জামায়াতের সংকট ও পিছিয়ে পড়া

0
381

ঢাকা: কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই নয়, দলের অন্যান্য কর্মসূচিতেও পিছিয়ে পড়ছে জামায়াতে ইসলামী। সামাজিক কার্যক্রম, এমনকি মৃত নেতাকর্মীদের জানাজার নামাজে অংশ নেয়ার সুযোগও হারিয়েছে দলটি। সরকারের নির্দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থানের কারণে পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিবাহ-সাদী এমনকি ঈদের নামাজেও অংশ নিতে পারছেন না দলটির প্রথম থেকে পঞ্চম সারির নেতারা। কেন্দ্র ও মহানগরীর নেতাদের অনেকে পবিত্র জুম্মা’র নামাজও মসজিদে গিয়ে আদায় করতে পারছেন না। এ পরিস্থিতিকে দলটির বেশিরভাগ নেতাই মহাবিপর্যয় বলে মনে করছেন।

তবে দলের কেউ কেউ বলছেন ইসলামী আন্দোলনের সুন্নাতই (নিয়ম) হচ্ছে প্রতিকূলতা। কিন্তু দলটির অভিজ্ঞরা বলছেন এ বিপর্যয়ের একাধিক কারণ থাকলেও মূল কারণ একটিই। আর তা হচ্ছে, নেতারা দলের গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত লক্ষ্য ও কর্মসূচিকে গৌণ মনে করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে অধিক প্রাধান্য দিচ্ছেন, আর একারণেই বিপর্যয়। এতে শুধু নেতারাই নয়, কর্মীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দারুণভাবে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের (জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও ইউনিট শাখার দায়িত্বপ্রাপ্তরা) মধ্যে শতকরা ৯০ শতাংশই বছরের পর বছর ঘরবাড়ি ছাড়া। দলীয় কাজ তো দূরের কথা স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারছেন না বেশিরভাগ নেতাকর্মী।

জামায়াতের গঠনতন্ত্রে বলা হয়েছে- “বাংলাদেশ তথা সারাবিশ্বে সার্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবজাতির কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শিত দ্বীন (ইসলামী জীবন বিধান) কায়েমের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও পরকালীন সাফল্য অর্জন করাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য”।

আর এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দলটি ৪টি কর্মসূচি পালনের কথা উল্লেখ করেছে গঠনতন্ত্রে। এগুলো হচ্ছে- এক. ইসলামী মূল্যবোধের উজ্জীবন ও জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে সর্বপ্রকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক হুমকি এবং বিশৃঙ্খলা হতে রক্ষার প্রচেষ্টা চালানো। দুই. দায়িত্বশীল নাগরিক, চরিত্রবান ও যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে শোষণহীন, ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করে জনসাধারণের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করা। তিন. সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচারের আদর্শ সমুন্নত রাখা এবং ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তার বিধান এবং সর্ব শ্রেণীর মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সম্পদের সুষম বণ্টন, জাতীয় আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নতকরণের মাধ্যমে শোষণ, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। চার. ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা এবং বিশ্বের সকল রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা।

দলটির গঠনতন্ত্রের ৫ নম্বর ধারায় ইসলামের সুমহান আদর্শের দিকে দাওয়াত দেয়া কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধারায় বলা হয়েছে- সাধারণভাবে মানুষ ও বিশেষভাবে মুসলিমদের প্রতি আল্লাহর দাসত্ব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর আনুগত্য করার আহ্বান করা হবে। ইসলাম গ্রহণকারী ও ঈমানের দাবিদারদের প্রতি বাস্তব জীবনের কথা ও কাজের গরমিল পরিহার করে খাঁটি ও পূর্ণ মুসলিম হওয়ার আহ্বান জানানো হবে। সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামের সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করে সমাজ হতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান জানানো হবে।

কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এখন আর দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দাওয়াতী কাজ হচ্ছে না। দলের একজন প্রবীণ কর্মী (যিনি প্রায় ৩০ বছর যাবৎ দলীয় ফাণ্ডে চাঁদা দেন এবং বিশেষ বিশেষ কর্মসূচিতেও অর্থায়ন করেন) অভিযোগ করে বলেন, দলের পদধারীরা এখন ইসলাম প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের চাইতে ব্যক্তি প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেই বেশী মেধা খরচ করেন। ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জন ও রক্ষায় দাওয়াতী কাজ থেকেই শুধু দূরে নয়, দল থেকেও দূরে সরে যাচ্ছেন। আর এজন্য কাগজে কলমে উল্লেখ থাকা নেতাকর্মীদের শতকরা ২০ ভাগকেও কোনো কোনো কর্মসূচিতে পাওয়া যাচ্ছে না।

দলের অভিজ্ঞরা বলছেন, গঠনতন্ত্রে উল্লেখিত কর্মসূচি ও কর্মনীতি থেকে এখন অনেকটা দূরে জামায়াতে ইসলামী। দলটির স্থায়ী কর্মসূচি’র মধ্যে রয়েছে- এক. “বাংলাদেশের সকল নাগরিকের নিকট ইসলামের প্রকৃত রূপ বিশ্লেষণ করে চিন্তার বিশুদ্ধকরণ ও বিকাশ সাধনের মাধ্যমে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুভূতি জাগ্রত করা। দুই. ইসলামকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে আগ্রহী সৎ ব্যক্তিদেরকে সংগঠিত করা এবং তাদেরকে ইসলাম কায়েম করার যোগ্যতা সম্পন্ন হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ দান করা। তিন. ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক সংশোধন, নৈতিক পুনর্গঠন ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধন এবং দুঃস্থ মানবতার সেবা করা। চার. ইসলামের পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠাকল্পে গোটা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাঞ্ছিত সংশোধন আনয়নের উদ্দেশ্যে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সৎ ও খোদাভীরু নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা”।

