নির্বাচিত পার্লামেন্ট থাকলে টকশোর প্রয়োজন হতো না

0
602

মিনা ফারাহ: লিখতে লিখতে যদি মোরগ আলীর বারান্দার উল্টো দিকের বঙ্গোপসাগরটা ভরেও ফেলি তার পরও একমাত্র প্রাপ্তি, পরিবেশ দূষণ। এই যেমন আমি। লিখেই চলেছি, পড়ছেটা কে? তবু লিখব, ভোট দিতে চাই, ভোট দিতে দিন, নির্বাচনের বিকল্প উন্নতি নয়, নির্বাচিত পার্লামেন্টের বিকল্প নেই।  জাতি আজ বিপজ্জনক মাত্রায় টকশো-নির্ভরশীল। সাত বছর ধরে টেলিভিশনে হাজার হাজার ঘণ্টা পার করার পরও ‘যেই লাউ সেই কদু’। বহু দূর থেকে একটি অসুস্থ ধারা সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। পাশাপাশি পশ্চিমের ধারা ও দৃষ্টিতে। লক্ষ করছি, ক্রমেই বুদ্ধিকোষগুলোকে ইয়াবার মতো ধ্বংস করা হচ্ছে। আস্ত মগজটাই যেন ব্রেকফাস্টের টেবিলে ডিম ভাজা। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ কখনোই পাবলিক হিয়ারিং নয়, কিন্তু রাগ-অনুরাগে জর্জরিত হয়ে বাংলা শব্দের ড্রোন ফাটানো। টকশোগুলোকে যারাই কাণ্ডারি মনে করেন, হিউম্যান সাইকোলজি সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। মধ্যরাতের শব্দবোমায় মানসিক বৈকল্য তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। অস্থিরতা, উত্তেজনা, আত্মঘাতী বাক্যবাণ, কথার বোমায় জাতি যারপরনাই হতাশাগ্রস্ত। আজকের সংবাদপত্রের মতিউর রহমান চৌধুরী সাত বছর ধরে গেস্টদের একই প্রশ্ন করছেনÑ ‘তাহলে এখান থেকে বের হওয়ার উপায় কী!’ উত্তরটির জন্য সাত বছর অত্যন্ত দীর্ঘ সময়। সাত বছরে মেডিক্যালের ছাত্র ডাক্তার হয়ে রোগী দেখা শুরু করতে পারেন। দেশে নির্বাচিত পার্লামেন্ট থাকলে টকশোর প্রয়োজন এড়ানো যেত।

তৃতীয় বিপ্লবটি ঘটছে নীরবে। ‘১-১১’-এর পর থেকেই টকশোর অভ্যুত্থান ৫ জানুয়ারির অন্যতম কারণ। জাতির ঘাড়ে ‘বিকল্প পার্লামেন্ট’ চাপিয়ে দিয়ে রামরাজত্ব করছে আওয়ামী লীগ। একের পর এক ব্যর্থতা এবং ভোট ডাকাতির ঘটনা চাপা দেয়া হচ্ছে টকশো দিয়ে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশেই পার্লামেন্টের ‘বিকল্প টেলিভিশন’ নয়। টেলিভিশনগুলোও এই মাত্রায় রাষ্ট্রপরিচালিত নয়। আমাদের দেশে দুই দলকে নিয়ে ২৪ ঘণ্টাই টেলিভিশনে বিকল্প পার্লামেন্ট বসে। বিষয়টি রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে বিনোদনের পর্যায়ে চলে গেছে। বলছি, যারা স্টার জলসা দেখেন না, রাত জেগে তারা টকশো দেখেন।
এখানে পৌঁছেছি ১৫তম সংশোধনীর গাড়িতে চড়ে। ওই সংশোধনীর উদ্দেশ্য, দীর্ঘমেয়াদে ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া। ষড়যন্ত্রটি ছিল আন্তর্জাতিক ও সুদূরপ্রসারী। ভাজা ডিম মস্তিষ্কের ভোঁতা বাংলাদেশীরা ধরতে পারেনি। খেয়াল করুন, মধ্যরাতে বাক্যবাণের ড্রোন। রাজনৈতিকভাবে কতটা পঙ্গু হলে বিরোধী দল এবং সরকারি দলকে বছরের পর বছর একই বাগ্যুদ্ধ করতে হয়! একদল হোস্টের ডাইনে, অন্য দল বাঁয়ে, মধ্যখানে স্পিকার। কখনো কখনো দুই দলের মধ্যে লাইভ মারামারিও হয়। বিকল্প পার্লামেন্টের গেস্টদের শিডিউলে অনেকেরই দিনে এক ডজন টকশো। টিভি মালিকদের পোয়াবারো। গ্রামীণফোন তো আমাদের মাথায় হাজার হাজার কোটি টাকার কাঁঠাল ভেঙে খাচ্ছে বহু বছর। মধ্যরাত হলেই জমে ওঠে ‘বাংলাদেশের স্টার জলসা’। বিবিসি সংলাপে স্পিকার, মন্ত্রী, এমপি, বিরোধী দল, আমজনতা- সব পাওয়া যায়। এমনকি আমাদের না-পছন্দ পাকিস্তানেও নির্বাচিত পার্লামেন্ট আছে। সেখানে বিরোধী দলের সক্রিয় ভূমিকা। আমাদের বিরোধী দলটি গেল কোথায়?
