২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে: খালেদা

0
171

নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামীতে ক্ষমতায় গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত করা, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা, গণভোট প্রবর্তনসহ নানা পরিকল্পনা তুলে ধরে ‘ভিশন-২০৩০’ প্রকাশ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে দলের এ ভিশন তুলে ধরে বিএনপি প্রধান বলেন, গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা জনগণকে সাথে নিয়ে রুখে দেবে বিএনপি।
গণতন্ত্র, জাতিগঠন, সুশাসনসহ রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে জড়িত ৩৭টি পৃথক বিষয়ে দলের বিস্তারিত পরিকল্পনা ২৫৬টি পয়েন্টের মাধ্যমে প্রতিশ্রুতি আকারে তুলে ধরেন বেগম জিয়া।
তিনি বলেন, ‘এ ভিশন অর্জন কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। নির্বাচনকালীন একটি যথার্থই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে আমাদের এই ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রায় দুই ঘণ্টার লিখিত বক্তব্যে ‘ভিশন ২০৩০’ সারাংশ আকারে তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
গণতন্ত্র
খালেদা জিয়া বলেন, বিএনপি মনে করে বাংলাদেশের জনগণ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিল আজ সে রাষ্ট্রের মালিকানা তাদের হাতে নেই। তাই দেশের জনগণের হাতেই দেশের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে চায় বিএনপি। কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং ‘গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়ন শ্রেয়’এ অজুহাতে গণতন্ত্রকে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টা জনগণকে সাথে নিয়ে প্রতিহত করা হবে।
তিনি বলেন, বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোয় প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর উপর ন্যস্ত। প্রধানমন্ত্রীর একক নির্বাহী ক্ষমতা সংসদীয় সরকারের আবরণে একটি স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক শাসনের জন্ম দিয়েছে। বিদ্যমান অবস্থার অবসানকল্পে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা হবে। সংবিধানের এক-কেন্দ্রিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রেখে বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করার বিষয়ে পরিক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংবিধানের পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোট ব্যবস্থা বাতিল, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ নানা বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক বিধানাবলী পর্যালোচনা ও পুন:পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার করা হবে। গণভোট ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃস্থাপন করবে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’ প্রতিষ্ঠা করার কাঙ্খিত লক্ষ্যে জাতিকে পৌঁছাতে দৃঢ়-প্রতিজ্ঞ। এজন্য সুনীতি, সুশাসন এবং সু-সরকারের সমন্বয় ঘটাবে বিএনপি।
জাতি গঠন
খালেদা জিয়া বলেন, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিএনপি। এজন্য নতুন এক সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে বিএনপি সচেষ্ট হবে।
সুশাসন
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক সুশাসনের জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো স্বার্থপরতা ও দলীয়তার কালিমা মুক্ত করে এগুলোর দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আইনি ও প্রক্রিয়াগত পদক্ষেপ নেবে বিএনপি।
তিনি বলেন, বিএনপি দুর্নীতির সাথে কোনো আপস করবে না। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী ‘ন্যায়পাল’-এর অফিস কার্যকর করা হবে। দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ বাতিল করা হবে।
তিনি বলেন, দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, নীতিবোধ, দেশপ্রেম, বিচার-বোধ ও সুনামের কঠোর মানদণ্ডে যাচাই করে সব আদালতের বিচারক নিয়োগ করা হবে। যোগ্যতা, মেধা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংবিধানের আলোকে বিচারপতি নিয়োগের জন্য সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ড সম্বলিত আইন প্রণয়ন করে বাছাই কমিটি ও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। নিয়োগের জন্য বাছাইকৃত/সুপারিশকৃত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত তথ্য ও সম্পদ বিবরণী জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। বর্তমান বিচারব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে।
