আগুনে পুড়ে গেছে আমার দেশ অফিস

0
268

ঢাকা: আগুনে পুড়ে গেছে দৈনিক আমার দেশ অফিস। সরকারের নির্দেশে পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হওয়ায় বছর খানেক পরে আজ শুক্রবার আগুন লেগে পুরো পত্রিকা কার্যালয় ভস্মিভূত হয়ে যায়। রাজধানীর কাওরান বাজারে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) ভবনে ১১ তলায় ছিল আমার দেশ’র কার্যালয়।
বেলা সাড়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ আগুনের সূত্র পাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ২০টি ইউনিট দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিভিয়ে ফেলে। তবে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আগ্নিকাণ্ডে এনটিভি ও আরটিভির সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তবে অগ্নিকাণ্ডে এই দু’টি টেলিভিশন চ্যানেলের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলে জানা গেছে।
শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৫ টার দিকে আরেকটি বেসরকারি চ্যানেলের সহযোগিতায় এনটিভি তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে আরটিভি বিএসইসি ভবনের স্টুডিও থেকে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে।
এ ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা) শেখ মিজানুর রহমানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। এছাড়া বিএসইসি কর্তৃপক্ষও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে এ অগ্নিকাণ্ডকে রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন আমার দেশ’র সাংবাদিকরা।
এর আগেও গত ২০০৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই ভবনে আগুন লেগে এনটিভি, আরটিভি ও আমার দেশসহ ১০টি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় পুড়ে যায়। মৃত্যু হয় তিনজনের। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদন আজো আলোর মুখ দেখেনি।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এনটিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুসাদ্দেক আলী ফালু, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী মোহাম্মাদ আলী আহমেদ খান, সাংবাদিক সংগঠনগুলো নেতৃবৃন্দসহ অনেকে। এছাড়া ওই ভবনের রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমায় উৎসুক জনতা। এ কারণে আগুন নেভাতে বেগ পোহাতে হয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার থাকায় ওই ভবনের অনেক অফিসই বন্ধ ছিল। পৌনে ১২টার দিকে আগুন আগুন শব্দে চিৎকার চেচামেচি শুনে ভবনের অন্যান্য তলায় থাকা লোকজন দ্রুত লিফট এবং সিড়ি দিয়ে নেমে যায়। যার কারণে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
খবর পেয়ে প্রথম দফায় ফায়ার সার্ভিসের ১৬টি ইউনিট গিয়ে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। এর সাথে আরো পাঁচটি ইউনিট অগ্নিনির্বাপনের কাজে যোগ দেয়। দুপুর ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এ সময়ের মধ্যে আমার দেশ পত্রিকার অফিসের কম্পিউটার, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি, চেয়ার টেবিল ও অফিসের অন্যান্য জিনিসপত্র পুড়ে যায়। এই ১১ তলায় ল’অফিস ব্যারিস্টার তানজিব আলম অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস ও সার্ভারনেট নামে একটি গার্মেন্টস এক্সাসারিজ সরবরাহের প্রতিষ্ঠান ছিল। অগ্নিকাণ্ডে এ দুটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সার্ভারনেট প্রতিষ্ঠানের সব আসবাব ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে গেছে। এছাড়া আগুন লাগার সময় ওই ভবনে অবস্থিত এনটিভি আরটিভির সম্প্রচার চলছিল। পরবর্তীতে বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে পাওয়ার লাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চ্যানেল দুটির সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
দৈনিক আমার দেশের অফিস সহকারি আব্বাস আলী হাওলাদার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা অফিস পরিবর্তনের জন্য কয়েকটি এসি ও চেয়ার লিফটে নামিয়েছি। আরো মাল নামানোর প্রস্তুতি চলছিল। এ সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উত্তর-পূর্ব দিকের স্টোর রুমে আগুনের ফুলকি দেখা যায়। স্টোর রুম তালাবন্ধ ছিল। স্টোর রুমের চাবি যার কাছে থাকে, তাকে ফোন করে ডেকে আনা হয়। পরে চাবি দিলে খুলে নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেই।