দলটির সংবিধানের এই অংশে ৪টি কর্মসূচি বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমটিতে দেশের সকল নাগরিকদের কাছে ইসলামের প্রকৃত রূপ বিশ্লেষণ এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুভূতি জাগ্রত করার প্রচেষ্টা চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়। আর চার নম্বর কর্মসূচিতে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে সৎ ও খোদাভীরু নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এক নম্বর কর্মসূচি বাস্তবায়নের চাইতে চার নম্বর (সরকার পরিবর্তন) কর্মসূচি পালনের দিকে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে দলটির বেশীরভাগ নেতাকর্মী। বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটির এক নম্বর কর্মসূচির চাইতে চার নম্বর কর্মসূচিতে বেশী তৎপর হওয়ায় দ্রুতই ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়তে হয়েছে দলটিকে। এছাড়া দলটির বাস্তব শক্তির চাইতে তর্জন-গর্জন ছিলো অনেক বেশী। যেটি পরবর্তীতে কর্মীদেরকে হতাশ করেছে বলে অনেকের অভিযোগ।

অন্যদিকে জামায়াতের স্থায়ী কর্মনীতিতে বলা হয়েছে- এক. কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা কোন কর্মপন্থা গ্রহণের সময় জামায়াত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শুধুমাত্র আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর নির্দেশ ও বিধানের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করবে। দুই. উদ্দেশ্যে ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এমন কোন উপায় ও পন্থা অবলম্বন করবে না যা সততা ও বিশ্বাসপরায়ণতার পরিপন্থী কিংবা যার ফলে দুনিয়ায় ফিতনা ও ফাসাদ (বিপর্যয়) সৃষ্টি হয়। তিন. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সবক্ষেত্রে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করিবে। অর্থাৎ ইসলামের দাওয়ার সম্প্রসারণ, সংগঠন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানুষের মানবিক, নৈতিক চরিত্রের সংশোধন এবং বাংলাদেশকে একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অনুকূলে জনমত গঠন করিবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দলটির স্থায়ী কর্মনীতিতে যেসব কার্যক্রম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে তা করতে কেবল রাজনীতির মাঠ চাঙ্গা করার কোনো দরকার ছিলো না। কিন্তু দলটি অভ্যন্তরীণ মজবুতির চাইতে রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘোষণা ও বাস্তবায়নে বেশী তৎপর হয়েছিল। ফলে ইসলামী আন্দোলনের চাইতে সমাজে রাজনৈতিক দল হিসেবেই বেশী পরিচিতি লাভ করে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে সরকার হঠানোর আন্দোলনে সক্রিয় তৎপরতা চালিয়ে প্রতিদিনই গণমাধ্যমে খবরের শিরোনাম হয়েছে। তৃণমূল কর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপির চাইতে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে বেশী তৎপর হয়ে ওঠে জামায়াত। ঢাকা ছাড়া অন্যসব বিভাগীয় শহরগুলোতে মহাসমাবেশ করে ২০১০ সালেই সরকার পতনের ডাক দেয় জামায়াত। পরে রাজধানীর পল্টন ময়দানে মহাসমাবেশ ঘোষণা করে সরকার পতনের বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ সংবাদ সম্মেলন করে ঘোষণা দেন। কিন্তু প্রশাসনের ১৪৪ ধারা জারির ফলে পল্টনে মহাসমাবেশ করা হয়ে উঠেনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভাগীয় শহরে মহাসমাবেশ ও ঢাকায় মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করেই ২০১০ সালের সারাদেশে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত হয়েছিল। ওই সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে যেকোন মূল্যে পল্টনে মহাসমাবেশ করার ঘোষণা দেয়া হলেও তাতে ব্যর্থ হওয়ায় কর্মীরা হতাশ হন। এর কিছু দিনের মধ্যেই ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে আটক হন দলটির আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ও সেক্রেটারী জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ। পরে তাদেরকে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় এবং ইতিমধ্যে তাদের দন্ড হয়।

আর এরই ধারাবাহিকতায় দলটির বেশিরভাগ শীর্ষ নেতা বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। যারা বাইরে তারাও রয়েছেন আত্মগোপনে। অপরদিকে সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করে সরকার।

এছাড়া দলটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এখনো যারা নিয়োজিত রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধেও কর্মীদের রয়েছে নানা অভিযোগ। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা পরিচালনার জন্য দল থেকে যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা বিভিন্ন সময় দায়িত্ব অবহেলা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। অবশ্য এখাতে দলটির বরাদ্দ ছিল যথেষ্ট। কিন্তু, সেই অনুযায়ী কাজ হয়নি। বরং কেউ কেউ দল বা আদর্শের চেয়ে নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জামায়াতের একাধিক নেতা ও কর্মীর সঙ্গে আলাপকালে তারা এ প্রতিবেদককে জানিয়েছেন- দলের ক্রান্তিকালে যারা অসহযোগিতা ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন তাদের বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে গঠনতন্ত্রের আলোকেই দল পরিচালিত হোক এটাই তারা চান। যাতে মূল কাজের ক্ষতি না হয়।

শীর্ষ নিউজ

Print Friendly, PDF & Email