তিনি বলেন, বর্তমানে থানায় গেলে অনেক সময় পুলিশ মামলা নেয় না। এটা ডিনায়েল অব জাস্টিস। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য দেশব্যাপী থানাগুলোতে অনলাইন পদ্ধতি ও মোবাইল টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে অভিযোগ দায়েরের সুযোগ সৃষ্টি করে ফৌজদারী বিচার প্রার্থীদের আইনের নিরাপত্তা পাওয়ার সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। পুলিশ বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর অনাকাঙ্খিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হবে।
প্রতিরক্ষা
খালেদা জিয়া বলেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতা সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আধুনিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও সমর-সম্ভারে সুসজ্জিত, সুসংগঠিত, যুগোপযোগী এবং সর্বোচ্চ দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত করে গড়ে তোলা হবে। গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ভিত্তি ও বিন্যাস প্রতিষ্ঠা করা হবে।
পররাষ্ট্রনীতি
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বিএনপি বিশ্বাস করে, আমাদের সীমান্তের বাইরে বাংলাদেশের বন্ধু রয়েছে, কোনো প্রভু নেই। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। মুসলিম উম্মাহ ও প্রতিবেশি দেশসমূহের সাথে বিশেষ স¤পর্ক গড়ে তোলা হবে।
নৈতিকতার শক্তি পুনরুদ্ধার
তিনি বলেন, বাংলাদেশে নৈতিক মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয় ঘটেছে। এর ফলে সমাজে অস্থিরতা ও নৈরাজ্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিএনপি গণমাধ্যম, একাডেমিক-কারিক্যুলাম, সঠিক ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা এবং ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রতিরোধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
পরিষেবা
খালেদা জিয়া বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানীয় জলের সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাষন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পুলিশী সেবা, বিচারিক সেবা, স্বাস্থ্য সেবা, প্রশাসনিক সেবাসহ সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থাসমূহের সেবার মান ক্রমান্বয়ে উন্নত করা হবে।
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী
বেগম জিয়া বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী আরো সম্প্রসারিত করা হবে, যাতে করে একটি দরিদ্র দুঃস্থ মানুষও নিরাপত্তা বেষ্টনীর বাইরে না থাকে। মূল্যস্ফীতির নিরিখে এর মাথাপিছু পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। বেসরকারি খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বার্ধ্যক্যের দুর্দশা লাঘবের উদ্দেশ্যে আইন প্রনয়ণের মাধ্যমে একটি ‘পেনশন ফান্ড’ গঠন করা হবে। প্রবীণদের শেষ বয়সের দিনগুলোতে দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য তাদের প্রতি মাসে পেনশন দেয়া হবে। বাস-ট্রেনে-লঞ্চে বিনা ভাড়ায় প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের বিধান করা হবে।
মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা
তিনি বলেন, বিএনপি সব মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হিসাবে ঘোষণা করবে। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নের নামে দুর্নীতির অবসান ঘটানো হবে। বিএনপি একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক তালিকা প্রস্তুত করবে। দশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা, ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি ও গনকবর চিহ্নিত করে সেসব স্থানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে।
সন্ত্রাসবাদ
খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ জাতির জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। গনতন্ত্রের অনুপস্থিতি, আইনের শাসনের অভাব ও মানবাধিকার লঙ্ঘন এদেশে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদ বিস্তারে অন্যতম কারন। এ কারণে বিএনপি বাংলাদেশের ভূখণ্ডের মধ্যে কোনোরকম সন্ত্রাসবাদী তৎপরতাকে বরদাশত করবে না এবং সন্ত্রাসবাদীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। জঙ্গীবাদ, উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্য গঠন এবং জনগণের অংশগ্রহণে এসব গনবিরোধী চক্র নির্মূল করা হবে।
অর্থনীতি
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চাই। এসময়ের মধ্যে মাথাপিছু আয় ৫০০০ মার্কিন ডলারে উন্নীত করা হবে। এর জন্য বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ডবল ডিজিটে উন্নীত করার সৃজনশীল ও বুদ্ধিদীপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্ত্বশাসন, ক্ষমতা ও তদারকি নিবিড় ও শক্তিশালী করা হবে। শেয়ারমার্কেট এবং ব্যাংক লুটের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে ভবিষ্যতে যাতে কেউ এমন দুর্নীতি-অনাচার করতে না পারে সেই লক্ষ্যে সিকিউরিটি এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ব¡ ব্যাংক পরিচালনা বোর্ডে যোগ্য, সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হবে।