এবার জমিদারি স্টাইলে দখলে ব্যস্ত ক্ষমতাসীনেরা। এভাবে চলতে দিলে মধ্যপ্রাচ্যের মতো সঙ্ঘাত এবং গৃহযুদ্ধের মেঘ। আমজনতার গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে কথা। ভোটের বিকল্প ভোট। ভোট একটি জাতির বিশ্বাসের স্তম্ভ। মানুষ তাদের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে অত্যন্ত উদগ্রীব। যত বড়ই হোন, মৌলিক অধিকার ব্যক্তির জমিদারি নয়। একবিংশ শতাব্দীতে আমরাও কেউ প্রজা নই। কৃষকের জমি কৃষকের কাছেই ফিরিয়ে দিতে হবে। টকশোর পরিবর্তে জাতীয় সংসদেই দুই দলের আলোচনা হবে।
ব্রিটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুল
যেকোনো রাষ্ট্রকে দুর্বল করতে চাইলে তিনটি জায়গায় আঘাত করতে হয়- সেনাবাহিনী, মেধা ও আত্মবিশ্বাস। আমরা দেখেছি, তিনটি ক্ষেত্রেই যেকোনো স্বৈরাচারের রেকর্ড ভঙ্গ করা হয়েছে এ আমলে। মৌলানা আবুল কালাম আজাদ ব্রিটিশদের বলেছিলেন, ‘তোমরা মুসলিম লীগকে কংগ্রেস আর কংগ্রেসকে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দিয়ে ভারতবর্ষে টিকে আছো। আমরা যদি এক হতাম, এই দেশে তোমাদের জায়গা হতো না।’ ব্রিটিশের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ ঐতিহাসিক সত্য। উপনিবেশবাদীদের মহাকাব্য একটি কলামে সম্ভব নয়। ইংরেজরা যে কৌশলে হিন্দু-মুসলমানদের বিভক্ত রেখে ভারতবর্ষে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেছিল, নির্বাচিত পার্লামেন্টের মৃত্যু ঘটিয়ে সেটাই করছে আওয়ামী লীগ। ব্রিটিশের প্রেতাত্মা ভর করেছে এখানে। ওরা ব্যবহার করেছিল ধর্ম, এরা করছে আদর্শবাদ। আদর্শের চাদরে ৫৬ হাজার বর্গমাইলকে কব্জা করে পরিকল্পিতভাবে ২০ দলকে নিঃশক্তি করছে। ব্রিটিশের মতোই তাদের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী। গণতন্ত্রের একটি মিসাইলের ভয়ে দেশজুড়ে রেডফোর্ট সৃষ্টি করেছে। সেখান থেকে গোলাবারুদ ছুড়ে ৫ জানুয়ারি কায়েম করেছে। বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবীর শরীরে আদর্শের কম্বল। আমাদের যাওয়ার জায়গা ফুরিয়ে গেছে। চীন, রাশিয়া, ভারত, জাপান যার যার স্বার্থে অবৈধ সরকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছে, অন্যথায় আওয়ামী লীগ এই অসম্ভবকে কিছুতেই সম্ভব করতে পারত না।
কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ এক হতে চাইলেই উইনস্টান চার্চিলের গোদে পাড়া পড়ত। দূত পাঠিয়ে একবার জিন্না, আবার নেহরুর কানে মন্ত্র দিতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজের শক্তি শেষ না হলে, ব্রিটিশ কখনোই ভারত ছাড়ত না। বাধ্য হয়ে এমনভাবে দেশ বিভাগ করল, যেন কেউ শান্তিতে থাকতে না পারে। ৬৯ বছর আমরা কেউই শান্তিতে নেই। ব্রিটিশ যাওয়ার পর থেকে প্রায় এক ডজন দাঙ্গা-যুদ্ধ, আরেকটি দেশ বিভাগ এবং কয়েকটি গণহত্যার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। সঠিক সংখ্যা বের করলে ব্রিটিশকেন্দ্রিক গণহত্যা, বিশ্বের প্রথম ১০টি গণহত্যার একটি হতে পারত, কিন্তু হয়নি। অ্যানালগ পৃথিবীতে যা সম্ভব, ডিজিটাল পৃথিবীতে তা অসম্ভব। তা সত্ত্বেও ব্রিটিশের ডিভাইড অ্যান্ড রুলের স্টিমরোলার চালিয়ে গণতন্ত্রের পথ উড়িয়ে দিয়েছে বর্তমান গদিনসিন দলটি।