ভবন থেকে নেমে আসা আমার দেশের একজন কর্মী জানান, কিছু বুঝে উঠার আগেই তারা হঠাৎ কালো ধোয়া দেখা যায়। এরপরই তারা নিচে নেমে আসেন। তখন কার্যালয়ে আর কেউ ছিল না।
এদিকে এনটিভি ও আরটিভির কর্মীরাও আগুন লাগার পর নিচে নেমে আসেন। আগুন লাগার সময় ওই ভবনে একটি কর্মশালাও চলছিল। আগুন লাগার পর ওই কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ও অতিথিরাও দ্রুত নিচে নেমে যান।
আমার দেশের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নাসির উদ্দীন শোয়েব জানান, দীর্ঘদিন ধরে অফিস পরিবর্তনের কথা বলা হলেও বিএসইসি কর্তৃপক্ষ ছাড়পত্র না পাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। গত বৃহস্পতিবার বিএসইসি কর্তৃপক্ষের সাথে আমার দেশ কর্তৃপক্ষের দেনা পাওনা মিটিয়ে আজ শুক্রবার সকালে গুলশানের নিকেতনে অফিস পরিবর্তনের কথা ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় সকালে ইলেট্রেশিয়ান আহমদ আলী, পারভেজ, স্টোর কিপার মহসিন, ঝাড়–দার তরুন দাস, স্টাফ আব্বাস আলীসহ বেশ কয়েকজন শ্রমিক অফিস স্থানান্তরের কাজ করছিল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্রমিকরা স্টোর রুমে ধোঁয়া দেখতে পান। প্রাথমিকভাবে তারা নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন বলে জানান নাসির উদ্দীন শোয়েব। পত্রিকা স্থানান্তরের দিন আগুন লাগার ঘটনা নাশকতা হতে পারে বলেও সন্দেহ করেন তিনি। পত্রিকাটির কম্পিউটারসহ যাবতীয় মালামাল পুড়ে গেছে বলেও জানান শোয়েব।
ওই তলায় পত্রিকার গোডাউন ও স্টোর রুম ছিল। এছাড়া ১১তলায় অবস্থিত ব্যারিস্টার তানজিম আলমের চেম্বারটি সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। তবে ৯, ৮, ৭ তলায় এনটিভি এবং ছয় তলায় আরটিভির কারো কোনো ক্ষতি হয়নি। চ্যানেলের কর্মীরা নিরাপদে বের হয়ে যান ভবন থেকে। তবে আর্থ স্টেশনের ক্ষতি হওয়ায় চ্যানেল দুটির সম্প্রচার বন্ধ গয়ে যায়।
আমার দেশের রিপোর্টার মাহমুদা ডলি জানান, আমার দেশ পত্রিকার অফিস নিকেতনে স্থানান্তর করার কথা ছিল। এজন্য অফিসের মালপত্র নামানো হচ্ছিল। সকাল সোয়া ১১টার পর অফিসের সিকিউরিটি গার্ড মাসুম তাকে ফোনে অগ্নিকাণ্ডের কথা জানান। আমার দেশ পত্রিকার সার্ভার ও আর্কাইভ সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি।
মহামুদা ডলি অভিযোগ করেন, অফিস পরিবর্তনের মুহূর্তে এমন ঘটনা যে পরিকল্পিত তা বোঝা যাচ্ছে। সরকারের লোকজন পরিকল্পিতভাবে আমার দেশ অফিসে অগ্নিসংযোগ করেছে। সরকার আগেই আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করেছে এখন অফিসে আগুন দিয়ে এর কবর রচনা করল।
তবে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, শর্ট সার্কিট থেকে আগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছে। নির্দিষ্ট করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও জানাতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা দুটি সিড়ি লাগিয়ে ১১ তলায় পানি দিচ্ছেন। এক পর্যায়ে আগুনের তেজ কমে এলেও ভবনের ভেতরে প্রচুর ধোঁয়া জমে যায়। ধোঁয়া বের করতে ভবনের বেশ কিছু জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। বেলা ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরোপুরি নির্বাপন করতে বিকেল ৪টা গড়িয়ে যায়। বিএসইসি ভবন থেকে আগুনের হলকা ও ধোঁয়া আশপাশের ভবনে ছড়িছে পড়ার উপক্রম হয়। এতে আতঙ্কিত হয়ে আশপাশের ভবনের অনেকেও নিচে নেমে আসেন। আশেপাশের ভবনে পানিও ছেটানো হয়। ভবন ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড় জমে যায়। পরে র্যাওব-পুলিশ জনতাকে নির্দিষ্ট দূরত্বে সরিয়ে দেয়। ভবন থেকে ভেঙে পড়া কাচের টুকরো লেগে ঘটনাস্থলে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এটিএন নিউজের প্রতিবেদক মারুফ আল মুহিত আহত হন। বিকেলে ১১ তলায় আমার দেশ অফিসে ঢুকে দেখা যায় পুরো অফিস পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। হাতে গোনা কয়েকটি কম্পিউটার ছাড়া সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

Print Friendly, PDF & Email