গবেষণা ও উন্নয়ন
তিনি বলেন, একবিংশ শতাব্দীতে পৃথিবী জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির জগতে প্রবেশ করেছে। বৈশ্বিক এই উন্নয়নের ধারার সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য বিএনপি গবেষণা ও উন্নয়ন খাতের বিকাশ ও পরিবর্ধন করবে।
জনমিতিক লভ্যাংশ
তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩.২৫ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষম বয়সের মধ্যে পড়ে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে এর বিশাল তাৎপর্য রয়েছে। এই সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে। বেকার মানুষের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বিএনপি ২০৩০ সনের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ মানব উন্নয়ন স্কেলে উন্নীত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
শিক্ষা ও মানব সম্পদ
তিনি বলেন, শিক্ষাকে কর্মমুখী ও ব্যবহারিক জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করা হবে। বিএনপি শিক্ষার প্রতিটি স্তরে গুণগত মান নিশ্চিত করবে এবং বিজ্ঞান শিক্ষায় অনগ্রসরতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এক দশকের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করা হবে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫% অর্থ ব্যয় করা হবে। মেয়েদের এবং ছেলেদের জন্য স্নাতক ও সমপর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হবে। ছেলে ও মেয়েদের জন্য শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি বলেন, বিএনপির শিক্ষানীতি হবে জীবনমুখী, ডিগ্রীমুখী নয়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার লক্ষ্যে দ্রব্য মূল্যের সাথে সঙ্গতি রেখে নিয়মিত বেতন ভাতাদি বৃদ্ধি করা হবে। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করা হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি
খালেদা জিয়া বলেন, তথ্য ও প্রযুক্তি খাত হবে বিএনপি’র বিশেষ অগ্রাধিকার খাত। বর্তমান সরকার আইসিটি সেক্টরে উন্নয়নের বাগাড়ম্বর করলেও বাস্তব চিত্র সুখকর নয়। বিএনপি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলায় সক্ষম করে তোলার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। ২০৩০ সালের মধ্যে তথ্য ও প্রযুক্তি খাতকে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতে রূপান্তর করা হবে।
তিনি বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে মাধ্যমিক স্তরে এবং ২০২৫ সাল নাগাদ প্রাথমিক স্তরে প্রশিক্ষিত শিক্ষক, হার্ড-অয়্যার, ল্যাবরেটরিসহ সব দিক থেকে উন্নততর আইটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
ক্রীড়া
২০৩০ সালের মধ্যে খেলাধুলার কয়েকটি ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশ যাতে একটি গ্রহণযোগ্য স্থান করে নিতে পারে সে লক্ষ্যে পরিকল্পিত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ক্রীড়া ও খেলাধুলার ক্ষেত্রে ‘ট্যালেন্ট হান্ট’ স্কিম চালু করা হবে।
সংস্কৃতি
তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অনৈতিক আকাশ-সংস্কৃতি ও অপ-সংস্কৃতির আগ্রাসন রোধ করা হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুস্থ সংস্কৃতি ও বিনোদন চর্চার পরিবেশ ও সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করা হবে।
বিদেশে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, ঝুঁকিমুক্ত অভিবাসন নিশ্চিতকরণ ও অভিবাসন ব্যবস্থাপনা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সুচিন্তিুত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
প্রবাসীরা যাতে তাদের কষ্টার্জিত আয় বৈধ পথে বাংলাদেশে প্রেরণ করতে পারে সে জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক এক্সচেঞ্জ হাউস ও ব্যাংকের সংগে প্রণোদনা সুবিধাসহ রেমিট্যান্স প্রেরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। বিদেশ ফেরত প্রবাসীদের বিমান বন্দরে হয়রানি বন্ধ করা হবে।
মিডিয়া ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা
তিনি বলেন, বিএনপি বস্তুনিষ্ঠ সমালোচনাকে সব সময় স্বাগত জানায়। সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং গঠনমূলক ও বস্তুনিষ্ঠ সমালোচকের নিরাপত্তা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সে দায়িত্ব পালনে বিএনপি সর্বদা স্বচেষ্ট থাকবে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করা হবে।
স্থানীয় সরকার
খালেদা জিয়া বলেন, ‘স্থানীয় নেতৃত্বেই টেকসই সমাধান সম্ভব’ -এ নীতির ভিত্তিতে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ক্ষমতায়িত করা হবে। ক্ষমতা ও উন্নয়নের ভরকেন্দ্র হবে গ্রামমুখী।