একটি নির্বাচিত পার্লামেন্ট না থাকলে যা হয়; ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে অর্থনীতি, বিনিয়োগ প্রায় শূন্য। একমাত্র সার্ভিস ছাড়া শিল্প নেই। কর্মসংস্থান বলতে প্রবাসী শ্রমিক। যে দিকেই তাকাই, শ্রমিক দিয়ে সয়লাব। উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শ্রমিকের সংখ্যা। পোশাক আর প্রবাসী শ্রমিক না থাকলে হয়তো ’৭৪-এর পুনরাবৃত্তি হতো। এভাবে চলতে দিলে, পশ্চিমাদের জন্য পোশাক বানিয়ে যাবো; কিন্তু নিজের গায়ে একটি শার্টও জুটবে না। যত দিন মানুষ গরিব থাকবে, মূর্খ থাকবে, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না। ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হওয়ার ৬৯ বছর পর ডিভাইড অ্যান্ড রুল যেভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, অতীতে গণতন্ত্রকামী আওয়ামী লীগের কারণেই দেশ ৬৯ বছর পিছিয়ে গেছে। তাদের সব মেডিসিন শেষ। অবৈধ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ডিভাইড অ্যান্ড রুল একমাত্র অস্ত্র। অন্যথায় কেমোথেরাপিতেও ক্যান্সার সারবে না। একমাত্র নির্বাচিত পার্লামেন্টই হতে পারে অল্পমূল্যে সহজ মেডিসিন।

আওয়ামী লীগের দায়
নির্বাচিত পার্লামেন্ট না থাকলে চালে-ডালে খিচুড়ি খাই। বিভিন্ন বিতর্ক সৃষ্টি করে সত্যকে ধামাচাপা দিই। ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে আরেকটি রণক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। গ্রহমানবেরা বিভিন্ন থিওরি আনছেন। কয়েকটাকে ফাঁসিতে ঝোলানো শেষ। বাকিগুলোকে ঝোলানোর জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের লবি হচ্ছে। কিন্তু আসল কথা আওয়ামী লীগ বলছেই না। ১৫ আগস্টের জন্য দায়ী কে? ইতিহাস নিয়ে ছিনিমিনি খেললে যা হয়। আওয়ামী লীগ যদি অন্যদের পশ্চাৎদেশ বাদ দিয়ে নিজের চরকায় তেল লাগাত, চতুর্থ ও ১৫তম সংশোধনীর প্রয়োজন হতো না। ১৫ আগস্টের জন্য কি তারা নিজের দায় এড়াতে পারবেন? এত দ্রুত ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে? ওই সাড়ে তিন বছরে যারা তরুণ, আমার মতো অনেকেই স্মৃতির ক্যান্সারে আক্রান্ত। ওই আমলে মনোজগতের যে ক্ষতি করেছিল, আগামী ৪০ বছরেও পূরণ হবে না। আমরা বিস্ময়ের সাথে দেখেছি, সাড়ে তিন বছরের দমনপীড়ন অতীতের ২৪ বছরের তুলনায় বেশি। সদ্য স্বাধীন জাতি এই মাত্রায় বিশৃঙ্খলা আশা করিনি। ভুলে যাইনি, রক্ষীবাহিনী আর মুজিববাহিনীর ত্রাস। তিন বাহিনীর বন্দুকযুদ্ধে নাকাল মানুষ।
