ই-বর্জ্য: মারাত্বক ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশ ও শরীরের

0
492

E-borjo

নিউজ ডেস্ক: প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে দৈনন্দিন জীবনে নানা ইলেকট্রনিক্স পণ্য হচ্ছে আমাদের নিত্য-ব্যবহারের সঙ্গী। টিভি, ফ্রিজ, ওভেন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোনের মত পণ্যগুলো জীবনকে যতটা সহজ করছে তেমনি এগুলো ব্যবহারের কয়েক বছর পর কর্মক্ষমতা শেষ হলে ফেলে দেওয়া হচ্ছে যেখানে সেখানে।
বাংলাদেশে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান গুলো বলছে দেশে প্রতিবছর ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট বা ই-বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। যেগুলো ব্যবস্থাপনার অভাবে পরিবেশ ও মানুষের শরীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
পুরান ঢাকার নিমতলীতে নানা রকমের ইলেকট্রনিক্স পণ্যের দোকান নান্নু মিয়ার। চল্লিশের কাছাকাছি বয়স নান্নু মিয়া -অনেক ছোট বেলা থেকেই এই কাজ শিখেছেন। তবে তখন ছিল রেডিও ও সাদাকালো টিভির যুগ।
সময়ের সাথে তার দোকানে এখন শোভা পাচ্ছে নানা মডেলের রঙ্গিন টিভি, ফ্রিজ, ওভেন ও কম্পিউটার। পুরোনো এসব ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী ভেঙ্গে সেসব থেকে প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক, লোহা রেখে – বাকিগুলো ফেলে দেন তিনি।নিমতলী এই দোকানগুলোর মত ঢাকার আরও কয়েকটি স্থানে এধরনের পুরনো জিনিসের দোকান রয়েছে।পুরান ঢাকার চকবাজার, ইসলামপুর, জিঞ্জিরা, বাবুবাজার এলাকায় পুরানো ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বেচাকেনা হয়।
ঢাকার ইসলামপুরে যারা ভাঙ্গারির ব্যবসায়ী নামেই স্থানীয়ভাবে পরিচিত তারা কম্পিউটার, ফ্রিজ, টিভির মত সামগ্রীগুলো ভেঙে আলাদা করে থাকেন। তবে একাজ করতে কোনও প্রশিক্ষণের দরকার নেই বলেও তারা মনে করেন।
ইসলামপুরের একজন ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মিরাজ বলছিলেন এসব ভাঙ্গা বা আলাদা করার কাজ হাত দিয়েই করেন তিনি। এর জন্য কোন বাড়তি প্রস্তুতি নেন না তিনি। মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা ও শ্বাস কষ্টে ভোগেন তিনি।
প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সাথে সাথে টিভি, ফ্রিজ, মাইক্রো ওভেন, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, এয়ারকন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, ডিভিডি প্লেয়ার, সিএফএল বাল্ব এসব কিছু ব্যবহার হচ্ছে প্রতিদিনকার জীবনে।
বেশ কয়েক বছর ব্যবহারের পর যখন তাদের কর্মক্ষমতা শেষ হয় তখন তাদের ঠিকানা হয় বিভিন্ন অঞ্চলে একদম নিজ উদ্যোগে গড়ে ওঠা কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর দোকানে।
তারা এসব সামগ্রী থেকে প্রয়োজনীয় লোহা, প্লাস্টিক রেখে বাকিটা ফেলে দেন। যেগুলো যায় বিভিন্ন আবর্জনা ফেলার স্থান, নদী-নালা ও ডোবায়।বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে যারা ইলেকট্রনিক্স ওয়েস্ট বা ই-বর্জ্য নিয়ে গবেষণা করছেন তারা বলছেন দেশে এখন বছরে ১০ মিলিয়ন মেট্রিক টন ই-ওয়েস্ট তৈরি হচ্ছে।
তবে এর আশি শতাংশ আসছে দেশের বাইরে থেকে। একটি সংস্থার গবেষক ড.শাহরিয়ার হোসেন বলছিলেন চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙ্গা শিল্প থেকে বছরে ৮০ শতাংশ বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। বাকি ২০ শতাংশ হচ্ছে বাংলাদেশে।
তিনি বলেন পুরানো জাহাজ যেগুলো ভাঙ্গার জন্য আনা হয় সেগুলোর মধ্যেও সেসব দেশের ইলেকট্রনিক্স পণ্য বা ই-ওয়েস্ট থাকে। এসব বিষাক্ত উপাদান মাটিতে এবং পানিতে যাচ্ছে। চক্রাকারে তা আবার মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।

