ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আল্লাহ নাই!

0
573

index
রফিকুজজামান রুমান: দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নানা কারণেই এখন খবরের শিরোনাম। ভাববার কারণ নেই, জ্ঞান-গরিমায় কিংবা গবেষণা-সৃষ্টিশীলতায় অবদানের জন্য তথাকথিত ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হঠাৎ করে পত্রিকার পাতায় জায়গা দখল করেছে! যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের মতো সংগঠন আছে সেখানে মিঠুন চক্রবর্তীর মতো বলাই যায়- “আমরা খবর দেখিনা, খবর শুনি না; খবর বানাই।” খবর বানাতে ছাত্রলীগ বিরামহীন। সেটি তারা করে সাংবাদিকতার একটি প্রচলিত জার্গন ধরেই- “খারাপ খবরই ভালো খবর” (ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ)। শুরুটা প্রয়াত ড. পিয়াস করিমের মৃতদেহ শহীদ মিনারে রাখা নিয়ে। এরপর একে একে ঘটে চলল- দ্বিতীয়বার ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা না-দিতে পারার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ছাত্রলীগের হামলা, নামাজ পড়ার ‘অপরাধে’ হল থেকে ছাত্রীদেরকে ধরে থানায় দেয়া, কার্জন হল এলাকায় বসে থাকার ‘অপরাধে’ বেগ আর্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক ইমতিয়াজ আলম বেগ ও তার দুই ভাগ্নিকে (যাদের একজন ঢাবির আইবিএ’র শিক্ষার্থী ছিলেন এবং অন্যজন একটি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত) লাঞ্চিত করা, এই ঘটনার প্রতিবাদে কেন্দ্রিয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সভা প- করে দেয়া (যেখানে উপস্থিত ছিলেন ড. কামাল হোসেন এবং আরো অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা) ইত্যাদি। ছাত্রলীগের এসব কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরো লজ্জাকর এক খবর। রাজধানীর এক হোটেলে পর্নোছবি বানানোর সময় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে কয়েকজন শিক্ষার্থী যাদের অন্তত পাঁচজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের!
সবগুলোর মধ্যে শুধু ইমতিয়াজ বেগ ও তার ভাগ্নিদেরকে আহত করার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ‘আইওয়াস’ করার মতো হলেও একটা ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। হামলাকারী চারজনকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি সবক্ষেত্রে প্রশাসন নীরব। বিশেষ করে শামসুন্নাহার হলে ফজরের নামাজ আদায় করা এবং সঙ্গে ইসলামী বই থাকার কারণে তিন ছাত্রীকে হল থেকে বহিষ্কার ও তল্লাশির নামে লাঞ্চনার ঘটনা নিয়ে প্রশাসন নির্লজ্জ আচরণ করেছে। খবরে বলা হয়েছে, ২ নভেম্বর রাতে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে ছাত্রলীগের ছাত্রীকর্মীরা রুমে রুমে তল্লাশি চালায় কারা নামাজ পড়ে, কাদের কাছে ‘জিহাদী’ বই আছে এসব দেখার জন্য। নামাজ পড়ার ‘অপরাধে’ কয়েকজন ছাত্রীকে ধরে প্রক্টরের অফিসে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদেরকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়। হল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এক ছাত্রীর কাছে পাওয়া যায় “নারী-পুরুষের পর্দা” নামক একটি বই। তাকে রুমে ডেকে নিয়ে বলা হয়, “তোর কাছে ইসলামী বই আছে, তুই জঙ্গী… এখন তোকে বাঁচাবে কে? এখন তোর আল্লাহ কোথায়?”