এখানে জওয়াহেরলাল নেহরু এবং ম্যান্ডেলার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। সদ্য স্বাধীন দেশটাকে কিভাবে শাসন করেছিলেন তারা? কিভাবে করেছি আমরা! গণতন্ত্র এবং অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য যা প্রয়োজন, জাতিকে পক্ষ-বিপক্ষমুক্ত রেখে কোনোটাই বাদ দেননি নেহরু ও ম্যান্ডেলা। জাতিকে তারা এক করেছেন, আমরা টুকরো টুকরো করেছি। ওই সাড়ে তিন বছরে বিশৃঙ্খল বিপ্লবে অতিষ্ঠ মানুষ। রক্ষীবাহিনী, গণবাহিনী, মুজিববাহিনী, সর্বহারা, দুর্ভিক্ষ, এসব ম্যান্ডেলা-নেহরুর বিপরীত দৃষ্টান্ত। তখন উপনিবেশ নয়, ধর্ম নয়, যুদ্ধবিধ্বস্ত জাতির বিরুদ্ধে ক্ষমতার মোহে অন্ধ কিছু লোকের আগ্রাসন। আগুনে পানি ঢালার বদলে বারবারই পেট্রল ঢালা। বিভিন্ন বাহিনীর অত্যাচারে রাস্তাঘাটে লাশ, কেউ অস্ত্রের মুখে, কেউ দুর্ভিক্ষের কবলে। নিক্সন, ভুট্টো, মাও বনাম ঠাণ্ডাযুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধী আর ব্রেজনেভ। ওই বিপ্লবটি ছিল আলেন্দের মৃত্যুর চেয়ে জটিল। রক্ষীবাহিনী ও মুজিববাহিনী ছিল একেবারেই কাঁচা হাতের কাজ। যেমন- আজ র‌্যাবের যন্ত্রণায় অস্থির মানুষ, সোচ্চার পশ্চিমারা। মুজিববাহিনীর কর্মকাণ্ডে তখন ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিল পশ্চিমারা। সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানের পেছনের খবর অনেকেই জানে। তখন মিনিটে মিনিটে পদবি বদল। ’৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে যে সংবিধান কায়েম করল, বলতেই পারি, ১৫ আগস্টের জন্য অনেকটা দায়ী সেটি। বাকশাল মানেই একদলীয় শাসন। দলের ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে সত্য লুকাতে চান। সত্য সব সময়ই কঠিন।

আজ যারা আরেকটি ১৫ আগস্টের সতর্কবাণী দিচ্ছেন, তাদের উচিত আরেকটি ১৫ আগস্ট এড়িয়ে যাওয়া। ১৫ আগস্ট অবশ্যই কুদৃষ্টান্ত। তার মানে এটা নয়, রশিদকে এনে ফাঁসি দিলে কিংবা জিয়াকে কবর থেকে তুলে এনে বিচার করলে আসল ঘটনা ধামাচাপা দেয়া যাবে। যে জাতি নেতার প্রতিটি কথায় সাড়া দিয়ে ৬ দফা, ১১ দফা, ’৬৯ করেছিল; সেই জাতি কোন দুঃখে বাকশাল গ্রহণ করবে! ৫ জানুয়ারিও গ্রহণ করবে না, যেমন করেনি ২৫ জানুয়ারি। যে জাতি মুজিবের কথায় ’৬৪ থেকে ’৭১ পর্যন্ত ছুটে চলেছিল, তাদের জন্য চতুর্থ এবং ১৫তম সংশোধনী বজ্রাঘাতের সমান।
২৫ জানুয়ারির তুলনা ৫ জানুয়ারি। চতুর্থ সংশোধনীর তুলনা ১৫তম সংশোধনী। একটি জাতিকে বারবার উত্তপ্ত করলে, তারাই বা কোথায় যাবে! ২৫ ও ৫ জানুয়ারিতে গণতন্ত্রের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বাক্সবন্দী করা হলো। বলতেই পারি, ’৭৪ সালে ভূমধ্যসাগর থেকে খাদ্য জাহাজ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন নিক্সন। এবার রাশিয়া আর বাংলাদেশকে একসাথে জিএসপি থেকে বের করে দিলো। পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশ পরিত্যক্ত। রাশিয়ার ওপর দারুণ নাখোশ ওবামা। কিসিঞ্জারের ১৯ ঘণ্টা ঢাকা সফর আর বার্নিকাটের ক্রিকেট খেলা কী বার্তা দিচ্ছে, জানি না। তবে জানি, নির্বাচিত পার্লামেন্ট থাকলে কাউকেই বিপথগামী হতে হতো না।

পররাষ্ট্রনীতি