কিন্তু এসব ইলেকট্রনিক্স পণ্য কি শুধু প্লাস্টিক, লোহা – তামা বা কঠিন ধাতব পদার্থ দিয়েই তৈরি হয়!
এগুলো তৈরিতে আরও ব্যবহার করা হয় সিসা, ফাইবার গ্লাস, কার্বন, সিলিকন, পারদ- পণ্যের প্রয়োজন অনুযায়ী আরও উপাদান।
ফলে উন্মুক্ত স্থানে কোন প্রশিক্ষণ ছাড়া এসব সামগ্রী ভাঙ্গা, বেচা-কিনা এবং সবশেষে বিভিন্ন আবর্জনার স্তূপ বা পানিতে এর অবশিষ্টাংশ ফেলাটা পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর হতে পারে সে প্রশ্ন এসে যায়।
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক শাকিল আকতার বলছিলেন দুইভাবে মানুষের শরীরে এটি প্রভাব ফেলে। প্রথমত ত্বকের বিভিন্ন রোগ এবং পরবর্তী পর্যায়ে কিডনি, ফুসফুস ও ব্রেনের মারাত্মক ক্ষতি করে এসব উপাদান।
এসব ইলেকট্রনিক্স পণ্য বেশিরভাগ আমদানি করা বিশ্বের নানা দেশ থেকে।দেশে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। পণ্যগুলো কেনার সময় এক বছরের ওয়ারেন্টি থাকে।
অর্থাৎ একবছরের মধ্যে কোন সমস্যা হলে ঐ প্রতিষ্ঠান মেরামতের কাজ করে দেয়। কিন্তু কয়েক বছর পর ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পরলে সেগুলো রি-সাইকেল বা পুনর্ব্যবহার উপযোগী করা তোলা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পরে না প্রতিষ্ঠানগুলোর।
বাংলাদেশে ই-ওয়েস্ট বা ই বর্জ্য তৈরির অন্যতম পণ্যের মধ্যে রয়েছে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ। এই পণ্যের বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান গুলো পুরানো কম্পিউটার ফেরত নেওয়া বা রি-সাইকেল করার জন্য কোন নিয়মনীতির বাধ্যবাধকতায় কি পরেন?
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্য ও এবিসি কম্পিউটার কর্নারের প্রধান কাজি শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন এধরনের কোন নিয়ম বাংলাদেশে নেই। তিনি বলছিলেন উন্নত কিছু দেশে এ ধরনের নিয়ম থাকলেও আমাদের এসব কিছু মানতে হয় না।
বাংলাদেশে এসব পুরানো ইলেকট্রনিক্স পণ্যে ধ্বংস বা পুনর্ব্যবহারের জন্য কোন স্থান বা অবকাঠামো নেই।
ঢাকা এবং চট্টগ্রামের কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এগুলো অল্প দামে কিনে সেটা ভেঙ্গে প্রয়োজনীয় উপাদান রেখে বাকিটা বিক্রি করে দিচ্ছেন ভাঙারির দোকানির কাছে।আর দেশের অন্যান্য স্থানে উন্মুক্ত স্থানে কখনো রাস্তার পাশে অথবা বিভিন্ন আবর্জনার স্তূপ ও নদী-নালার মাধ্যমে পানিতে যাচ্ছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে পরিবেশ নিয়ে যেসব সংস্থা গবেষণা করে তারা কিছু সুপারিশ নিয়ে একটি নীতিমালার করার প্রস্তাব দিয়েছিল সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় কে।
তবে সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন বিষয়টি এখনো স্ট্যাডির পর্যায়ে রয়েছে। কোন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন এটা একটা নতুন বিষয়, এ বিষয়ে আলাপ আলোচনা চলছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সুপারিশের মধ্যে ছিল যে কোন পণ্য ই ওয়েস্টে পরিণত হওয়ার পর তার দায়িত্ব উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে যেমন নিতে হবে তেমনি কোন পণ্য দ্বারা ক্রেতা বা পরিবেশ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এর দায়িত্ব নেবে। আর ই-বর্জ্য যথাযথা ভাবে পুনর্ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ সরকারকে নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছিল।

Print Friendly, PDF & Email