সংলাপ প্রত্যাখ্যান, রাজনীতি কোন দিকে

0
470

নিউজ ডেস্ক: দেশে একের পর এক খুন হচ্ছে। খুন হওয়ার পর সরকার এবং মাঠের বিরোধী দল পরস্পরকে দোষারোপ করেছে। দেশে চলছে গণগ্রেপ্তার, থেমে নেই হত্যা। রাজনৈতিক ভাবে বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা না আসলে খুনখারাবি বন্ধ হবে না বলে মানে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বর্তমানে দৃশ্যত রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত বলে মনে হলেও ভেতরে ভেতরে চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশে আইনের শাসন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, বিচার ব্যবস্থা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গুলোর অবস্থানও নাজুক, বাকস্বাধীনতা সংকুচিত। বিরোধী জোটের সংলাপ ও নির্বাচনের দাবিকে সরকার উপেক্ষা করে আসছে। ফলে রাজনীতিবিদদের একগুয়েমিতে দেশ সংকটে এগিয়ে যাচ্ছে। সংকটের গভীরতা বিবেচনায় ‘পরিস্থিতি এমন যে, বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার পথে চলছে।’ বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতি বক্তব্য-বিবৃতি মধ্যে সীমাবদ্ধ। সংসদের বিরোধী দলের নেই তেমন কোন কর্মসূচি। আর মাঠের  বিরোধীদল বিএনপি রাজনীতি এখন ডেস্ক কেন্দ্রীক। বিএনপি নেতারা মনে করছেন, খালেদা জিয়া দেশে ফিরে রাজনৈতিক কর্মসূচি দিবেন।

চলমান সংকট নিরসনে শিগগিরই রাজনৈতিক দলগুলো গঠনমূলক সমালোচনায় না বসলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ। তিনি বলেন, সংলাপ হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে, বিষয়টি তাও নয়।

বর্তমান সংকটের উত্তরণের একটিই পথ, আলোচনা। আর তা না হলে দেশে সংঘাত-সংঘর্ষ অনিবার্য। পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, তাও আমরা জানি না। আমরা মনে করি, বর্তমান যে সংকট চলছে তা রাজনৈতিক। তাই রাজনীতিবিদদেরই এ সংকট সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। তার মতে, দেশের অর্থনীতি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।একের পর এক অর্থনৈতিক সূচক নিচের দিকে নামছে।

দেশ ক্রমাগত গভীর সংকটের দিকে এগুচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাজ্য সফররত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আর এই সংকট উত্তরণে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনতিবিলম্বে একটি নির্বাচনের আয়োজন এখন জরুরি বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে বেগম জিয়া বলেন, “ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমরা জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছি, সর্বদলীয় বৈঠকের কথাও বলেছি। আমি বারবার জাতীয় সংকট মোকাবেলায় জরুরিভাবে জাতীয় সংলাপের আহবান জানিয়েছি আন্তরিকভাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য যে, সরকার আমাদের সে দাবির প্রতি এখন পর্যন্ত কর্ণপাত করেনি।”

সঠিক নির্বাচন দেয়ার আগে জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন বিকল্পধারা সভাপতি প্রফেসর একিউএম বদরুদ্দোজ্জা চৌধুরী।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, এতদিন আপনারা যে অন্যায় করেছেন তার জন্য মাটিতে নেমে আসুন। জনগণের মাঝখানে নেমে এসে কথা বলুন। কথা বলে আবার সঠিক নির্বাচন দেয়ার আগ পর্যন্ত জাতীয় সরকার গঠন করুন। এটাই দেশরক্ষার একমাত্র পথ।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে কাজী জাফর আহমদের নাগরিক স্মরণ সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জাতীয় সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো। শাসক দলটির নেতারা বলেছেন, সংলাপে বসতে হলে যোগ্যতা, সাহস এবং পরিবেশ লাগে। বিএনপির কিছুই নেই। তারা সংলাপের পরিবেশও রাখেনি। শরিক দলের নেতারা বলছেন, জামায়াত, জঙ্গি ও যুদ্ধাপরাধীদের ত্যাগ করে এমন প্রস্তাব দিলে বিবেচনা করা যেতে পারে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জাতীয় সংলাপের প্রস্তাবকে ‘রাবিশ’ বলে উড়িয়ে দিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। শুক্রবার সকালে নগরীতে একটি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি।

এ সময় সাংবাদিকরা তার কাছে খালেদা জিয়ার সংলাপ প্রস্তাব সম্পর্কে জানতে চান। জবাবে অর্থমন্ত্রী ‘রাবিশ, রাবিশ’ বলে মন্তব্য করেন। এরপরই দ্রুত গাড়িতে উঠে যান মুহিত।

সংলাপ প্রসঙ্গে ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশের পরিস্থিতি নাজুক করার জন্য জামায়াত-বিএনপি অবিরত চেষ্টা করে যাচ্ছে। একটি নির্বাচিত সরকারকে বিব্রত এবং বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে। দেশে সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটছে সবই তাদের পরিকল্পনায় ঘটছে। কাজেই ওরা কোন মুখে সংলাপের কথা বলে।

বিএনপি-জামায়াত জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশয় দিচ্ছে অভিযোগ করে নাসিম বলেন, ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে, যুদ্ধাপরাধীদের রায় বাস্তবায়নে বিঘœ সৃষ্টি করতে জামায়াত-জঙ্গির যোগসাজশে বিএনপিই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। কাজেই ওদের সঙ্গে কোনো আপস নয়, সংলাপ নয়।

শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাগর-রুনী মিলনায়তনে ডিআরইউ সদস্য লেখকদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যে খালেদা জিয়ার সংলাপ প্রস্তাবের জবাব দেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, সংলাপে বসতে হলে যোগ্যতা লাগে, সাহস লাগে। যোগ্যতা ছাড়া সংলাপ হয় না। আন্দোলন করার যাদের শক্তি নেই, তারাই এখন ঘন ঘন সংলাপের কথা বলেন।

সংলাপের আহ্বান নাকচ করে ওবায়দুল কাদের বলেন, বিদেশের মাটিতে বসে বিক্ষিপ্ত ঢিল ছুড়ে কি সরকার পতন সম্ভব? জাতীয় সংলাপ এভাবে হবে না। সংলাপ করতে হলে পরিবেশ রাখতে হবে। কারা লেখক, পুলিশ, বিদেশি হত্যা করছে? এভাবে কী সংলাপের পরিবেশ হয়?

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, আওয়ামী লীগ সব সময়ই সংলাপ তথা আলাপ-আলোচনায় বিশ্বাসী, ঐক্যে বিশ্বাসী। প্রমাণ হিসেবে তিনি খালেদা জিয়াকে দেয়া দুদফা সংলাপে আহ্বানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য নানা প্রচেষ্টা চলছে। সরকারকে চাপে ফেলার অপেচেষ্টা চলছে। যারা এসব করছে, যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে, আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে তাদের সঙ্গে সংলাপ করে কি লাভ হবে ?

কি উদ্দেশ্যে সংলাপ- এ প্রশ্ন রেখে হানিফ বলেন, বিএনপি সংলাপ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করেছে। এখন বিএনপি দেশবাসীর কাছে জানাক, তারা কি উদ্দেশ্যে সংলাপে বসতে চায়?

Print Friendly, PDF & Email