টেলিভিশন, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, শিক্ষাঙ্গন- সবখানেই মন্ত্রী। প্রত্যেকেই মন্ত্রীর ভাষায় কথা বলছেন। এর মূলে নির্বাচিত বিরোধী দলের অনুপস্থিতি। নির্বাচিত বিরোধী দল কথা বললে কাউকে এত কথা বলতে হতো না। অর্থের লোভে শিক্ষা, আত্মমর্যাদা বিসর্জন দেয়া শেষ। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কী! মুক্তবাজার অর্থনীতির বিশ্ব, দুই দেশকেন্দ্রিক। এর মূলে অর্থ আর সমরশক্তি। এককালের কমিউনিস্ট চায়না এখন দুই নম্বর, আসলে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র। আমেরিকা ও চায়না দু’জন সম্পর্কের দিক দিয়ে দা-কুমড়া। দু’ভাগে বিভক্ত বিশ্বের এক ভাগ আমেরিকার, অন্য ভাগ চীনের। একমাত্র বাংলাদেশই ব্যতিক্রম। এরা গাছেরও খাবে, তলেরও কুড়াবে। তোফায়েলরা জিএসপি চান আবার চায়নাকে সব দিয়ে দিতে চাচ্ছেন। এ দিকে চীনকে শায়েস্তা করতে ভারতকে পুবের মোড়ল বানিয়েছে আমেরিকা। চীন অনেক দেশের জন্য বিপজ্জনক। ভারত আর চীন বনাম ভারত আর পাকিস্তান একই রকম শত্র“। চীনের হাত থেকে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াকে রক্ষা করে আমেরিকা। সেই লক্ষ্যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র ও সৈন্য মজুদ রেখেছে ওই অঞ্চলে। সামান্য বিচ্যুতি ঘটলেই খরগোশের মতো চীনের পেটে ঢুকে যাবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশ। আবার রাশিয়াকেন্দ্রিক ভারত কিছুতেই চায় না, চীন এ দেশে ‘উপনিবেশের নোঙর’ করুক। চীনের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে তল্পিবাহক বানাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঝুড়িতে ভরে প্রস্তুত। সেটা সম্ভব হলে ভারতের নিরাপত্তা বিপন্ন হবে। বঙ্গোপসাগরসহ কয়েকটি গভীর বন্দর এই অঞ্চলের ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমেরিকা চাইছে ‘ঝি মেরে বউকে শিক্ষা দিতে’। অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে মোদিকে বুকে আগলে ধরেছে ওয়াশিংটন। ওয়াশিংটনের সাথে মোদির সরাসরি লাইন চালু হয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা ভারতকে শক্তিশালী করছে। আর ভারত-আমেরিকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশকে শক্তিশালী করছে চীন। সবার চোখ বঙ্গোপসাগরের দিকে। সাগরের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, এই অঞ্চলের ক্ষমতা তার হাতে। বাংলাদেশ খেলছে বিগ-বি বেল্টের সাপ খেলা (বঙ্গোপসাগর-ভিত্তিক জোন)। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ভ্রান্তিবিলাস। অতীতের মতোই ভুল নীতিতে আবারো লেজেগোবরে হতে পারে! সবার আগে ঠিক করতে হবে, কোন ব্লকে যাবে। চীন-আমেরিকা দুই ব্লককেই আঁকড়ে ধরলে লাভ হবে না। শুধু নির্বাচিত পার্লামেন্টের অভাবে দিশেহারা মন্ত্রণালয়গুলোর দৈন্যদশা।

নির্বাচিত বিরোধী দল