কৃষি ও কৃষক তিনি বলেন, জনসংখ্যা বাড়ছে এবং কৃষি জমি কমছে। এটা বিবেচনায় নিয়ে উদ্ভাবনমূলক কৃষি-কৌশল গ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্রীয় বাজেটের একটি যৌক্তিক অংশ কৃষি গবেষণার জন্য বরাদ্দ করা হবে।
কৃষি নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই ঝুঁকি মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজনে ভর্তুকি দিয়ে হলেও শস্য বীমা, পশু বীমা, মৎস্য বীমা এবং পোল্ট্রি বীমা চালু করা হবে।
গরীব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগকবলিত কৃষকের কৃষি ঋণের সুদ মওকুফ করা হবে।
শ্রমিক কল্যাণ
তিনি বলেন, বিএনপি শ্রমিক শ্রেণির ট্রেড ইউনিয়ন ও যৌথ দরকষাকষি করার গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করবে। বাজারমূল্য ও মূল্যস্ফীতির সাথে সঙ্গতি রেখে সব সেক্টরে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য প্রতি দুই বছর অন্তর রিভিউ ব্যবস্থা চালু করা হবে। গার্মেন্টস শিল্পে কর্মরত বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
নগরায়ণ ও আবাসন
দশের দ্রুত বর্ধনশীল এবং নৈরাজ্যপূর্ণ নগরায়ণকে সুশৃঙ্খল করতে একটি জাতীয় মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে।
বাসস্থান প্রত্যেক নাগরিকের অন্যতম মৌলিক অধিকার। বিএনপি সীমিত আয়ের মানুষের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক বহুমুখী প্রকল্পের আওতায় সাশ্রয়ী মূল্যে পরিকল্পিত আবাসন সুবিধা প্রদানের প্রয়াস নিবে।
নিরাপদ খাদ্য ও ওষুধ
ভেজাল প্রতিরোধ, বিশেষ করে খাদ্যে ও ওষুধে ভেজাল রোধে আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। একটি শক্তিশালী ও কার্যকর খাদ্য ও ঔষধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ গঠন করা হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
স্বাস্থ্যসেবা
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’-এই হবে বিএনপির স্বাস্থ্য-নীতি। সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করার নিমিত্তে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব নাগরিকের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু করা হবে। বাংলাদেশের সব নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। জিডিপির ৫% অর্থ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে। বিএনপি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার পর্যায়ক্রমে শূন্য শতাংশে কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। পরিবার কল্যাণ কর্মসূচিকে সফল করার জন্য বস্তিবাসী, নিম্নবিত্ত ও শিক্ষার আলোক বঞ্চিতসহ সমাজের প্রতিটি স্তরে পরিবার কল্যাণ কার্যক্রম কার্যকরভাবে সম্প্রসারিত করা হবে।

যুব, নারী ও শিশু
তিনি বলেন, যুব, নারী ও শিশুদের জীবন বিকাশের চাহিদার নিরিখে যথোপযুক্ত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হবে। জাতীয় উন্নয়নে যুব ও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ গ্রহণের পথে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের অধিকতর উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সমর্থন, স্বল্প-সুদে ব্যাংক ঋণ এবং কর-ছাড় দেয়া হবে। জলবায়ু পরিবর্তন
তিনি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তুলতে বিশ্বজনমত গঠন ও বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
পানি সম্পদ, নীল অর্থনীতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ
তিনি বলেন, সামাজিক ও পরিবেশগত কোনো সমস্যা সৃষ্টি না করে সারা দেশে পানি সম্পদের কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উন্নততর পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ঢাকা বসবাসের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় নিকৃষ্টতম নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী ঢাকার জনজীবনের স্বার্থে বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগসহ ঢাকার চারপাশের জলাভূমি দূষণমুক্ত করে এগুলোতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এতে পরিবেশ দূষণ হ্রাস ছাড়াও ভূ-পৃষ্ঠে পরিচ্ছন্ন পানি ও সুলভ নৌ-যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে বহমান আন্তর্জাতিক নদীসমূহের পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বিএনপি আঞ্চলিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে আলাপ-আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করবে। প্রয়োজনে কার্যকর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগও গ্রহণ করা হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
খালেদা জিয়া বলেন, কাঙ্খিত ডবল ডিজিট প্রবৃদ্ধির চাহিদা পূরণের জন্য ২০৩০ সাল নাগাদ আনুমানিক ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্যোগ নেবে। দশের বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট নিরসন এবং দীর্ঘ মেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email