নজরদারি নয়, আলেমদের স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করার সুযোগ দিন: আল্লামা শফী

0
243

ঢাকা: হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী সরকারের উদ্দেশ্যে বলেছেন, দেশ থেকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকে নির্মূল করতে আপনারা যদি প্রকতৃই আন্তরিক হন, তবে মসজিদের ইমাম-খতীব ও মাহফিলসমূহ নজরদারি করার কথা বলে ভীতি তৈরী ও ধর্মীয় কর্মকান্ড সংকোচিত করার পরিবর্তে আলেমদেরকে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে সহযোগিতা করুন। তিনি দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের পাকড়াও করা, একলা চলো নীতি পরিহার করে দ্রুত সংলাপ শুরুর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাার আহবানও জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিবাদ ও অসন্তোষ জিইয়ে রেখে দেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা যাবে কিনা প্রশ্ন রেখে বলেছেন, ক্ষমতাসীন দলেরই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যে উদ্যোগ নেওয়ার দায়-দায়িত্ব বেশি। ইসলামের নাম ব্যবহার করে গুলশান, শোলাকিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ও নৃশংস হত্যাকান্ডের ঘটনাকে দেশ এবং মুসলিম জাতিসত্তার জন্যে ভয়াবহ অশনি সংকেত মন্তব্য করে তাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আজ বৃহস্পতিবার দেয়া এক বিবৃতিতে তিনি একথা বলেন।

তার প্রেস সচিব মাওলানা মুনির আহমদ প্রেরিত বিবৃতিতে হেফাজত আমীর বলেন, সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের পেছনে ইন্ধনদাতাদেরকে চিহ্নিত করা বা খুঁজে বের করা সবচেয়ে জরুরী। তিনি বলেন, শক্তিশালী কোনো পক্ষের ইন্ধন ছাড়া বিচ্ছিন্ন ঘুটিকয়েক অপরাধীর পক্ষে এমন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা অসম্ভব। যে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ও হুমকির ঘটনায় তদন্তের আগেই দোষারোপের রাজনীতি বন্ধ করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী ও মদদদাতাদের চিহ্নিত ও পাকড়াও করে বিচার আওতায় আনতে সাহায্য করার আহবান জানিয়েছে তিনি বলেন, একলা চলো নীতি পরিহার করে দ্রুত সংলাপ শুরুর মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনুন। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রাজনৈতিক বিবাদ ও অসন্তোষ জিইয়ে রেখে দেশে স্থিতিশীলতা কীভাবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে? ক্ষমতাসীন দলেরই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যে উদ্যোগ নেওয়ার দায়-দায়িত্ব বেশি। হেফাজত আমীর সরকার ও প্রশাসনকে উদ্দেশ করে বলেন, দেশ থেকে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যকে নির্মূল করতে আপনারা যদি প্রকতৃই আন্তরিক হন, তবে মসজিদের ইমাম-খতীব ও মাহফিলসমূহ নজরদারি করার কথা বলে ভীতি তৈরী ও ধর্মীয় কর্মকান্ড সংকোচিত করার পরিবর্তে বরং আলেমদেরকে স্বাচ্ছন্দে কাজ করতে সহযোগিতা করুন। কারণ, সমাজের মানুষের মধ্যে সৎভাবে জীবন যাপনের যে মানসিকতা ভেতর থেকে কাজ করে, সেটা এই ইমাম ও খতীবরাই তৈরী করে থাকেন। তিনি বলেন, মসজিদে খতীবগণকে নজরদারির কথা বলার মানেই হচ্ছে, সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ডের দায় ইসলামের উপর চাপানোর চেষ্টা। বাংলাদেশের উপর এখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি নিবদ্ধ। খতীব নজরদারির সংবাদে বিশ্ববাসীর কাছে এমন বার্তা যাবে যে, বাংলাদেশের লাখ লাখ মসজিদের খতীব জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের কাজে জড়িত। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে ধরা পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর নজরদারির কথা বলা হচ্ছে মসজিদের খতীব ও ওয়াজ মাহফিল। প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তে সন্ত্রাস দমনে সরকারের প্রকৃত সদিচ্ছা নিয়ে জনমনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিবৃতিতে তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও জাতীয় ঐক্যকে বাধাগ্রস্ত ও ধ্বংস করার জন্যে বিভিন্ন অপশক্তি গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা এদেশ থেকে ইসলামকে উচ্ছেদ করে আধিপত্য ও শোষণের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই কাজে তারা কলেজ-ইউনিভার্সিটির উচ্চ শিক্ষিত ছাত্রসহ সরলমনা কিছু মুসলিম যুবককে আদর্শিকভাবে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যায় প্রভাবিত করে ব্যবহার করতে সক্ষম হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশ ও মুসলিম জাতিসত্ত্বা বিরোধী এই ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, কোনো মদ্যপানকারী আল্লাহু আকবার বলে মদ পান করলে যেমন কেউ সেটাকে ইসলামী মদ বলবে না, তেমনি কোন সন্ত্রাসী আল্লাহু আকবার বা ইসলামের নাম নিয়ে মানুষ হত্যার মতো জঘন্য কাজ করলে সেটাকে ইসলামের জিহাদ ভাবার অবকাশ নেই। দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ধর্মীয় শিক্ষার অনুপস্থিতির কারণে সাধারণ শিক্ষিত বিশাল ছাত্রসমাজ পরিপূর্ণ সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান থেকে দূরে থেকে যাচ্ছে। বাংলাদেশের শত্রুরা এই সুযোগটা কাজে লাগাচ্ছে। ধর্মহীন শিক্ষানীতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নামে নাস্তিক্যবাদ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা জাতির জন্যে সন্ত্রাস ও কথিত জঙ্গীবাদের বিপর্যয় ডেকে আনছে। হেফাজত আমীর বলেন, সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, কাউকে বিনা কারণে হত্যা ও সমাজে ভীতি তৈরীর নাম কখনোই জিহাদ নয়, বরং ইসলামের জিহাদ হচ্ছে অন্যায় আগ্রাসন ও সন্ত্রাস-নৈরাজ্য দমনের জন্যে। জিহাদের এই প্রকৃত ব্যাখ্যা তাদের সামনে সুন্দরভাবে তুলে ধরতে হবে।