সব রোগের এক ওষুধ নয়। ‘গাছেরও খাবো তলেরটাও কুড়াব’ নীতি বাদ না দিলে ক্রসফায়ারের প্রয়োজন আরো বাড়বে। দমন-পীড়ন-শোষণ বাড়বে। বেশি উন্নতির ধূম্রজাল ছড়িয়ে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতিকেই উসকে দেয়া হবে। বিপ্লব আর রক্তপাত দেখতে দেখতে আমরা ভীষণ ক্লান্ত। চাই ‘আলীবাবা চল্লিশ চোরে’র বদলে স্বচ্ছ নির্বাচন। এ জন্য বিরোধী দলের অস্তিত্ব মানতে হবে। জামায়াত ১০ শতাংশ মানুষের দল, যদি অন্যায় করে থাকে, নিরপেক্ষ বিচার হবে। কিন্তু নিষিদ্ধ করার মনমানসিকতা মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপট তৈরির আমন্ত্রণসুলভ। শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রয়োজনে সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করবেন, প্রধানমন্ত্রিত্ব চান না। ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিবও এ কথাই বলেছিলেন। ভোটের বাক্সে দ্রুত প্রমাণ দেখতে চাই। স্বচ্ছ নির্বাচনের একটাই পথ, ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন নয়। তার অধীনে নির্বাচনের উদ্দেশ্য শিশুও জানে। যেকোনো মূল্যে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে, যত প্রয়োজন জল ঘোলা করা হবে। গণতন্ত্র এবং মানুষের যে পরিমাণ ক্ষতি হলো, তোফায়েলরা জানেন, মানুষ ভুলে যাবে না। তাই সেই আমলের চেয়ে দমন-পীড়ন-শোষণের মাত্রা বেশি। বেশি উন্নতির ধুয়া দিয়ে দুর্বল করছে গণতন্ত্র। বিএনপির মতো বিশাল একটি বিরোধী দলকে কফিনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের এমনভাবে ধরপাকড়, যেন তস্কর ঢুকে পড়েছে। বন্দী নেতাকর্মীদের পরিবার তছনছ হয়ে যাচ্ছে। অবস্থা এমন, হয়তো হিটলারও ভুল করে এ দেশে ঢুকলে ভয়ে পালিয়ে যেত। আর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে দশম পার্লামেন্টের দৃষ্টান্ত থাকলে দেখাতে হবে জাতিকে।
বাংলাদেশ আজ যে রোগে আক্রান্ত, ওষুধ একটাই, ক্ষমতার মোহমুক্ত হয়ে নির্বাচন দিতে হবে। কারণ, এই দেশ কোনো জমিদারের কাছে বর্গা দেয়া হয়নি। জোর করে কৃষকের জমি দখল করা সামন্ত যুগের মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিমের ফিউডালিজম শেষ হয়ে গেছে ২০০ বছর আগে। আমাদের হয়েছে ১৯৪৯ সালে। ফিউডালিজম সহ্য করবে না গণতন্ত্রকামী মানুষ। বোঝা উচিত, জমিদারি মানসিকতা ত্যাগ না করলে উত্তেজিত হতে বাধ্য হবে পাবলিক। ভোট দেয়ার অধিকার সবার। সরকার নির্ধারণ করতে পারে না- কে দেবে, কে দেবে না। কেন্দ্রগুলোতে বারবার সন্ত্রাসের দৃষ্টান্ত বরদাশত হবে না। উন্নতি চাই, কিন্তু সবার আগে গণতান্ত্রিক অধিকার ফেরত চাই। রওশনমার্কা নয়, প্রকৃত বিরোধী দল চাই। গাফফার চৌধুরী বলেছেন, ‘বেশি উন্নতির স্বার্থে প্রয়োজনীয় বিরোধী দল তৈরি করা হয়েছে।’ প্রয়োজনীয় বিরোধী দল মানে? চৌধুরীকে দোষ দেবো না। তারই মতো অনেক লবিস্ট সৃষ্টি করে গণতন্ত্রকে জিম্মি রেখে মজা লুটছে একটি মহল। যত দ্রুত নির্বাচিত পার্লামেন্ট বসবে, তত দ্রুত বিরাজমান অস্থিরতা কমবে। তত দ্রুত ক্রসফায়ারের প্রয়োজন কমবে। নির্মল সেন চেয়েছিলেন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি, এখন চাইছি জরায়ুর নিরাপত্তা। ক্ষমতার মোহমুক্ত হয়ে ভোটারদের সাংবিধানিক অধিকার ফিরিয়ে দিতেই হবে। দ্রুত পার্লামেন্ট বাতিল করে নির্বাচন দিয়ে দেশের মানুষ বাঁচান।

ই-মেইল: farahmina@gmail.com

Print Friendly, PDF & Email