সমর্থিত প্র্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইসি দৃশ্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা থাকলেও ইসি মাঠে সেনা না নামিয়েই নির্বাচন শেষ করেছে।
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন দ্য ‍রিপোর্টেকে বলেন, ‘সংক্ষুব্ধদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কশিমন গেজেট প্রকাশের আগে তদন্ত করতে পারত। গেজেট প্রকাশ হয়ে গেলে ইসির আর কিছু করণীয় থাকে না।’

Print Friendly, PDF & Email