হেফাজত আমীর বলেন, মাদ্রাসাসমূহে শুধু নামায-রোযা ও হজ্ব-যাকাতের শিক্ষা দেয়া হয় না। বরং খোদাভীতি ও পরকালীন কঠোর শাস্তি থেকে পরিত্রাণ পেতে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন, দেশপ্রেম এবং আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণের শিক্ষা দেয়া হয়। যে কারণে বিগত কয়েক শত বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, কোন কওমী মাদ্রাসায় ছাত্র সংঘর্ষ, খুন-খারাবি ও ছাত্র-শিক্ষককে নিয়ে কোন বিশৃঙ্খলা বা দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা ঘটে না। তিনি বলেন, এই যে সম্প্রতি ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে বেশ কিছু বিদেশী অমুসলিম ব্যক্তিত্বকে হত্যার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হলো, ইসলামে এর বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারী এসেছে। যেমন, অমুসলিমদের অধিকার ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে পড়িয়ে থাকি, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “মনে রেখ, যদি কোনো মুসলমান কোনো অমুসলিম নাগরিকের ওপর নিপীড়ন চালায়, তার অধিকার খর্ব করে, তার কোনো বস্তু জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়, তাহলে কিয়ামতের দিন আমি আল্লাহর আদালতে তার বিরুদ্ধে অমুসলিম নাগরিকের পক্ষে মামলা দায়ের করব”। (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস নং- ৩০৫২)।

Print Friendly, PDF & Email