প্রিয় পাঠক, আমরা তাহলে বলতে পারি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আল্লাহ নেই। সেখানে কিছু প্রেতাত্মা আছে। আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হচ্ছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ ঠিক করবে কাকে শহীদ মিনারে নেয়া যাবে, কাকে নেয়া যাবে না। ছাত্রলীগ ঠিক করবে কে হলে থাকবে, কে থাকবে না। ছাত্রলীগ ঠিক করবে কে ছাত্রী, কে জঙ্গী। ছাত্রলীগ বলে দিবে বিশ্ববিদ্যালয়ে নামাজ পড়া যাবে কি যাবে না। ছাত্রলীগ বললে “নারী-পুরুষের পর্দা” বইও জঙ্গী বই। ছাত্রলীগ কুরআন শরীফকে জঙ্গী বই বললে তা-ই। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ছাত্রলীগের কথায় উঠসব করবে। প্রশাসন কতোটা মেরুদ-হীন হলে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার দেয়ার সুযোগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের দমাতে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করতে পারে! কোনো ছাত্র/ছাত্রী দেশের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মের বাইরে কোনো কাজ করলে প্রশাসন তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবে। ছাত্রলীগ এই ‘দায়িত্ব’ পালন করে কিসের ভিত্তিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ছাত্রলীগের কাছে লিজ দেয়া হয়েছে? এটি কি কারো পৈত্রিক সম্পত্তি? ছাত্রলীগের কোনো সভা-সমাবেশে না গেলেও প্রথম/দ্বিতীয় বর্ষের সাধারণ শিক্ষার্থীদের হল থেকে বের করে দেওয়া হয়। প্রশাসন থাকে ‘সাক্ষীগোপাল’। কবি আল মাহমুদ সেই কবেই প্রশ্ন রেখেছিলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?” বলতে ইচ্ছে হয়, জি কবি, এখানে ডাকাতদেরই চাষ হয়। নামাজ পড়ার কারণে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদেরকে গ্রেফতার করা হয়/বহিষ্কার করা হয়, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ডাকাতদেরই চাষ হয় না, চাষীরাও হয় ডাকাত। একজন শিক্ষক হবেন সমাজের সবচেয়ে আলোকিত মানুষ, সবচেয়ে ভালো মানুষ। দলীয় কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে নৈতিকতা/বিবেকবোধ বিসর্জন দেওয়া একজন শিক্ষক কোন্ কারিগর হয়ে জাতির ভবিষ্যত গঠন করবেন? ঢাবি’র মাননীয় প্রক্টর স্যার, যে ছাত্রীগুলোকে নামাজ পড়ার কারণে হল থেকে বের করে দিলেন, একবারও তাদেরকে নিজের মেয়ের মতো মনে করতে পারলেন না? দলবাজি করে করে নিজের বিবেককে যতই ভোতা করে ফেলুন না কেন, মেয়েগুলোর কান্না আপনার কঠিন হৃদয়কে এতোটুকু নাড়া দিত পারল না? শিক্ষক অনৈতিক হলে পুরো জাতি পথ হারায়। এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই এক অধ্যাপক ফরেস্ট্রি ছেড়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করতে যাওয়া এক তরুণ শিক্ষককে প্রশ্ন করেছিলেন, “এখানে আসবা কেন? ওখানে (ফরেস্ট্রিতে) থাকলেই তো বেশি মাল কামাতে পারতা!” এই হলো আমাদের দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক!
এই ডাকাতদের গ্রামে আল্লাহ নেই। এর মানে হলো- এখানে নামাজ পড়া যাবে না। কুরআন/হাদিস/ইসলামি বই পড়া যাবে না। এখানে বিশ্বাসের কথা বলা যাবে না। কিন্তু একজন বিশ্বাসী মানুষ প্রশ্নহীনভাবে মেনে চলতে চাইবে আসমানী বাণীকে। তার কাছে কুরআনকে বিশ্বাস করার মানে হলো কুরআন নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করা। কুরআনের বিধানসমূহ জানা এবং সেগুলো মেনে চলা। এখন কুরআন যদি সমাজ বদলের কথা বলে, কুরআন যদি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের কথা বলে, তাহলে তো সেই কাজটিই তাকে করতে হবে। যদি কেই মনে করে কুরআন এগুলো বলেনি, তাকে সেটা প্রমাণ করতে হবে। আর যদি কেউ বলে, সমাজ বদলের জন্য কুরআনের চেয়েও ভালো কোনো রেসিপি তার কাছে আছে, তাহলে সে সেই আদর্শের দিকে মানুষকে ডাকবে। মানুষ যেটি মেনে নেয়। আদর্শের জবাব আদর্শ দিয়ে। কিন্তু দু:খজনক হলো, বাংলাদেশে আদর্শের এই উদারতা নেই। প্রায়ই পত্রিকায় দেখা যায়, জিহাদী বই উদ্ধার। এর মানে কী? জিহাদী বই কি কোনো নিষিদ্ধ বই? তাহলে সবার আগে তো কুরআন নিষিদ্ধ করতে হবে। কুরআনে শতাধিক জায়গায় জিহাদের কথা বলা হয়েছে। কোনো খ্রিষ্টান কিংবা হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে যদি নিজ ধর্মের কোনো বইসহ পাওয়া যায়, তাকে কি গ্রেফতার করা হবে?
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও কলাম লেখক
ইমেইল: rafique.ruman@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email