রাজধানীর উত্তরায় জাপানি নারীকে খুনের পর লাশ গুম

0
210

ঢাকা: রাজধানীর উত্তরায় এক জাপানি নারীকে হত্যার পর লাশ গুমের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ওই নারীর নাম হিরোয়ি মিয়েতা। তার বয়স আনুমানিক ৫৫। হত্যার পর তার লাশ উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের খালপাড় কবরস্থানে মুসলমান পরিচয়ে দাফন করা হয়েছে। কবর থেকে তার লাশ তুলে ময়নাতদন্তের জন্য আদালতে আবেদন করেছে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ। এছাড়া তাকে ব্যবসায়িক কারণে হত্যা করা হতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশের উত্তরা বিভাগের ডিসি বিধান ত্রিপুরা সোমবার রাত সোয়া ৯টায় বলেন, ‘একটি ঘটনা আছে। তবে এখন বলতে চাচ্ছি না। আগামীকাল (আজ মঙ্গলবার) ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।’
জানা গেছে, ওই নারী পেশায় বায়িং হাউসের ব্যবসায়ী ছিলেন। ২০০৬ সালেই তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে অবৈধভাবে বাংলাদেশে ছিলেন। সিটি হোমসে তার ৫-৬ লাখ টাকা বকেয়া ছিল। জাপানি এই নারীকে হত্যা ও তার লাশ গুমের ঘটনায় উত্তরা পূর্ব থানায় রোববার রাতে মামলা করেছে পুলিশ। দণ্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় করা মামলার নম্বর ১১। বাদী উত্তরা পূর্ব থানার অপারেশন অফিসার মিজানুর রহমান। এ ঘটনায় অন্তত ৮ জনকে আটক করেছে পুলিশ। যাদের মধ্যে কমপক্ষে চারজনই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। থানা পুলিশ কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করছে। তারা গণমাধ্যমের কাছে বিষয়টি চেপে যাচ্ছেন। এ বিষয়ে ডিএমপির উত্তরা বিভাগ ও থানার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথমে চেপে গেলেও রাতে মুখ খোলেন।

সূত্র জানায়, হিরোয়ি মিয়েতা উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরে ১৩/বি নম্বর সড়কের ৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে সিটি হোমস নামে একটি ডরমেটরিতে থাকতেন। তবে আগস্ট মাসে ওই নারীকে সেখান থেকে সরিয়ে ভাটারা থানা এলাকার একটি বাসায় রাখেন তার ব্যবসায়িক পার্টনাররা। হিরোয়ি প্রতিদিন জাপানে বসবাসরত মাকে টেলিফোন করে নিজের অবস্থা জানাতেন। ২৬ অক্টোবর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ। ফলে মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে তার মা বিষয়টি ঢাকায় জাপান দূতাবাসকে অবহিত করেন। জাপান দূতাবাসের পক্ষে ভাইস কাউন্সিলর কুসুকি মাৎসুনা প্রথমে বিষয়টি থানা পুলিশকে মৌখিকভাবে জানান। পরে ১৯ নভেম্বর উত্তরা পূর্ব থানায় হিরোয়ি নিখোঁজ থাকার বিষয়ে তিনি একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। যার নম্বর-৯৩৫। সাধারণ ডায়েরির পরপরই তৎপর হয়ে ওঠে পুলিশ। ঘটনার অনুসন্ধান করতে গিয়ে প্রায় ৪ দিন পর প্রযুক্তিগত তদন্তের মাধ্যমে পুলিশ নিশ্চিত হয় ওই জাপানি নারী আর বেঁচে নেই।
পুলিশ সন্দেহভাজন অন্তত ৮ জনকে আটক করে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এর মধ্যে কয়েকজন সিটি হোমসের বোর্ডার ও কর্মকর্তা। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাদের মুখ থেকেই বেরিয়ে এসেছে ভয়াবহ তথ্য। হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে রোববার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে। একই সঙ্গে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী সাহান হককে তদন্তভার দেয়া হয়। এ বিষয়ে জানার জন্য সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় কাজী সাহানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, একটি মামলা হয়েছে। তবে সেটা কী আমি পুরোপুরি বলতে পারব না। আমি বাসায় আছি। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি। এরপর থেকেই থানা পুলিশের রহস্যজনক আচরণ শুরু হয়। তারা যুগান্তরের সাংবাদিকদের কাছে মামলার নথি ও সাধারণ ডায়েরির তথ্য গোপন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে জাপানি নারীর লাশ গুমের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় উত্তরা পূর্ব থানার ওসি আবু বকর মিয়ার কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি বলেন, আজ (সোমবার) কোনো মামলা হয়নি। আগে হয়েছে কিনা সেটা জানাতে হলে থানায় গিয়ে বলতে হবে।

সন্ধ্যা ৭টায় উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার সোহেল রানার কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রথমে বিরক্তি প্রকাশ করেন। এরপর বলেন, ‘এ বিষয়ে ওসি সাহেব বলতে পারবেন। আমি এখন টেনিস খেলে এসেছি। আমাকে ফ্রেশ হতে হবে।’

রাত সাড়ে ১০টার দিকে ওসি আবু বকর মিয়া বলেন, হিরোয়ি মিয়েতা নামে জাপানি ওই নারী দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। ২৬ অক্টোবর তার মায়ের সঙ্গে তিনি সর্বশেষ কথা বলেন। এরপরই তার মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ১৯ নভেম্বর জাপান দূতাবাসের পক্ষ থেকে ওই নারী নিখোঁজ বলে থানায় জিডি করা হয়।

জিডি অনুসন্ধানে তথ্যসংগ্রহ ও তার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ বাদী হয়ে রোববার রাতে হত্যা ও লাশ গুমের মামলা করে। এতে ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তকালে জানা যায়, ওই জাপানি নারী নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। ওসি আরও বলেন, মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ণয়ের জন্য লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ হচ্ছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

সিটি হোমসের নিরাপত্তা কর্মী আজাদ বলেন, ২-৩ দিন আগেই এ বাড়ি থেকে কয়েকজনকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কেন তাদের নেয়া হয়েছে সেটা আমি জানি না। আমি নতুন এসেছি।

রাত ১০টার দিকে উত্তরার সিটি হোমস নামে ওই ডরমেটরিতে গিয়ে হিরোয়ি মিয়েতা সম্পর্কে জানতে চাইলে সেখানকার কর্মকর্তারা কেউ মুখ খোলেননি। উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ জানায়, তদন্তকালে প্রথমে পুলিশের কাছেও সিটি হোমসের কর্তারা হিরোয়ি মিয়েতার বিষয়টি গোপন রাখে। তবে পরে তারা হিরোয়ি মিয়েতার বিষয়ে পুলিশকে তথ্য দেয়।

Print Friendly, PDF & Email